ঢাকা সোমবার, ২১শে অক্টোবর ২০১৯, ৭ই কার্তিক ১৪২৬


উপাচার্য থেকে টাকা নেয়া বিষয়ে জাবি ছাত্রলীগ নেতার ফোনালাপ ফাঁস


১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ১৯:৪১

আপডেট:
২১ অক্টোবর ২০১৯ ১৪:৫৭

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর সঙ্গে শাখা ছাত্রলীগের এক নেতার ফোনালাপ ফাঁস হয়েছে।

রাব্বানীর সঙ্গে কথা বলা জাবি ছাত্রলীগ নেতার পরিচয় এবং ফোনালাপ হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে দেশ রূপান্তর।

গণমাধ্যমের খবরে ৯ আগস্ট উপাচার্যের সঙ্গে টাকা ভাগের বৈঠকে যে চার ছাত্রলীগ নেতা উপস্থিত ছিলেন বলে প্রকাশ হয়েছে ফোনালাপকারী এই ছাত্রলীগ নেতা তাদের মধ্যে একজন।

ফোনালাপের শুরুতে রাব্বানী জিজ্ঞেস করেন, ‘টাকা নেওয়ার সময় কে কে ছিল, টাকাটা দিছে কোন জায়গায় বইসা।’

জবাবে জাবি ছাত্রলীগ নেতা বলেন, ‘ভাই আমি আপনারে বলছিলাম না যে, আমি (সাদ্দাম হোসেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক) তাজ (নিয়ামুল হক তাজ- সহসভাপতি), জুয়েল (সভাপতি), চঞ্চল (সাধারণ সম্পাদক) ছিলাম। ওই মিটিংয়ের সময়।’

নিচে তাদের কথোপকথন তুলে ধরা হলো:

রাব্বানী: ম্যাম তো বলছে এ আন্দোলনও নাকি আমরা করাইছি! আন্দোলন কারা করছে সেটাও তো আমরা জানিনা।

জাবি ছাত্রলীগ নেতা: বিষয়টা হচ্ছে উনি ছাত্রলীগের ওপর সব কিছু দিয়া নিজের ফ্যামিলিরে সেভ করতে চাচ্ছে।

রাব্বানী: আচ্ছা যখন টাকাটা দিছে তখন তুই ছিলি না?

জাবি ছাত্রলীগ নেতা: হ্যাঁ ভাই আমি ছিলাম।

রাব্বানী: টাকাটা দিছে কীভাবে, ম্যাম নিজেই দিছে, অন্য কেউ ছিল না?

জাবি ছাত্রলীগ নেতা: ওখানে হচ্ছে ভাই আর কেউই ছিল না। ম্যাম এবং তার পরিবার হচ্ছে আমাদের সঙ্গে ডিলিংসটা করছে। করে সে হচ্ছে টাকাটা আমাদের হলে পৌঁছে দিছে।

রাব্বানী: হলে পৌঁছে দিছে টাকা?

জাবি ছাত্রলীগ নেতা: হ্যাঁ হ্যাঁ, একটা গাড়িতে করে এক লোক এসে দিয়ে গেছে।

রাব্বানী: কয় টাকা দিছে?

জাবি ছাত্রলীগ নেতা: আমাদের বলছে এক কোটি। আমরা বাকিটা জানি না, জুয়েল আর চঞ্চলের সঙ্গে আলাদা সিটিং হইতে পারে।

রাব্বানী: আমি শুনলাম এক কোটি ষাট।

জাবি ছাত্রলীগ নেতা: ওইটা ভাই ষাইটেরটা আমরা জানি না। উনি এক কোটি ভাগ করে দিছে। যে পঞ্চাশ হচ্ছে জুয়েলের, পঁচিশ আমাদের আর পঁচিশ চঞ্চলের।

রাব্বানী: ও ম্যাডাম এভাবে ভাগ করে দিছে? জুয়েল ভালো ছেলে এজন্য পঞ্চাশ আর চঞ্চল ক্যাম্পাসের বাইরে থাকে এজন্য পঁচিশ?

জাবি ছাত্রলীগ নেতা: হ্যাঁ। চঞ্চল আমাদের তো বাদ দিতে পারে নাই। ঝামেলা এড়ানোর জন্য বা..

রাব্বানী: ও চঞ্চলের ভাগেরটাই তোরা পাইছস?

জাবি ছাত্রলীগ নেতা: হ্যাঁ, চঞ্চলের ওখান থেকেই, আমরা বলছি যে ২৫% আমাদের দেওয়া লাগবে। তারা হচ্ছে ভাই তাহলে আমাদের না জানায়া তাদের আলাদা ষাট লাখ টাকা দিছে, এটা হইতে পারে।

রাব্বানী: ও তাহলে তোদেরকে না জানায়া দিছে?

জাবি ছাত্রলীগ নেতা: হ্যাঁ হ্যাঁ, আমরা এটা জানি না আমরা এক কোটির হিসাব জানি।

রাব্বানী: তোমার ম্যাডাম যে আমাদের নাম জড়াইলো এখানে, টাকার ব্যাপারে আমার বা শোভনের কোনো আইডিয়াই তো নাই।

জাবি ছাত্রলীগ নেতা: ভাই উনি খুব নোংরামি করতেছে।

রাব্বানী: আমিও বুঝতেছি নিজে সেভ হওয়ার জন্য ফ্যামিলি সেভ করার জন্য। এ ছয়টা কাজ বেসিক্যালি ঠিকাদারদের সঙ্গে ডিল করছে কে?

জাবি ছাত্রলীগ নেতা: ভাই মূলত ডিলটিল করছে তার ছেলে, তার পিএস সানোয়ার ভাই, আর পিডি আর তার স্বামী- এ চারজন।

রাব্বানী: হাজবেন্ড-ছেলে পিডি নাসির আর পিএস সানোয়ার? ও তারাই আগে থেকে ছয়টা কোম্পানি ঠিক করে রেখেছে?

জাবি ছাত্রলীগ নেতা: হ্যাঁ, শুরু থেকেই তারা সব কিছু করছে।

রাব্বানী: টেকনিক্যাল কমিটিতেও ভিসি ছিল? ভিসি তো থাকতে পারে না।

জাবি ছাত্রলীগ নেতা: হ্যাঁ সে ছিল। প্রথমত সে তো সবাইরে ফেরত-টেরত পাঠায়া দিলো না! শিডিউল ছিনায়া-টিনায়া নিচ্ছিল। পরে হচ্ছে আমরা বলছি সবাইরে কিনতে দিতে হবে সবাইরেই ড্রপ করতে দিতে হবে। তখন হচ্ছে ড্রপ সবাইরেই করাইছে। কিন্তু কাজ হচ্ছে নিজ হাতে সব বিষয়গুলা করছে।

পরে আবার কথা বলবেন বলে রাব্বানী ফোনালাপ শেষ করেন।

জানতে চাইলে ফোনালাপের বিষয়ে ওই জাবি ছাত্রলীগ নেতা অস্বীকার করেননি। তবে এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতেও রাজি হননি।

জাহঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কাজ থেকে ছয় শতাংশ চাঁদা দাবিসহ অন্যান্য অভিযোগে শনিবার কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ হারান গোলাম রাব্বানী। একই অভিযোগে পদ হারান সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনও।

তবে উপাচার্যের কাছে চাঁদা দাবি নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দেন দুই পক্ষ।

শনিবার উপাচার্য ফারজানা ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘অর্থ লেনদেনের বিষয়টি বানোয়াট গল্প। টাকা-পয়সা নিয়ে তাদের সঙ্গে আমার কোনো কথা হয়নি। তারা তাদের মতো করে কাজ করে। তারা কার কাছে কমিশন পায় বা পায় না, তা আমি জানি না। এ বিষয়ে তারা আমাকে ইঙ্গিত দিলে আমি বলি, তোমরা টাকা-পয়সা নিয়ে কোনো আলাপ আমার সঙ্গে করবে না। তোমরা যা চাও, তা তোমাদের মতো করো।’

এর আগে রাব্বানী প্রধানমন্ত্রীকে লেখা চিঠিতে বলেন, ‘উপাচার্য ম্যাম এর স্বামী ও ছেলে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগকে ব্যবহার করে কাজের ডিলিংস করে মোটা অঙ্কের কমিশন বাণিজ্য করেছেন। যার প্রেক্ষিতে ঈদুল আজহার পূর্বে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগকে ১ কোটি ৬০ লক্ষ টাকা দিয়েছেন। এ খবর জানাজানি হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি শুরু হয় এবং এরই প্রেক্ষিতে উপাচার্য ম্যাম আমাদের স্মরণ করেন। আমরা দেখা করে আমাদের অজ্ঞাতসারে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগকে টাকা দেওয়ার প্রশ্ন তোলায় তিনি বিব্রতবোধ করেন। নেত্রী, উক্ত পরিস্থিতিতে আমরা কিছু কথা বলি যা সমীচীন হয়নি। এ জন্য আমরা ক্ষমাপ্রার্থী।’