ঢাকা সোমবার, ২১শে অক্টোবর ২০১৯, ৭ই কার্তিক ১৪২৬


আবরার যখন ছাত্রলীগের টর্চার সেলে মৃত্যুকোলে মা তখনও ফোনকলে


৮ অক্টোবর ২০১৯ ০১:২১

আপডেট:
২১ অক্টোবর ২০১৯ ১৪:৫৮

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেক্ট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের (১৭ তম ব্যাচ) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে রাতে অনেকবোর ফোন দেন তার মা রোকেয়া খাতুন। ফোনে রিং হলেও আবরার কল রিসিভ করেন নি। অন্য দিকে কল রিসেভ না করায় আবরারকে মেসেঞ্জারে নক দেন আবরারের ছোট ভাই ফায়াজ। এ সময় আবরার ফেসবুকে একটিভ থাকলেও তাতে সাড়া দেননি।

এদিকে পুলিশের দেয়া তথ্য এবং ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী রাত আটটার দিকে ছাত্রলীগ নেতারা টর্চারসেলখ্যাত ২০১১ নম্বর রুমে ডাকেন আবরারকে। আট থেকে রাতভর তাকে পিটাতে থাকে তারা। পরে রাত তিনটার দিকে শোনা যায় আবরার আর বেঁচে নেই।



মা যখন আবরারকে ফোন করছিলেন তখন আবরার পৃথিবীতে ছিলেন কিন্তু তিনি কথা বলার মতো অবস্থায় ছিলেন। আবরার ছিলেন টর্চারসেলে। হয়তো মা মা, বাবা বাবা বলে ডাকতে ছিলেন কিন্তু সে ডাক বাস্তবতাকে ভেদ করে মা-বাবার কানে পৌঁছাতে পারেনি। কিন্তু মা তখনও ছিলেন তার সন্তানের অপেক্ষায়।

আবরার যখন ছিলেন ফোনকলে তখন তার মাও ছিলো ফোন কলে। কিন্তু পিটুনি খেতে খেতে আবরার যখন চলে গেলেন মৃত্যুকোলো মা তখনও ছিলেন ফোনকলে। মায়ের প্রত্যাশা ছেলে তার সাথে কথা বলবেন। তার ডাকে সাড়া দিবেন। কিন্তু সে সাড় আর দেয়া হয়ে ওঠেনি আবরারের। তার আগেই পৃথিবিী ছেড়ে পরিবারের মায়া কাটিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

রোববার দিবাগত রাত তিনটার দিকে বুয়েটের শের-ই-বাংলা হলের নিচতলা থেকে আবরারের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। বুয়েটের হল শাখার ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরা তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করে।

আবরারের বাবার নাম বরকতুল্লাহ। তিনি বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের নিরীক্ষক কর্মকর্তা ছিলেন। মা রোকেয়া খাতুন একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষক। দুই ভাইয়ের মধ্যে আবরার ফাহাদ বড়। ছোট ভাই আবরার ফায়াজ ঢাকা কলেজের উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। সেও ঢাকা কলেজের হোস্টেলে থাকে। বুয়েটের শের-ই-বাংলা হলের কাছেই তাঁর হোস্টেল।



পরিবারের সদস্যেরা জানান, ১০ দিন আগে ছুটিতে দুই ভাই বাড়িতে এসেছিলেন। ২০ তারিখ পর্যন্ত বাড়িতে থাকতে চেয়েছিলেন আবরার। তবে সামনে পরীক্ষা, পড়া হচ্ছে না বলে গতকাল ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন তিনি।

আবরারের শেষ বিদায় নিয়ে মা রোকেয়া খাতুন বলেন, ‘গতকাল সকালে আমি তাকে নিজে গিয়ে বাসে তুলে দিই। সে ঢাকায় রওনা দেয়। মাঝে তিন থেকে চারবার ছেলের সঙ্গে কথা হলো আমার। বিকেল পাঁচটায় হলে পৌঁছে ছেলে আমাকে ফোন দেয়। এরপর আর কথা হয়নি। রাতে অনেকবার ফোন দিয়েছিলাম, ফোন ধরেনি।’

বুয়েট ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক আশিকুল ইসলাম বিটু প্রদত্ত তথ্য থেকে জান যায় রাত আটটার দিকে হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে আনা হয় আবরারকে। রাতভর তাকে মারা হয়। রুমে মদের বোতল সাক্ষ্য দেয় কতোটা উন্মত্ত ছিলেন ছাত্রলীগের সেই নেতাকর্মীরা। অন্যদিকে রুম থেকে উদ্ধার করা ভাঙা স্ট্যাম্প এবং আবরারের গায়ে জমাট বাধা রক্ত থেকে বোঝা যায় কত নির্মমভাবে আবরারকে পিটানো হয়। ভোররাত তিনটার দিকে জানা যায় আবরার মারা গেছেন।



এর মধ্যে আদরের সন্তান, পরম স্নেহের ধন আবরারকে রাতে কতোবারই না ফোন দিয়েছিলেন মা রোকেয়া খাতুন। কিন্তু রাত আটটা থেকেই আবরার ছাত্রলীগের টর্চারসেলে। কিভাবে তিনি মায়ের ডাকে সাড়া দিবেন। আবরার যখন ফোনকলে মা তখনও ফোনকলে। কিন্তু আবরার যখন মৃত্যুকোলো ঢলে পড়লেন মা তখও ফোন দিয়েই যাচ্ছেন। কিন্তু আবরারের নিথর দেহ মায়ের সে ডাক শুনতে অক্ষম। সাড়া দেয়াটা আরো অসম্ভব। শুধু পরম স্রষ্টার ডাকেই তখন সাড়া দেয়া যায়।

ছোট ভাই বলে, ‘ফোন না ধরায় আমি ফেসবুকের মেসেঞ্জারে ভাইয়াকে নক করি। ভাইয়া ফেসবুকে অ্যাকটিভ ছিল, তবে সাড়া দেয়নি।’

জানা যায়, মারধরের সময় যাতে কোনো আওয়াজ করতে না পারে এজন্য তার মুখ বেধে নিয়েছিল সন্ত্রাসীরা। নড়াচড়া করতে না পারে এজন্য তাকে কম্বল জাতীয় কিছু একটা দিয়ে পেচিয়ে নেয়া হয়। তারপর বেধড়ক মারা হয়। মদের উন্মত্ততায় মারের মাত্রা বাড়তে থাকে।