ঢাকা রবিবার, ১৭ই নভেম্বর ২০১৯, ৪ঠা অগ্রহায়ণ ১৪২৬


মাদক ফুটপাথ ও পরিবহন চাঁদাবাজিতে জড়িত ওরা ১১ জন


১৬ অক্টোবর ২০১৯ ১৩:২১

আপডেট:
১৭ নভেম্বর ২০১৯ ১০:৩৩

ঢাকা উত্তর সিটি করপরেশনের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান মিজান গ্রেফতার হওয়ার পর আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটছে দুর্নীতিবাজ কাউন্সিলরদের। ক্যাসিনো খালেদ গ্রেফতার হওয়ার পর অনেকেই দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। আবার যারা দেশে আছেন তারা দলীয় কর্মকান্ড সীমিত করে গা ঢাকা দিয়ে চলাফেরা করছেন। সূত্র জানায়, ক্যাসিনো, মাদক ব্যবসা, ফুটপাত ও পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি, দখদারিত্বের সাথে জড়িত এরকম কমপক্ষে ১১ জনের তালিকা করা হয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকজন ইতোমধ্যে বিদেশে পালিয়ে গেছেন। আবার কেউ কেউ গাঢাকা দিয়ে আছেন। এলাকায় তাদেরকে আর দেখা যাচ্ছে না।


সূত্র জানায়, উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড (মোহাম্মদপুর এলাকার) কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজিব আলোচিত ক্যাসিনো ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেন। তার নিয়ন্ত্রণে ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুরে অনেক জায়গায়ই ক্যাসিনো ব্যাবসা পরিচালিত হয় বলেও স¤প্রতি রাজিবসহ বেশ কয়েকজন কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে একটি সংস্থা প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। জানা গেছে, বছর কয়েক আগেও রাজীবের বাবা তোতা মিয়া ও তার ৩ ভাই রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন ঢাকা শহরে।

এখন তাদের সবারই আছে বাড়ি-গাড়ি। ঢাকা সিটি করপরেশনের কাউন্সিলর হয়ে খুব অল্প সময়ে এই অঢেল সম্পত্তির মালিক হয়ে উঠেছেন রাজীব। গত ৪ বছরে তিনি মার্সিডিজ, বিএমডব্লিউ, ক্রাউন প্রাডোসহ ৮-১০টির বেশী নামী দামী ব্রান্ডের গাড়ী কিনেছেন। গুলশানে ফ্লাটসহ বিদেশে ফ্লাট কেনারও গুঞ্জন আছে।

মোহাম্মদপুর থানা যুবলীগের যুগ্ম আহব্বায়ক রাজীব এক মুক্তিযোদ্ধাকে প্রকাশ্যে জুতা পিটা করে লাঞ্চিত করার কারণে যুবলীগ থেকে বহিষ্কৃত হন। আলোচনা আছে, পরবর্তীতে যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির বহিস্কৃত দপ্তর সম্পাদক কাজী আনিসুর রহমানকে ২ কোটি টাকা দিয়ে স¤প্রতি তারেকুজ্জামান রাজীব ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদ বাগিয়ে নেন। গত সিটি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না পেলেও সাবেক এক মন্ত্রীর ছত্রছায়ায় নির্বাচন করে পরাজিত করেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীকে।


সূত্র জানায়, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের (উত্তর ও দক্ষিণ) কমপক্ষে ১১ জন কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পর দলীয় প্রভাব খাটিয়ে এলাকার বিভিন্ন ক্লাব, সামাজিক সংগঠন, বিভিন্ন মার্কেট ও ফুটপাত নিয়ন্ত্রণে নেন তারা।

খেলাধুলার নামে এসব ক্লাবে শুরু করেন ক্যাসিনো ও জুয়ার আসরসহ নানা অপরাধ কর্মকান্ড। দেশের পাশাপাশি বিদেশেও তাদের কারও কারও ক্যাসিনো ব্যবসা রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তালিকায় উঠে এসেছে এসব বিতর্কিত কাউন্সিলরের নাম।

অনুসন্ধানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আটজন ও উত্তর সিটি করপোরেশনের তিনজন কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে ক্যাসিনো, জুয়া, মাদক ও চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। শুধু স্থানীয় বাসিন্দারা নয়, দলীয় নেতাকর্মীরাও এসব অভিযোগ তুলেছেন। অভিযুক্তদের কেউ কেউ সিটি করপোরেশনের নিয়মিত বোর্ড সভায়ও অনুপস্থিত থাকেন। ওয়ার্ডের নাগরিকদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানেও তাদের পাওয়া যায় না। কারও কারও বিরুদ্ধে সরকারের অনুমতি ছাড়া একাধিকবার বিদেশ ভ্রমণেরও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রত্যেকেই।


ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) যেসব কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তারা হচ্ছেন, ২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. আনিসুর রহমান, ৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. আশ্রাফুজ্জামান, ৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাজী একেএম মমিনুল হক সাঈদ, ১৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোস্তফা জামান (পপি), ২০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফরিদ উদ্দিন আহম্মেদ রতন, ২২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. তরিকুল ইসলাম সজীব, ৩০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. হাসান (পিল্লু) ও ৩৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ময়নুল হক মঞ্জু।

আর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) কাউন্সিলররা হলেন, সাত নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোবাশ্বের হোসেন চৌধুরী, ২৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফরিদুর রহমান খান ওরফে ইরান ও ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজিব।
ডিএসসিসির ২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধে এলাকায় মাদক নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন অভিযোগে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে

। স¤প্রতি ক্যাসিনোসহ বিভিন্ন অপরাধে গ্রেফতার মহানগর দক্ষিণ যুবলীগ নেতা খালিদ মাহমুদ ভুইয়া পুলিশের রিমান্ডে তার অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণে এই কাউন্সিলরের নাম উল্লেখ করেছেন বলে জানা গেছে। ডিএসসিসির ৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. আশ্রাফুজ্জামান বর্তমানে সবুজবাগ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি।

তার বিরুদ্ধে এলাকাবাসীর অভিযোগ- আরামবাগ ও সবুজবাগ এলাকার যেসব ক্যাসিনো ও জুয়ার আড্ডা রয়েছে সেগুলোর নিয়ন্ত্রকদের অন্যতম তিনি। মমিনুল হক সাঈদের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। পাশাপাশি ফুটপাত থেকেও অবৈধ টাকা আয় করছেন। যদিও তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, আমি ক্যাসিনো, মদ, জুয়া, দখলবাজিসহ কোনও অপরাধের সঙ্গে জড়িত নই।
ডিএসসিসির ৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর এ কে এম মমিনুল হক সাঈদ মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক ও ওয়ার্ড যুবলীগের সাবেক সভাপতি। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, প্রভাব খাটিয়ে তিনি এলাকার সব ক্লাবের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গড়ে তোলেন ক্যাসিনোসহ জুয়ার আসর।

স¤প্রতি রাজধানীর ফকিরাপুলে ইয়ংমেন্স ক্লাব, ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, গুলিস্তানের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়াচক্র ও বনানীর গোল্ডেন ঢাকা ক্লাবে অভিযান চালায় র‌্যাব। এই চারটি ক্লাবের মধ্যে ওয়ান্ডারার্স ক্লাবটি চালাতেন যুবলীগের বিতর্কিত এই নেতা। বাকিগুলোর সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততা ছিল। এছাড়া সিঙ্গাপুর-থাইল্যান্ডে সাঈদের ক্যাসিনো ব্যবসা রয়েছে বলেও জানা গেছে। পাশাপাশি চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজিরও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

শুধু তাই নয়, অবাধ্য হওয়া ব্যক্তি ও দলীয় কর্মীদের নির্যাতনের জন্য আরামবাগে একটি টর্চাল সেন্টার গড়ে তোলেন সাঈদ। তার বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া বহুবার বিদেশ যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ডিএসসিসি মেয়র এসব অভিযোগের বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে লিখিত চিঠি দিয়েছেন। তিনি এখনও রয়েছেন সিঙ্গাপুরে।


ডিএসসিসির ১৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোস্তফা জামান (পপি) পল্টন থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি। কাউন্সিলর ও দলীয় পদের প্রভাব খাটিয়ে গুলিস্তান, পল্টন, কাকরাইল, শান্তিনগর, রাজারবাগ, মৌচাক ও মালিবাগ এলাকার সব ফুটপাত নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ এই কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে মোস্তফা জামান পপি বলেন, আমি একজন সাধারণ কাউন্সিলর। এসব কাজের সঙ্গে আমি জড়িত নই।


ডিএসসিসির ২০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফরিদ উদ্দিন আহমদ রতনের বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ রয়েছে। গুলিস্তানের মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন তিনি। এই ক্লাবটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তার সঙ্গে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগ সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের বিরোধ দেখা দেয়।

স¤প্রতি ক্যাসিনোর অভিযোগে ক্লাবটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া কাউন্সিলর হয়েও তিনি অন্য একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে ডিএসসিসির বিভিন্ন ঠিকাদারি কাজ বাগিয়ে নিয়েছেন। ডিএসসিসির ২২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. তরিকুল ইসলাম সজীব ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, এলাকায় মাদক, চাঁদাবাজিসহ অন্যান্য কাজে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। ডিএসসিসির ৩০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. হাসান (পিল্লু) স্থানীয় এমপি হাজী সেলিমের ভাগ্নে। তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে পুরান ঢাকার সোয়ারিঘাটসহ আশপাশের এলাকা। ওই এলাকায় যত মালবাহী বাহন রয়েছে সেগুলোর নিয়ন্ত্রক তিনি। এ থেকে মাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।


ডিএসসিসির ৩৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ময়নুল হক মঞ্জুর বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের আওতাধীন টিকাটুলীর রাজধানী সুপার মার্কেট ও নিউ রাজধানী সুপার মার্কেটে অবৈধ দোকান বসিয়ে মাসে কোটি টাকা আয় করেন। দুই মার্কেটের ১৭৮৮টি দোকান থেকে প্রতি মাসে তার নামে নির্ধারিত হারে চাঁদা আদায় করা হয়। তিনি ২০১১ সাল থেকে এই দুটি মার্কেটের ‘স্বঘোষিত’ সভাপতি।


অন্যদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) তিনজন কাউন্সিলরের বিরুদ্ধেও ক্যাসিনো ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। তারা হলেন, ৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোবাশ্বের হোসেন চৌধুরী, ২৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফরিদুর রহমান খান ওরফে ইরান ও ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজিব।
এর মধ্যে মোবাশ্বের হোসেন চৌধুরী মহানগর উত্তর স্বেচ্চাসেবক লীগের সভাপতি। তিনি ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের ‘অঘোষিত নিয়ন্ত্রক’ মোল্লা আবু কাওছারের ঘনিষ্ঠ। ডিএনসিসির ২৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফরিদুর রহমান খান ওরফে ইরান। তিনি ফার্মগেট- তেজগাঁও এলাকার আলোচিত ব্যক্তি। মহানগর উত্তর আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক ও তেজগাঁও কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি। তার বিরুদ্ধে ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িত থাকা, এলাকায় চাঁদাবাজি, দখলবাজিসহ নানা অভিযোগ রয়েছে।


৩৩ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজিব মহানগর উত্তর যুবলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক। তার বিরুদ্ধে স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি অংশের অভিযোগ, তিনি মোহাম্মদপুর এলাকার বিভিন্ন ক্লাবে ক্যাসিনোসহ জুয়ার আসর পরিচালনা করে থাকেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেছেন, যদি কেউ এমন প্রমাণ করতে পারে তাহলে রাজনীতি ছেড়ে দেবো।