ঢাকা রবিবার, ১৭ই নভেম্বর ২০১৯, ৪ঠা অগ্রহায়ণ ১৪২৬


টং দোকানি থেকে শত কোটি টাকার মালিক রাজীব


২১ অক্টোবর ২০১৯ ০২:৪১

আপডেট:
১৭ নভেম্বর ২০১৯ ১০:২৬

নানকের হাত ধরে উত্থানএকসময় ছিলেন টং দোকানি। বিক্রি করত পান-সিগারেট। বাবা করত রাজমিস্ত্রির কাজ। দুজনের যা আয় হতো তাতেই ঘুরত সংসারের চাকা। কিন্তু এখন রাজকীয় বা ‘সুলতানের’ মতই জীবনযাপন করে সে।

মাত্র চার বছরে প্রাসাদসম বাড়ি, বিলাসী গাড়ি, জমি ও বিপুল টাকার মালিক বনে যায় তারেকুজ্জামান রাজীব। আর এসব কিছুর নেপথ্যে জাদুর কাঠি হিসেবে কাজ করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক। অনেকে এই রাজীবকে ‘নানকের পালক পুত্র’ বলেও জানেন। রাজীব নিজেই নিজেকে ‘জনতার কমিশনার’ ও ‘সুলতান’ বলে আখ্যা দিত। রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের আলোচিত এই কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীব গ্রেফতারের পর বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য। চার বছরে যার উত্থান গল্প সিনেমার কল্প কাহিনিকেও হার মানিয়েছে।

মোহাম্মদপুরের সুলতান পরিচয়দাতা এই রাজীবকে শনিবার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব-১)। এ সময় ওই বাসা থেকে ৭ বোতল বিদেশি মদ, একটি পাসপোর্ট, একটি আগ্নেয়াস্ত্র, তিন রাউন্ড গুলি ও ৪৩ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় রোববার ভাটারা থানায় তার নামে মাদক ও অস্ত্র আইনে দুটি মামলা করেছে র‌্যাব। পরে তাকে সন্ধ্যার দিকে ভাটারা থানায় হস্তান্তর করা হয়।

তাকে গ্রেফতারের রাতে মোহাম্মদপুরের তার বাসায় অভিযান চালানো হলেও তেমন কিছু পাওয়া যায়নি। তার সব আর্থিক লেনদেনের সব কাগজপত্র তার বাসা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে তার এক আত্মীয়ের বাসা থেকে ৫ কোটি টাকার একটি চেক ছাড়া আর কিছুই মেলেনি বলে জানিয়েছে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত।

অন্যদিকে রাজীবের গ্রেফতারের খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে রোববার দুপুরে সাত মসজিদ রোডে তার শাস্তির দাবিতে মিছিল করেছে এলাকাবাসী। এ ছাড়াও র‌্যাবের একটি সূত্র জানিয়েছে, রাজীবের বাড়িটির বাজারমূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা। তা ছাড়া তার ঘরের আসবাবপত্রগুলোরও দামও অনেক। যেগুলোর প্রত্যেকটিই বিদেশ থেকে আনা হয়েছে। রাজীবের একমাত্র আয় হলো কাউন্সিলর হওয়ার পর সিটি করপোরেশন থেকে প্রাপ্ত সম্মানি। যা দিয়ে এত দামি গাড়ি, বাড়ি ও ফ্ল্যাট কেনা সম্ভব নয়।

রাজীবের উত্থান : রাজীবের গ্রামের বাড়ি ভোলা জেলায়। তার বেড়ে ওঠা মূলত মোহাম্মদপুর এলাকায়। তার বাবা একজন রাজমিস্ত্রি। আর রাজীব মূলত আগে একজন পান দোকানি ছিল। পড়ালেখা বেশিদূর করতে পারেনি। প্রাথমিকের গণ্ডি পেরুতে না পারলেও তিনি ২০১৫ সালের আগে ছিল যুবলীগের একজন সাধারণ ওয়ার্ড কর্মী। একই বছর বিদ্রোহী হিসেবে তিনি আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী ও মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি শেখ বজলুর রহমানকে হারিয়ে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়। বর্তমানেও কাউন্সিলর হিসেবে সরকারি সম্মানির বাইরে কোনো আয়ের উৎস নেই। তবুও সম্পদের পাহাড় গড়েছে স্বঘোষিত ‘জনতার কাউন্সিলর’ রাজীব। কিন্তু কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তার সবকিছু বদলে যেতে থাকে। কাউন্সিলর হওয়ার পর ব্যবহার করতে শুরু করে পাজেরো ও বিএমডব্লিউসহ নানা ব্র্যান্ডের গাড়ি। থাকতে শুরু করে রাজকীয় বাড়ি ও ফ্ল্যাটে। শুধু তার নিজের জন্যই নয়, পরিবারেরর প্রত্যেক সদস্যদের জন্য রয়েছে আলাদা গাড়ি ও বাড়ি। তার চলাফেলার সময় সামনে ও পেছনে থাকত গাড়ির বহর। তিনি নাকি গাড়ির বহর ছাড়া চলতেই পারত না।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজীবের উত্থান এক দিনেই হয়নি। সে একজন পান দোকানদার থেকে আজকের রাজীব। যার একবেলা খাবার জোগানো কষ্টকর ছিল তার পক্ষে। কিন্তু সে আজ হাজার কোটি টাকার মালিক। ব্যবহার করে রাজকীয় গাড়ি ও ফ্ল্যাট।

তবে তার উত্থানের পেছনে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক অন্যরকম ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি তাকে ছেলের মতই দেখতেন। তার আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়েই এই রাজীব এক দিন হয়ে উঠে বেপরোয়া। ত্রাস হয়ে ওঠে মোহাম্মদপুরের এলাকাবাসীর কাছে। এ কারণে এলাকার আওয়ামী লীগের নেতারাও তাকে ভয়ে পেতেন। কিছু বলার পর্যন্ত সাহস পেতেন না। রাজীব গেল সিটি নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়। এরপর থেকে তার সবকিছু বদলে যেতে থাকে। কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে সে সেখানকার এক মুক্তিযোদ্ধাকে জুতাপেটা করে। এরপর তাকে যুবলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু সে যুবলীগের দফতর সম্পাদক আনিসকে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা দিয়ে আবারও দলে ফেরে। এবার সে উত্তর যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের পদ বাগিয়ে নেয়। কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পর রাজীবই যেন মোহাম্মদপুরের সব। রাজীবের কথা শুনলেই সব তটস্থ হয়ে যেত। এলাকায় সবাই তাকে সুলতান বা জনতার কমিশনার (স্বঘোষিত) নামে চিনতেন। এই রাজীবের বিরুদ্ধে জমি দখল, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, হত্যা ও ফ্ল্যাট দখলসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। রাজীবের চোখ কারও জমি বা ফ্ল্যাটের ওপর নজর পড়লেই তার আর রক্ষা নেই। যার হাত থেকে রক্ষা পায়নি মোহাম্মদপুরের অনেক পরিবার। অনেকে জমি কিনলেও আর বাড়ি তুলতে পারেনি। বিশেষ করে চাঁদ উদ্যান এলাকায় অনেকের বাড়ি ও জমি তার লোকজন দিয়ে রাতারাতি দখল করে নেয়।
সিনেমার স্টাইলে চলত গাড়ির বহর নিয়ে : রাজীব নিজেকে জনতার কমিশনার ও সুলতান বলে দাবি করত। এ কারণে সে কোথাও বের হলেই তার পেছনে ও সামনে থাকত শত শত মোটরসাইকেল ও গাড়ির বহর। থাকত কয়েক শতাধিক নেতাকর্মীও। সব মিলে ভাবখানা এমন ছিল তিনি প্রভাবশালী কোনো মন্ত্রী বা তার চেয়েও বেশি কিছু।

মোহাম্মদপুর ও বছিলাবাসী জানান, রাজীব তার গাড়ির বহর ও নেতাকর্মীদের নিয়ে কোনো রাস্তা দিয়ে গেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে বসে থাকতে হতো। বিষয়টি অনেকেই জানত কিন্তু কেউ ভয়ে টু শব্দটিও করতে পারত না। কেউ কিছু বললেই তার লোকজন হামলে পড়ত। শুধু কি তাই, কোথাও হাঁটলে রোদে তার মাথার ওপর ধরা হতো ছাতা। এসব কারণে এলাকায় সবাই তাকে সুলতান হিসেবেই বেশি চিনত। তবে দলবল নিয়ে শো ডাউন দিত বলে নিজেকে সে ‘জনতার কমিশনার’ বলে দাবি করত। সব মিলিয়ে তার চলার স্টাইল সিনেমার ভিলেনদেরও হার মানাত।

রাজীবের নিজস্ব বাহিনী : এই রাজীব শুধু যুবলীগ ও কাউন্সিলরের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে এলাকায় একটি সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলেছে। যাদের কাজই হলো এলাকায় কোথায় বাড়ি উঠছে, ফ্ল্যাট উঠছে, কে নতুন জমি কিনছে এবং কারা নতুন ভবন নির্মাণ করছেন তা দেখভাল করা। সেই সঙ্গে বড়ভাই (রাজীব) নিষেধ করেছে বলে বার্তাটি ওই ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেওয়াই ছিল তাদের কাজ। তার বাহিনীর দ্বারা রাজীব পুরো মোহাম্মদপুর এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তার বাহিনীর মাধ্যমে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা ও ডিশ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করত রাজিব। গতকাল দুপুরে মোহাম্মদপুরের শিয়া মসজিদের সামনে এলাকাবাসী আনন্দ মিছিল বের করে। এ সময় তারা তার দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবিতে বিক্ষোভও করেন।

বিক্ষোভকারীরা বলেন, রাজীব ও তার বাহিনীর অত্যাচারের ৩৩নং ওয়ার্ডবাসী ছিল অতিষ্ঠ। এমন ফুটপাথ, বাড়ি, ফ্ল্যাট, ভবন ও স্থান নেই যেখান থেকে তারা চাঁদাবাজি করত না। তাদের স্বার্থে আঘাত হানলেই তারা ওই ব্যক্তিকে শেষ করতে যেকোনো ধরনের পদক্ষেপ নিতো।

পাম্পের জায়গা দখল করে বাড়ি : মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটির ১নং রোড এলাকায় পানির পাম্পের জন্য নির্ধারিত জায়গায় বাড়ি বানিয়েছে। বাড়ির জায়গাটির দামই প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা।

এলাকাবাসী জানান, জায়গাটি ছিল পানির পাম্প করার জন্য। কিন্তু তিনি কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পর সেখানে তার নজর পড়ে। রাতারাতি সে সেখানে ঘিরে ফেলে এবং বাড়ি তুলে ফেলে। বিষয়টি পুলিশ, সিটি কর্তৃপক্ষ ও এলাকাবাসীর সবাই জানত কিন্তু কেউ তার ভয়ে কথা বলত না। কারণ তার রয়েছে বিশাল সশস্ত্র বাহিনী। রাজীব চার বছরে আট থেকে ১০টির বেশি নামিদামি ব্র্যান্ডের গাড়ি কিনেছে। গুলশান ও মোহাম্মদপুরে করেছে আটটি ফ্ল্যাট। এই বাড়িগুলোর প্রত্যেকটির ভেতরে রয়েছে দামি আসবাবপত্র। সে শুধু দামি গাড়িই ব্যবহার করতে না, তার পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের নামে ছিল একটি করে গাড়ি ও বাড়ি। তার বাবা রাজমিস্ত্রি থাকলেও তার নামেও বছিলা এলাকায় একটি বাড়ির কাজ চলছে। গত ১৩ অক্টোবর থেকে পলাতক ছিল এই রাজীব। গ্রেফতার এড়াতে সে গা ঢাকা দেয়। আশ্রয় নিয়েছিল বসুন্ধরা এলাকায় থাকা আমেরিকা প্রবাসী মিশু হাসান নামের এক ব্যক্তির ভাড়া বাসায়।