ঢাকা রবিবার, ১৭ই নভেম্বর ২০১৯, ৪ঠা অগ্রহায়ণ ১৪২৬


নেপথ্যে চাঁদাবাজি ক্যাসিনো

টোকাই রতন কাউন্সিলর হয়েই অঢেল সম্পত্তির মালিক


৫ নভেম্বর ২০১৯ ১৩:৩০

আপডেট:
৫ নভেম্বর ২০১৯ ১৬:০৪

কোমরে পিস্তল। গানম্যান পেছনে পেছনে। চলাফেরা ফিল্মি স্টাইলে। যে কোনো প্রতিষ্ঠানে হাজির হয়ে অস্ত্রের মুখে নেন সব টেন্ডার। তার ওপর চাঁদাবাজি, মার্কেট দখল। ক্যাসিনো ব্যবসা তো আছেই। তার আধিপত্য গোটা গুলিস্তান জুড়ে। তকমা পেয়েছেন গুলিস্তানের ডন হিসাবে।

তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফরিদউদ্দিন রতন। অবৈধ ক্যাসিনোর হোতা তিনি। ক্যাসিনো থেকে আসা কাঁচা টাকায় বদলে যান রাতারাতি। ক্যাডার বাহিনী দিয়ে নিয়ন্ত্রন করেন গুলিস্তান এলাকা। দখল করে নিয়েছেন অনেক মার্কেট। চলমান ক্যাসিনো অভিযানে এখন কিছুটা গা ঢাকা দিয়ে আছেন। কিন্তু থেমে নেই তার ক্যাডার বাহিনী। সমানে চলছে চাঁদাবাজি।

একসময় তার পরিচিতি ছিল টোকাই রতন হিসেবে। নির্বাচনী হলফনামায় নিজেকে স্বাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন বলে উল্লেখ করেছেন। বাবা আবদুল লতিফ চাকরি করতেন ফরিদপুরের জুট মিলে। একসময় বহিরাগত হিসেবে আশ্রয় নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। দিনে কার্জন হল এলাকায় এবং রাতে ফজলুল হক মুসলিম হলে পাওয়া যেত তাকে। সেই রতন অঢেল সম্পত্তির মালিক বনে গেছেন অল্প দিনেই। বহিস্কৃত যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের সঙ্গে অনেকটা হাত ধরেই তার উত্থান। কিন্তু কাউন্সিলর হওয়ার পর চাঁদার টাকার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন সম্রাটের সঙ্গে। কয়েকদিনের জন্য ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি।

২০০৯ সালে মুক্তিযোদ্ধা ক্লাবে ক্যাসিনো প্রথম চালু করেন-কাউন্সিলর ফরিদউদ্দিন রতন, শাহবাগ থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আলী আহমেদ এবং ২০ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ। এই সিন্ডিকেট ক্যাসিনোর মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা। এর নেপথ্যে ছিলেন বহিস্কৃত যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট। ২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত এই ক্যাসিনো থেকে প্রতিদিন ১ লাখ টাকা নিয়েছেন রতন। অভিযোগ রয়েছে গত সাত বছরে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ক্যাসিনো থেকে একাই পেয়েছেন রতন। পরে সম্রাটের সঙ্গে বিরোধে জরিয়ে গেলে এই ক্লাব থেকে তিনি সরে আসেন। পরে বিতর্কিত ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন দেলুর হাত ধরে ২০১৭ সালের মাঝামাঝি সময় তার মালিকানাধীন ঢাকার ৩৭/২ নম্বর পুরানা পল্টনের প্রীতম জামান টাওয়ারের ১৩ ও ১৪ তলায় প্রথম অনলাইন ক্যাসিনো চালু করা হয়। এটিই ঢাকার প্রথম অনলাইন ক্যাসিনো। ঢাকায় ক্যাসিনো কালচারের জনক বলা হয় দেলুকে। আর দেলুর সঙ্গে ক্যাসিনো ব্যবসার নেপথ্যে ছিল ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট ও কাউন্সিলর রতন। প্রতিদিন এখান থেকে তোলা হতো ১০ লাখ টাকা। জানা যায়, দেলু এখন দেশের বাইরে পলাতক রয়েছেন।
ক্যাসিনোর বাইরেও দখলদারিত্ব ছিলো রতনের। ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রায় সব মার্কেটেই একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখেছেন কাউন্সিলর রতন। অভিযোগ রয়েছে সুন্দরবন স্কয়ার মার্কেটে নকশার বাইরে গিয়ে ৫৫০টি দোকান নির্মাণ করেন তিনি। প্রশাসকের আমলে কানুনগো মোহাম্মদ আলীর সহায়তায় অস্থায়ী বরাদ্দের লিজের কাগজ বানিয়ে ১১০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় কাউন্সিলর রতন এবং শাহাবুদ্দিন আহমেদের সিন্ডিকেট। একইভাবে প্রশাসকের আমলে এই সিন্ডিকেট পোড়া মার্কেট গুলিস্তানের পার্কিং এরিয়ায় অবৈধভাবে ৩৭৫টি দোকানের লিজ করিয়ে নেন। ওই কানুনগোর সহায়তায় ১১২ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। এই বিষয়টি দুদকে তদন্তাধীন রয়েছে।

কাউন্সিলর রতনের সিন্ডিকেট গুলিস্তান এলাকার নগর, সিটি, জাকির মার্কেটের প্রায় ১২০০ দোকান অবৈধ প্রক্রিয়ায় লিজ করিয়ে নেন। সহায়তা করেন ক্যাসিনো দেলু, কানুনগো মোহাম্মদ আলী ও দক্ষিণ সিটির সম্পত্তি বিভাগ। এই মার্কেট থেকে ২৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় এই সিন্ডিকেট। এদিকে ২০১৫ সালে নতুন মেয়রের কাছে ফাইল গেলে সকল লিজ বাতিল করে উচ্ছেদের নোটিশ দেন মেয়র। পরে ওই সিন্ডিকেট উচ্চ আদালত থেকে পুনর্বাসনের আদেশ নিয়ে আসেন। রায়ের পরে সিটি করপোরেশনের রাজস্ব আদায়ের স্বার্থে ৭ বছরের ভাড়া জমা দেয়া সাপেক্ষে ট্রেড লাইসেন্স দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় সিটি করপোরেশন। ওই সিদ্ধান্তের অপব্যাখ্যা দিয়ে দোকানে দোকানে গিয়ে চাঁদা দাবি করেন তিনি। কাউন্সিলর রতনের ক্যাডার বাহিনীর সদস্য শাহাবুদ্দিন, খোকন ও গুসুর নেতৃত্বে চাঁদাবাজি চলছে। মার্কেটে মার্কেটে গিয়ে এই ক্যাডার বাহিনী চাঁদা দাবি করে। না দিলে দোকানে তালা মেরে দেয় তারা, করে নির্যাতন। গুলিস্তান এলাকার প্রায় সকল মার্কেটের একই চিত্র। বঙ্গবাজার, পুরান বাজার গুলিস্তান, ট্রেড সেন্টার, নগর প্লাজা, সিটি প্লাজা, জাকির প্লাজা, ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেট থেকে এখনো চাঁদা তোলার অভিযোগ রয়েছে রতনের লোকজনের বিরুদ্ধে। একাধিক মার্কেট কমিটির সদস্যরা জানান, রতন বাহিনী এসে টাকা তোলে নেন। করপোরেশনের নামে টাকা উঠালেও পুরোটা যায় রতনের পকেটে।

ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেটের এক দোকানদার বলেন, ‘কাউন্সিলর সরাসরি কখনো আসেনি। তার লোকজন এসে সময় মতো চাঁদা নিয়ে যায়। এই এলাকায় তার কথা ছাড়া কিছুই চলে না।’ তাঁর বিরুদ্ধে দখল, চাঁদাবাজি, ডিএসসিসির সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজার ভবন নিজের কবজায় রাখা, গুলিস্তানের ৯টি স্পটে অবৈধ দোকান বসিয়ে টাকা আদায়, মহানগর নাট্যমঞ্চসহ আশপাশের এলাকায় মাদক বিক্রেতাদের আশ্রয় দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া বেপরোয়া এই কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে ডিএসসিসির কর্মকর্তাদের প্রকাশ্যে মারধরেরও অভিযোগ রয়েছে। তাঁর আচরণে ডিএসসিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সব সময় তটস্থ থাকেন। গুলিস্তান, সেগুনবাগিচা, নগর ভবনসহ আশপাশের এলাকায় একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেছেন কাউন্সিলর রতন। পিডব্লিউডি, বিদ্যুৎ ভবন, খাদ্যভবন ও নগর ভবনের বিভিন্ন ঠিকাদারিতে একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। কালো টাকা সাদা করতেই ঠিকাদারিতে বিনিয়োগ করা শুরু করেন রতন। বিল্ডার্স লিমিটেডের মালিক স্বপনের প্রতিষ্ঠানের নামে ঠিকাদারি কাজ শুরু করেন ফরিদ আহম্মেদ রতন। সিটি করপোরেশনের নিয়ম অনুসারে কোনো কাউন্সিলর ঠিকাদারি কাজ করতে না পারলেও তিনি রাখডাক ছাড়াই করেন ঠিকাদারী। অভিযোগ রয়েছে পরিচিত বিভিন্ন ফার্মের লাইসেন্সে ৫-৬ হাজার কোটি টাকার কাজ করেন। এসব টাকার বেশিরভাগই সিঙ্গাপুর এবং মালয়েশিয়াতে রাখা আছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নামে- বেনামে ফেনী এবং ঢাকাতে কিনেছেন বিপুল সম্পত্তি।
নগর ভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানিয়েছেন, কাউন্সিলর রতন এই ভবনে আসেন গাড়ির বহর নিয়ে। সঙ্গে থাকে একাধিক দেহরক্ষী। কাউন্সিলরদের সরাসরি ঠিকাদারি করার সুযোগ না থাকায় ্তুদ্য বিল্ডার্স্থ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামেই রতন তার কাজ বাগিয়ে নিতেন। দ্য বিল্ডার্সের কাগজপত্রে বর্তমানে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার কাজ করছেন তিনি। ডিএসসিসির আওতাধীন ৪টি ইউনিয়নে ৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪টি সেতুর নির্মাণকাজ চলছে এ প্রতিষ্ঠানের নামে। নামপ্রকাশ না করার শর্তে সিটিকরপোরেশনের সূত্র এ সত্যতা নিশ্চিত করেছে।

ডিএসসিসির কর্মকর্তারা জানান, ২০১৭ সালে কাউন্সিলর রতন চানখাঁরপুল মোড়ে ডিএসসিসির একটি মার্কেট নির্মাণের কাজ নেন বেনামে। দুই বছর মেয়াদি এ নির্মাণকাজ ২০১৯ সালের ১ অক্টোবর শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু এ পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি নেই বললেই চলে। কিন্তু ইতোমধ্যে ৮ কোটি টাকা বিল তুলে নিয়েছেন তিনি। এ মার্কেটে দোকান বরাদ্দের জন্য ডিএসসিসি শত শত মানুষের কাছ থেকে অর্থ নিলেও মার্কেট নির্মাণ কবে শেষ হবে, তা কেউ বলতে পারছেন না।

ঠিকাদারী, মার্কেট দখল আর চাঁদাবাজি করে মন ভরেনি তার। ঢাকা দক্ষিণ সিটির ফুটপাত থেকে প্রতিদিন তুলেন চাঁদা। অভিযোগ এই চাদাঁর পরিমানও কম নয়। প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ টাকা চাঁদা যায় তার পকেটে। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতা, বহিস্কৃত যুবলীগ নেতা এবং কাউন্সিলর রতনের নামে এসব টাকা তোলা হয়। এদিকে কাউন্সিলর রতনকে রহস্যজনক বললেন গুলিস্তান আওয়ামী লীগের এক কর্মী। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, দক্ষিনের সব রাঘব বোয়ালের সঙ্গে রয়েছে সখ্যতা। আর তাদের নাম ব্যবহার করেই চলে তার রাজত্ব। তিনি বলেন এখানে রতন তিন নেতার হয়ে কাজ করেন।

এদিকে অভিযোগ রয়েছে, সেগুনবাগিচায় ডিএসসিসির একটি পাঁচতলা ভবনের পুরো তিনটি ফ্লোর দখলে রেখেছেন রতন। গত পাঁচ বছর চেষ্টার পরও ডিএসসিসি কর্তৃপক্ষ তার কাছ থেকে মুক্ত করতে পারেনি ফ্লোরগুলো। নিজ নির্বাচনী এলাকায় ফুটপাতের ওপর একটি পাকা স্থাপনা নির্মাণ করেছেন। সেগুনবাগিচায় আগোরা সুপার শপের উল্টোপাশে ফুটপাতের ওপর স্থায়ীভাবে এটি নির্মাণ করা হয়েছে। এখানে বর্তমানে একটি গ্যারেজ ও মনিহারি দোকান রয়েছে। সরেজমিনে গিয়েও বিষয়টির সত্যতা পাওয়া যায়। নামপ্রকাশ না করার শর্তে এখানকার দোকানদার বলেন, এই জায়গাটি কাউন্সিলর সাহেবের । তার কাছ থেকেই আমরা ভাড়া নিয়েছি।
এসব অভিযোগের ব্যাপারে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফরিদউদ্দিন রতন মোবাইল ফোনে বলেন, আমি সিটি করপোরেশনের কোনো কাজ করিনি। আমি সারা দেশে কাজ করি। মুক্তিযোদ্ধা ক্লাব চালানোর ব্যপারে তিনি বলেন, এটা মিথ্যা। আমি কয়েক বছর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এক অনুষ্ঠানে এই ক্লাবে জুয়া হয় সবার সামনে বলেছি। তাহলে আমি কিভাবে জুয়া চালাবো। মার্কেটে চাঁদাবাজির ব্যাপারে তিনি বলেন, কেউ বলতে পারবে না আমি মার্কেট থেকে চাঁদাবাজি করি। আমি এক পয়সা হারাম খাইনা, আমি কাজ করে ভাত খাই। অন্য আরো অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন , আপনি কারো দ্বারা ভায়াসড হয়ে আছেন। আপনি আমাকে মেন্টালি টর্চার করছেন। আপনি সামনাসামনি এসে কথা বলেন। আপনি কি গোয়েন্দ কর্মকর্তা যে আপনি এভাবে আমাকে প্রশ্ন করছেন? মার্কেটে চাঁদাবাজি নিয়ে তিনি বলেন মার্কেটে কি আমার বাবার দোকান আছে? সেখানে আমি যাবো কেনো? বাংলাদেশের বড় কনস্ট্রাকশন ফার্ম আব্দুল মোনায়েম লিমিটেডের সাথে কাজ করেছি। পাওয়ারপ্ল্যান্টে কাজ করছি। বুকে অনেক ব্যথা আছে, অনেক কথা বলতে পারি না। ছোটবেলা থেকে এই দলটা করে আসছি। এগুলো বলতে গেলে দলের বিরুদ্ধে বলা হয়ে যাবে। আমার বিরুদ্ধে সেচ্ছাসেবক লীগের এক নেতা কাজ করছে। আমি আর কিছু বলতে চাই না। শুধু এটাই বলবো আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে।