ঢাকা রবিবার, ১৭ই নভেম্বর ২০১৯, ৪ঠা অগ্রহায়ণ ১৪২৬


কামরাঙ্গীরচরে কাউন্সিলর নূরে আলমের ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে দখল-চাঁদাবাজির অভিযোগ


৯ নভেম্বর ২০১৯ ০৯:৩৮

আপডেট:
১৭ নভেম্বর ২০১৯ ১২:০১

ঢাকার অন্যান্য এলাকার কাউন্সিলরদের মতো দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৫৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হাজী নূরে আলমের বিরুদ্ধে চাঁদা ও দখলবাজির ঢালাও অভিযোগ নেই। তবে তার সহযোগী হিসেবে পরিচিত থানা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক এমএই মাসুদ মিন্টু, ছাত্রলীগ নেতা সবুজ সানি, তার ভাই সোহেল, শাকিল, মিজান, আওয়ামী লীগ নেতা জসিম মুন্সী, শাহজাহান ওরেফে কানা শাহজাহান, সেলিম ওরফে জামাই সেলিম, ফজলুসহ কয়েকজনের ‘বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে’ জিম্মি কামরাঙ্গীরচরের ঝাউচর, নয়াগাঁও, খোলামুড়া ও জাউলাহাটি এলাকার তিন লাখ মানুষ। অভিযোগ আছে, কাউন্সিলর নূর আলম ও সাবেক এক মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না। এমন অভিযোগ জাউলাহাটি, ঝাউচর, খোলামুড়া এলাকার বাসিন্দাদের। তারা বলছেন, অবৈধ দখলদার, ভূমিদস্যু, মাদক কারবারি ও চাঁদাবাজদের প্রশ্রয় দেন কাউন্সিলর। নিজে ‘ভালো’ থেকে কাউন্সিলর তার নিজস্ব লোকজন দিয়ে এসব করাচ্ছেন। মূলত ‘মুখোশধারী ভালো মানুষ’ তিনি।

এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কাউন্সিলর নূরে আলম বলেন, ‘আমি স্বচ্ছতার সঙ্গে এলাকায় কাজ করার চেষ্টা করি। আমার এলাকা ঘুরে দেখেন আমার বদনাম কেউ করে কি না। আমার ওয়ার্ড ভালো চলছে।’

কামরাঙ্গীরচর থানা আওয়ামী লীগের এক নেতা জানান, কাউন্সিলরের ছত্রছায়ায় থেকে ৫৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জসিম মুন্সীর নেতৃত্বে বিশাল সিন্ডিকেট মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করে। আবু সাইদ বাজারের কাছে কাউন্সিলরের কার্যালয়ের পাশেই সফিউল্লার বাড়িতে মাদকের কারবার চালায় কাউন্সিলরের ভাগিনা জসিম ও তার দলবল। তার বিষয়ে কাউন্সিলরকে অভিযোগ দেওয়ার পরও ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। জসিম মুন্সীদের সিন্ডিকেটে সহযোগী হিসেবে কাজ করে কানা শাহজাহান, মাসুদ মিন্টু, সবুজ সানি, সোহেল, শাকিল ও মিজান। তারা আবু সাইদ বাজার ও আশপাশের এলাকায় নিয়মিত ইয়াবা ও ফেনডিসিলের হাট বসায়। স্থানীয় প্রশাসন সেগুলো দেখেও কোনো ব্যবস্থা নেয় না। এলাকার জাউলাহাটি, কালুনগর, ঝাউচর, খোলামুড়া ও নয়াগাঁও এলাকাতেও মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ এই সিন্ডিকেটের হাতেই।

স্থানীয়রা বলেন, কাউন্সিলর নূরে আলম পারিবারিকভাবে কামরাঙ্গীরচরের স্থানীয় এবং তারা সেখানকার বিপুল সম্পদের মালিক। সম্প্রতি তিনি কলকাতায় একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন। সেখানে নিজে ও পরিবারের লোকজন প্রায়ই গিয়ে থাকেন। কলকাতা থেকেও তার বাড়িতে লোকজন আসে। ওই ফ্ল্যাট কেনার নামে তিনি অর্থ পাচারও করেছেন ভারতে। কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের বা খাসজমি দখলের সরাসরি অভিযোগ না থাকলেও তার ডানহাত হিসেবে পরিচিত শাকিল ও মাসুদের নেতৃত্বে এলাকায় বেপরোয়াভাবে দখল বাণিজ্য চলে। তারা জালিয়াতি করে বিভিন্ন ব্যক্তির জমিজমা দখলের চেষ্টা করেন। পরে চাঁদার বিনিময়ে ছেড়ে দেন। ওই টাকার ভাগ কাউন্সিলরের পকেটেও। কাউন্সিলরের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত জামাই সেলিম ও ফজলুল করিমের বিরুদ্ধেও অবৈধ দখলের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে।

কালুনগরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আওয়ামী লীগ নেতা জানান, কালুনগর মৌজায় মুর্তুজা ওরফে ‘মুত্তুর’ নেতৃত্বে খাসজমি ও মাদ্রাসার নামে দানপত্র করা সম্পত্তি দখল করা হয়েছে। ‘মুত্তু’ কাউন্সিলরের প্রভাব খাটিয়ে নির্বিঘ্নে এই দখলের কাজ করছেন। আরেক নেতা বলেন, নূরে আলম মূলত ‘মুখোশধারী ভালো মানুষ’। আড়ালে থেকে নিজের লোক দিয়ে জালিয়াতি করে অন্যের জমি দখল ও ভরাট করে বিক্রি করেন। এ রকম আরও অভিযোগ আছে স্থানীয়দের। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, নূরে আলম তরুণ বয়স থেকেই জমির মাপজোখ ও কাজগপত্র ভালো বুঝতেন। এ কারণে জমির দালাল সিন্ডিকেটের সঙ্গে তরুণ বয়স থেকেই তার সখ্য। প্রথম দিকে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতেন। পরে জমির দালালিকে একরকম পেশা হিসেবেই নেন। বিরোধপূর্ণ বা কাজগপত্রে ত্রুটিযুক্ত জমি কম দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করে মোটা অঙ্কের অর্থ কামিয়েছেন তিনি।

স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, সম্প্রতি ৫৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয় থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশার নম্বর দিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়। ওইসব রিকশা থেকে মাসে ৩০০ টাকা ও অটোরিকশা থেকে ৫০০ টাকা করে নেওয়া হয়।

অভিযোগ আছে, এলাকার খেয়াঘাট, ডিশলাইন ও ইন্টারনেট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণও করে কাউন্সিলরের ভাগিনা জসিম, মাসুদ মিন্টু, জামাই সেলিম, শাকিল ও কানা শাহজাহানসহ একটি সিন্ডিকেট। তারা এলাকার অন্য ডিশ ব্যবসায়ীদের থেকেও চাঁদা আদায় করে। খোলামোড়া ও ঝাউচর খেয়াঘাট কাউন্সিলর তার নিজস্ব লোক দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করেন। এই দুটি ঘাটে বছরে অর্ধ কোটি টাকা চাঁদা ওঠে।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, কাউন্সিলর কার্যালয় থেকে উত্তরাধিকার সনদ, বিধবা ভাতার কার্ড নেওয়াসহ যেকোনো সেবা নিতে গেলে টাকা দিতে হয়। এ বিষয়ে কাউন্সিলরকে কয়েক দফা জানিয়েও প্রতিকার মেলেনি। নারী নির্যাতন, তালাক, যৌতুকের সমস্যা, অবৈধ দখলসহ কোনো সমস্যার জন্য তার কাছে গিয়ে প্রতিকার পাওয়া যায় না। ‘ঝামেলা’ এড়াতে এসব বিষয়ে তিনি থানা পুলিশের কাছে বা আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দেন।

কিছু দিন আগে ঢাকা দক্ষিণের মেয়র বিদেশ সফরে গেলে ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব দেওয়া হয় নূরে আলমকে। এ সময় তিনি এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও ক্যাডার বাহিনী নিয়ে দুই শতাধিক মোটরসাইকেল ও বিশাল গাড়িবহরে মহড়া দেন। এতে এলাকার মানুষের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়।

জাউলাহাটি, নয়াগাঁও এবং খোলামুড়া এলাকার বাসিন্দারা অভিযোগ করে বলেন, গ্যাস সংযোগ দেওয়ার নামে প্রত্যেক বাড়ি থেকে মোটা অঙ্কের টাকা তোলেন কাউন্সিলরের লোকজন। কিন্তু অনেকেই টাকা দিয়েও গ্যাস সংযোগ পাননি। বাসাবাড়ির ময়লা নামানোর নামেও মোটা অঙ্কের টাকা তোলে কাউন্সিলর বাহিনী। যদিও এলাকায় রাস্তাঘাট অপরিচ্ছন্ন ও ভাঙাচোরা। রাস্তায় বাতি না থাকায় চুরি ছিনতাই হয় মাঝেমধ্যেই। মশার ওষুধ না ছিটানোর অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।

এসব বিষয়ে কাউন্সিলর নূরে আলমের বক্তব্য জানতে চাইলে  তিনি বলেন, ‘আমার ওয়ার্ড অন্য যেকোনো ওয়ার্ডের তুলনায় ভালো চলছে। এখানে নিম্ন আয়ের গরিব মানুষ বেশি থাকে। তাদের সমস্যাও বেশি। এ কারণে অনেক সময় সবাইকে কাক্সিক্ষত সেবা দেওয়া সম্ভব হয় না।’ মাদকের কারবারি জসিম মুন্সী ও তার দলবলকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জসিমের বিরুদ্ধে যতটা প্রচার হচ্ছে সে অত খারাপ নয়। সে এখন কোথাও যায়টায় না। একটি ভুল বোঝাবুঝি থেকে র‌্যাব তাকে আটক করেছিল। পরে আদালত থেকে জামিন পেয়েছে।’ মাসুদ মিন্টু, সবুজ সানি, সোহেল ও শাকিলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার বিষয়ে কাউন্সিলর নূরে আলম বলেন, ‘তারাও তেমন খারাপ নয়। আওয়ামী লীগের অনুষ্ঠানের সময় তারা একটি বাড়িতে যায়। ওই বাড়ির ভাড়াটিয়ার সঙ্গে বাড়িওয়ালা ঝামেলা হয়। তা মেটানো নিয়ে একটু ঝামেলা হলে পুলিশ আসে। পরে সব ঠিক হয়ে যায়। ওই কারণে তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপপ্রচার করা হচ্ছে।’ কাউন্সিলর নূরে আলমের দাবি, তিনি মাদক, বাল্যবিবাহ, সামাজিক অবক্ষয় এসবের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সোচ্চার এবং কাউন্সিলর হিসেবে সফল।