infoamaderdin@gmail.com বৃহঃস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
১ শ্রাবণ ১৪৩৩

ফাইনাল রিপোর্ট

বিয়েই করেননি বাদী, ‘স্ত্রী’ খুনের দায়ে শেখ হাসিনাসহ ৮৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা!

প্রকাশিত: ১৬ জুলাই ২০২৬ ১৫:০৭ পিএম

বিয়েই করেননি মো. সুমন (৩৪)। অথচ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে তাঁর ‘স্ত্রী’ ফাতেমা (২১) গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন—এমন মিথ্যা দাবি করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৮৪ জনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছিলেন তিনি ।

পুলিশি তদন্তে এই চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির তথ্য উঠে আসার পর মামলাটিকে সম্পূর্ণ ‘মিথ্যা’ উল্লেখ করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন (ফাইনাল রিপোর্ট মিথ্যা) দাখিল করা হয়েছে।

একই সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মামলার এজাহারনামীয় ও অজ্ঞাতনামা সব আসামিকে এই মামলার দায় থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করেছে পুলিশ। গত ২৭ এপ্রিল (২০২৬) ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শাহাদাত হোসেন এই প্রতিবেদন দাখিল করেন।

নথি সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদপুর থানায় এই হত্যা মামলাটি (মামলা নং- ৬২) দায়ের করা হয়। মামলার বাদী মো. সুমন এজাহারে দাবি করেছিলেন, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বিকেলে তাঁর স্ত্রী ফাতেমা বাসিলা ব্রিজের নিচে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন । সেখানে ১ থেকে ২০ নম্বর আসামির নির্দেশনায় নির্বিচারে গুলি চালানো হলে ফাতেমা গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। পরে লাশ নিয়ে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে কোনো উপায় না পেয়ে আশুলিয়ার ইয়ারপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়।

এই মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা ছাড়াও দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের আসামি করা হয়েছিল।

তদন্তে কথিত ‘স্ত্রী’র অস্তিত্বই মেলেনি
মামলাটি তদন্ত করতে গিয়ে শুরুতেই বড় ধাক্কা খায় পুলিশ। বাদী সুমন তাঁর ‘স্ত্রী’র চিকিৎসার কোনো হাসপাতাল সংক্রান্ত কাগজপত্র বা মৃত্যুর কোনো প্রমাণপত্র পুলিশকে সরবরাহ করতে পারেননি । এজাহারে দেওয়া সুমনের বর্তমান বা স্থায়ী ঠিকানায় খোঁজ নিয়ে পুলিশ তাঁর কিংবা কথিত নিহত স্ত্রী ফাতেমার কোনো সন্ধান পায়নি।

এরপর তদন্ত কর্মকর্তা আশুলিয়ার ইয়ারপুর কবরস্থানে গিয়ে খোঁজ নেন । কবরস্থান কর্তৃপক্ষ পুলিশকে জানায়, সেখানে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নিহত কোনো নারীর লাশ দাফন করা হয়নি এবং এটি একটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও সংরক্ষিত কবরস্থান । এছাড়া বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নিহতদের সরকারি শহীদ গেজেট কিংবা কোনো বেসরকারি মানবাধিকার বা রাজনৈতিক সংগঠনের তালিকাতেও ‘ফাতেমা’ নামের কোনো নারী নিহতের তথ্য পাওয়া যায়নি।

দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর পুলিশ যখন বাদী মো. সুমনকে খুঁজে পেয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে, তখন বেরিয়ে আসে মূল সত্য। সুমন পুলিশের কাছে স্বীকার করেন যে তিনি জীবনে কখনো বিয়েই করেননি এবং ‘ফাতেমা’ নামের কোনো স্ত্রী তাঁর ছিল না। এমনকি ফাতেমা নামের কোনো ভুক্তভোগীকে তিনি চেনেনও না।

সুমন লিখিত জবানবন্দিতে জানান, রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে একটি স্বার্থান্বেষী চক্র তাঁকে বড় অঙ্কের টাকা দেওয়ার লোভ দেখায় এবং মামলা না করলে বড় ধরনের ক্ষতির ভয়ভীতি প্রদর্শন করে। চক্রটি নিজেরাই মামলার এজাহার লিখে তৈরি করে সুমনের স্বাক্ষর নিয়ে নেয়। পরে সুমন মামলার ভয়াবহতা বুঝতে পেয়ে ভয় পেয়ে ফোন বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে যান।

তদন্ত কর্মকর্তা চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, বাদী সুমন বিয়েই করেননি এবং তাঁর কথিত স্ত্রী ফাতেমা নিহতের ঘটনাটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও জালিয়াতিপূর্ণ। ঘটনার কোনো প্রাথমিক সত্যতা না পাওয়ায় এই মামলায় গ্রেফতার হওয়া বিল্লাল নামের এক ব্যক্তিসহ মামলার এজাহারনামীয় শেখ হাসিনাসহ ৮৪ জন এবং অজ্ঞাতনামা ৩০-৪০ জন আসামিকে মামলার দায় হতে অব্যাহতি দেওয়া আবশ্যক । আদালত মামলাটি থেকে সবাইকে অব্যাহতি দিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি গ্রহণ করবেন বলে পুলিশ আশা প্রকাশ করেছে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


ফাইনাল রিপোর্ট

বিয়েই করেননি বাদী, ‘স্ত্রী’ খুনের দায়ে শেখ হাসিনাসহ ৮৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা!


প্রকাশিত: ১৬ জুলাই ২০২৬ ১৫:০৭ পিএম

বিয়েই করেননি মো. সুমন (৩৪)। অথচ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে তাঁর ‘স্ত্রী’ ফাতেমা (২১) গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন—এমন মিথ্যা দাবি করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৮৪ জনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছিলেন তিনি ।

পুলিশি তদন্তে এই চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির তথ্য উঠে আসার পর মামলাটিকে সম্পূর্ণ ‘মিথ্যা’ উল্লেখ করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন (ফাইনাল রিপোর্ট মিথ্যা) দাখিল করা হয়েছে।

একই সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মামলার এজাহারনামীয় ও অজ্ঞাতনামা সব আসামিকে এই মামলার দায় থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করেছে পুলিশ। গত ২৭ এপ্রিল (২০২৬) ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শাহাদাত হোসেন এই প্রতিবেদন দাখিল করেন।

নথি সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদপুর থানায় এই হত্যা মামলাটি (মামলা নং- ৬২) দায়ের করা হয়। মামলার বাদী মো. সুমন এজাহারে দাবি করেছিলেন, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বিকেলে তাঁর স্ত্রী ফাতেমা বাসিলা ব্রিজের নিচে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন । সেখানে ১ থেকে ২০ নম্বর আসামির নির্দেশনায় নির্বিচারে গুলি চালানো হলে ফাতেমা গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। পরে লাশ নিয়ে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে কোনো উপায় না পেয়ে আশুলিয়ার ইয়ারপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়।

এই মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা ছাড়াও দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের আসামি করা হয়েছিল।

তদন্তে কথিত ‘স্ত্রী’র অস্তিত্বই মেলেনি
মামলাটি তদন্ত করতে গিয়ে শুরুতেই বড় ধাক্কা খায় পুলিশ। বাদী সুমন তাঁর ‘স্ত্রী’র চিকিৎসার কোনো হাসপাতাল সংক্রান্ত কাগজপত্র বা মৃত্যুর কোনো প্রমাণপত্র পুলিশকে সরবরাহ করতে পারেননি । এজাহারে দেওয়া সুমনের বর্তমান বা স্থায়ী ঠিকানায় খোঁজ নিয়ে পুলিশ তাঁর কিংবা কথিত নিহত স্ত্রী ফাতেমার কোনো সন্ধান পায়নি।

এরপর তদন্ত কর্মকর্তা আশুলিয়ার ইয়ারপুর কবরস্থানে গিয়ে খোঁজ নেন । কবরস্থান কর্তৃপক্ষ পুলিশকে জানায়, সেখানে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নিহত কোনো নারীর লাশ দাফন করা হয়নি এবং এটি একটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও সংরক্ষিত কবরস্থান । এছাড়া বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নিহতদের সরকারি শহীদ গেজেট কিংবা কোনো বেসরকারি মানবাধিকার বা রাজনৈতিক সংগঠনের তালিকাতেও ‘ফাতেমা’ নামের কোনো নারী নিহতের তথ্য পাওয়া যায়নি।

দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর পুলিশ যখন বাদী মো. সুমনকে খুঁজে পেয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে, তখন বেরিয়ে আসে মূল সত্য। সুমন পুলিশের কাছে স্বীকার করেন যে তিনি জীবনে কখনো বিয়েই করেননি এবং ‘ফাতেমা’ নামের কোনো স্ত্রী তাঁর ছিল না। এমনকি ফাতেমা নামের কোনো ভুক্তভোগীকে তিনি চেনেনও না।

সুমন লিখিত জবানবন্দিতে জানান, রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে একটি স্বার্থান্বেষী চক্র তাঁকে বড় অঙ্কের টাকা দেওয়ার লোভ দেখায় এবং মামলা না করলে বড় ধরনের ক্ষতির ভয়ভীতি প্রদর্শন করে। চক্রটি নিজেরাই মামলার এজাহার লিখে তৈরি করে সুমনের স্বাক্ষর নিয়ে নেয়। পরে সুমন মামলার ভয়াবহতা বুঝতে পেয়ে ভয় পেয়ে ফোন বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে যান।

তদন্ত কর্মকর্তা চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, বাদী সুমন বিয়েই করেননি এবং তাঁর কথিত স্ত্রী ফাতেমা নিহতের ঘটনাটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও জালিয়াতিপূর্ণ। ঘটনার কোনো প্রাথমিক সত্যতা না পাওয়ায় এই মামলায় গ্রেফতার হওয়া বিল্লাল নামের এক ব্যক্তিসহ মামলার এজাহারনামীয় শেখ হাসিনাসহ ৮৪ জন এবং অজ্ঞাতনামা ৩০-৪০ জন আসামিকে মামলার দায় হতে অব্যাহতি দেওয়া আবশ্যক । আদালত মামলাটি থেকে সবাইকে অব্যাহতি দিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি গ্রহণ করবেন বলে পুলিশ আশা প্রকাশ করেছে।

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর