হোটেল বন্ধের নোটিশে বিপাকে বাংলাদেশিরা, কলকাতায় বেড়েছে থাকার খরচ
কলকাতার নিউমার্কেট এলাকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর আবাসিক হোটেলগুলোতে প্রশাসনের অভিযান ও বন্ধের নোটিশে বিপাকে পড়েছেন বাংলাদেশি পর্যটক ও চিকিৎসাপ্রত্যাশীরা। একাধিক হোটেল খালি করার নির্দেশ দেওয়ায় অনেক বাংলাদেশিকে হোটেল ছাড়তে হয়েছে। বিকল্প আবাসনের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় শহরের কয়েকটি এলাকায় হোটেল ভাড়া স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ পর্যন্ত বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
গত ১৮ আগস্ট নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ঘুমন্ত অবস্থায় নয়জনের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে সাতজন বাংলাদেশি নাগরিক ছিলেন। এ ঘটনার পর কলকাতা পৌরসভা, ফায়ার সার্ভিস ও কলকাতা পুলিশ নিউমার্কেট ও আশপাশের এলাকায় আবাসিক হোটেলগুলোর বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান শুরু করেছে।
অভিযানের অংশ হিসেবে কলিন স্ট্রিট, রফি আহমেদ স্ট্রিট, মির্জা গালিব স্ট্রিট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট ও মার্কুইস স্ট্রিটসহ বিভিন্ন এলাকার বেশ কয়েকটি হোটেলকে বন্ধের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তা ও ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স না থাকার অভিযোগে এসব হোটেলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
হোটেল ছাড়তে হচ্ছে বাংলাদেশিদের
নিউমার্কেট এলাকার বিভিন্ন হোটেলে অবস্থান করছিলেন বাংলাদেশি পর্যটক ও চিকিৎসাপ্রত্যাশীরা। প্রশাসনের নির্দেশে তাঁদেরও হোটেল ছাড়তে হচ্ছে।
নিউমার্কেটের একটি হোটেলের মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তাঁর হোটেলে প্রায় ৫০ জন বাংলাদেশি পর্যটক অবস্থান করছিলেন। সোমবার (২৪ আগস্ট) তাঁদের হোটেল ছাড়তে বলা হয়। এর আগের দিন রোববার কলকাতা পৌরসভা ও পুলিশ এসে হোটেল খালি করার নির্দেশ দিয়ে যায় বলে জানান তিনি।
হোটেল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তে শুধু বাংলাদেশি নাগরিকরাই নয়, হোটেল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত কর্মী ও মালিকরাও সমস্যায় পড়েছেন।
বিকল্প হোটেলে বাড়তি ভাড়া
নিউমার্কেট এলাকায় হোটেল খালি করার নির্দেশ পাওয়ার পর বাংলাদেশি পর্যটকদের অনেকে পার্ক স্ট্রিট, মেহেদি বাগান, পার্ক সার্কাস ও জাকারিয়া স্ট্রিটের দিকে চলে যাচ্ছেন। এসব এলাকায় যেসব হোটেল এখনো বন্ধের নোটিশ পায়নি, সেগুলোতে আবাসনের চাপ বেড়েছে।
চাহিদা বাড়ার সুযোগে এসব এলাকায় হোটেল ভাড়া স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ বা কোথাও কোথাও তিনগুণ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
গ্রিন লাইনের ম্যানেজার শ্যামল ঘোষ বলেন, বাংলাদেশ থেকে এখন অনেক পর্যটক কলকাতায় আসছেন। ঢাকা থেকে আসা গাড়িগুলোও প্রায় পূর্ণ থাকছে। কিন্তু মার্কুইস স্ট্রিটে থাকার জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অনেকেই সদর স্ট্রিট, পার্ক সার্কাস, মেহেদি বাগান, পার্ক স্ট্রিট ও জাকারিয়া স্ট্রিটের হোটেলগুলোতে চলে যাচ্ছেন।
তিনি বলেন, এসব এলাকায় হোটেল ভাড়া স্বাভাবিকের তুলনায় দ্বিগুণ বা তিনগুণ নেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশি পর্যটকেরা এসে খুব অসহায় পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন। দ্রুত এই সমস্যার সমাধান হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
চাকরি হারানোর শঙ্কায় হোটেলকর্মীরা
হোটেল বন্ধের নোটিশে শুধু পর্যটকরাই নন, বিপাকে পড়েছেন হোটেলকর্মীরাও। অনেক কর্মী চাকরি হারানোর আশঙ্কা করছেন।
নিউমার্কেটের একটি হোটেলের কর্মচারী সেলিম বলেন, ‘ব্যবসার অবস্থা খুব খারাপ। মির্জা গালিব স্ট্রিটে আগুন লেগেছে, আর হোটেল বন্ধ করার নোটিশ দিচ্ছে আমাদের এখানে। আমাদের পেটে লাথি মেরে দিয়েছে।’
প্রশাসনের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে তিনি বলেন, হোটেলগুলোকে আরও কিছু সময় দেওয়া যেত। হঠাৎ করে বন্ধের নির্দেশ দেওয়ায় তাঁদের চাকরি চলে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পরিবার নিয়ে এখন কীভাবে চলবেন, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
চিকিৎসার জন্য এসেও বিপাকে বাংলাদেশি
কলকাতায় চিকিৎসার জন্য আসা বাংলাদেশি নাগরিকরাও হোটেল বন্ধের কারণে ভোগান্তিতে পড়েছেন। ঢাকার বাসিন্দা নাসিব পাপ্পু চিকিৎসার জন্য কলকাতায় গিয়ে এই সমস্যার মুখে পড়েন।
তিনি জানান, রোববার বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় গিয়ে বিকেলে একটি হোটেলে ওঠেন। হোটেলে ওঠার সময় তাঁকে কোনো সমস্যার কথা জানানো হয়নি। পরে বাইরে থেকে ফিরে হোটেল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জানতে পারেন, থানার পক্ষ থেকে হোটেল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সোমবার সকাল ১০টার মধ্যে তাঁকে হোটেল ছেড়ে দিতে বলা হয়।
শেষ পর্যন্ত সোমবার সকালে হোটেল ছাড়েন তিনি। নাসিব বলেন, চিকিৎসার জন্য কলকাতায় এসে হোটেল নিয়ে এমন সমস্যায় পড়তে হবে, তা ভাবেননি। এ ঘটনার পর ভবিষ্যতে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসার বিষয়েও তাঁকে নতুন করে ভাবতে হবে।
তাঁর মতে, দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশিদের জন্য পর্যটন ভিসা চালু হয়েছে। এর পরপরই এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে বাংলাদেশি পর্যটকেরা কলকাতার প্রতি আগ্রহ হারাতে পারেন।
আগুনের পর নিরাপত্তা নিয়ে কঠোর প্রশাসন
গত ১৮ আগস্ট মির্জা গালিব স্ট্রিটের শিখা ইন হোটেলে আগুনে নয়জনের মৃত্যুর পর কলকাতার নিউমার্কেট ও আশপাশের এলাকায় হোটেলগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এরপর প্রশাসন বিভিন্ন হোটেলে অভিযান চালিয়ে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ও নিরাপত্তাব্যবস্থা যাচাই করছে।
অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি থাকা হোটেলগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াকে প্রশাসনের নিয়মিত নিরাপত্তা তৎপরতা হিসেবে দেখা হলেও এর তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশি পর্যটক, চিকিৎসাপ্রত্যাশী এবং স্থানীয় হোটেল ব্যবসার ওপর। হঠাৎ আবাসনের সংকট তৈরি হওয়ায় বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে অনেককে।
নিউমার্কেটের হোটেলগুলোতে অভিযান ও বন্ধের নোটিশের পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে বাংলাদেশি পর্যটকদের পাশাপাশি কলকাতার পর্যটন ও হোটেল ব্যবসাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: