infoamaderdin@gmail.com সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬
৯ ভাদ্র ১৪৩৩

রংপুর হত্যাকাণ্ড

দুই আসামি গ্রেপ্তার হলেও যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২৪ আগষ্ট ২০২৬ ১৪:০৮ পিএম

রংপুর হত্যাকাণ্ডে আটক হওয়া দুই আসামি।

রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় পুলিশ দুইজনকে গ্রেফতার করলেও পুরো রহস্যের জট এখনো খোলেনি। হত্যাকাণ্ডে শুধু দু’জনই জড়িত ছিলেন কি না, ঘটনার পর তারা কীভাবে এত সময় বাড়িতে অবস্থান করলেন, ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল কি না, কিংবা মরদেহে কোনো রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

পুলিশ বলছে, গ্রেফতারকৃত দুই আসামির সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেলেও তদন্তে আরও বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর এসব বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

পুলিশ যা বলছে
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ জানান, গ্রেফতার মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ঘটনাস্থল থেকে বেশ কিছু আলামত উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের বক্তব্যের সঙ্গে মিল পাওয়া গেছে—বাড়িতে ইয়াবা, খেজুর ও অর্ধেক কামড় দেওয়া শসা পাওয়া গেছে। এ ছাড়া চুরি করা সোনার অলংকার মন্দিরের পাশের নারিকেল গাছের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘ঘটনার আগে ও পরে তারা ইয়াবা সেবন করেছে। খেজুরের বিচি আমরা ডিএনএ টেস্টে দিয়েছি। সোনা পরীক্ষা করে তারা আসল-নকল শনাক্ত করেছে। এ থেকে বোঝা যায় সোনা সম্পর্কে অভিজ্ঞ কেউ জড়িত ছিল।’

তিনি আরও জানান, হত্যার পর খুনিরা পরিবারের মোবাইলফোনগুলো ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে ভিজিয়ে রাখে, যাতে আঙুলের ছাপ না থাকে।

স্বজনদের সন্দেহ
তবে পুলিশের বক্তব্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন নিহতদের স্বজনেরা। তাদের দাবি, চারজন মানুষকে হত্যার ঘটনায় মাত্র দুই মাদকাসক্ত যুবকের সম্পৃক্ততার বিষয়টি সহজে মেনে নেওয়া কঠিন।

এক স্বজন বলেন, ‘আমি মনে করি এটার অন্য কোনো কারণ আছে। এটা প্রস্তুত করা নাটক।’

স্থানীয়দের প্রশ্ন
শুক্রবার (২১ আগস্ট) ভোরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেও মরদেহ উদ্ধার করা হয় শনিবার (২২ আগস্ট) রাত ১১টার পর। এর মধ্যে মরদেহ থেকে তীব্র দুর্গন্ধ বের হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাদের কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, মরদেহে কোনো রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয়েছিল কি না বা ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত কি না।

এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ‘এরকম গন্ধ তো আমরা কল্পনাও করিনি। ঘটনার পেছনে অন্য কোনো ষড়যন্ত্র আছে, অন্য লোকও জড়িত থাকতে পারে।’

তবে পুলিশ কমিশনার জানিয়েছেন, মরদেহে কোনো রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের আলামত পাওয়া যায়নি। তার ভাষ্য, ‘মাদকসেবীরা একের পর এক খুন করেছে।’

বাড়ি নির্মাণের টাকার প্রসঙ্গ
নিহত গণপতির আরেক স্বজন বলেন, ‘উনি বাড়ি করার সময় অনেক সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলেন। আমাকে বলেছিলেন, তার কাছে টাকা চাওয়া হয়েছিল, পরে তিনি সেটা মীমাংসা করেছেন।’

ময়নাতদন্তে যা পাওয়া গেছে
এদিকে ময়নাতদন্তে নিশ্চিত হয়েছে, নিহতদের মৃত্যু শ্বাসরোধে হয়েছে। মরদেহে কোনো রাসায়নিক পদার্থ বা এসিড ব্যবহারের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ফরেনসিক বিভাগ জানিয়েছে, পচনের কারণেই মুখমণ্ডল ঝলসে যাওয়ার মতো দেখাচ্ছিল।

আইনি প্রক্রিয়া
এ ঘটনায় কোতয়ালি থানায় নিহতের বড়ো ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে মামলা করেছেন। মামলার আসামি সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে কারাগারে রয়েছেন।

পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত শেষে দ্রুত আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে। তবে স্বজন ও স্থানীয়দের দাবি, ঘটনার পুরো রহস্য উদঘাটনে আরও গভীর ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


রংপুর হত্যাকাণ্ড

দুই আসামি গ্রেপ্তার হলেও যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৪ আগষ্ট ২০২৬ ১৪:০৮ পিএম

রংপুর হত্যাকাণ্ডে আটক হওয়া দুই আসামি।

রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় পুলিশ দুইজনকে গ্রেফতার করলেও পুরো রহস্যের জট এখনো খোলেনি। হত্যাকাণ্ডে শুধু দু’জনই জড়িত ছিলেন কি না, ঘটনার পর তারা কীভাবে এত সময় বাড়িতে অবস্থান করলেন, ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল কি না, কিংবা মরদেহে কোনো রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

পুলিশ বলছে, গ্রেফতারকৃত দুই আসামির সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেলেও তদন্তে আরও বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর এসব বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

পুলিশ যা বলছে
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ জানান, গ্রেফতার মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ঘটনাস্থল থেকে বেশ কিছু আলামত উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের বক্তব্যের সঙ্গে মিল পাওয়া গেছে—বাড়িতে ইয়াবা, খেজুর ও অর্ধেক কামড় দেওয়া শসা পাওয়া গেছে। এ ছাড়া চুরি করা সোনার অলংকার মন্দিরের পাশের নারিকেল গাছের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘ঘটনার আগে ও পরে তারা ইয়াবা সেবন করেছে। খেজুরের বিচি আমরা ডিএনএ টেস্টে দিয়েছি। সোনা পরীক্ষা করে তারা আসল-নকল শনাক্ত করেছে। এ থেকে বোঝা যায় সোনা সম্পর্কে অভিজ্ঞ কেউ জড়িত ছিল।’

তিনি আরও জানান, হত্যার পর খুনিরা পরিবারের মোবাইলফোনগুলো ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে ভিজিয়ে রাখে, যাতে আঙুলের ছাপ না থাকে।

স্বজনদের সন্দেহ
তবে পুলিশের বক্তব্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন নিহতদের স্বজনেরা। তাদের দাবি, চারজন মানুষকে হত্যার ঘটনায় মাত্র দুই মাদকাসক্ত যুবকের সম্পৃক্ততার বিষয়টি সহজে মেনে নেওয়া কঠিন।

এক স্বজন বলেন, ‘আমি মনে করি এটার অন্য কোনো কারণ আছে। এটা প্রস্তুত করা নাটক।’

স্থানীয়দের প্রশ্ন
শুক্রবার (২১ আগস্ট) ভোরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেও মরদেহ উদ্ধার করা হয় শনিবার (২২ আগস্ট) রাত ১১টার পর। এর মধ্যে মরদেহ থেকে তীব্র দুর্গন্ধ বের হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাদের কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, মরদেহে কোনো রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয়েছিল কি না বা ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত কি না।

এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ‘এরকম গন্ধ তো আমরা কল্পনাও করিনি। ঘটনার পেছনে অন্য কোনো ষড়যন্ত্র আছে, অন্য লোকও জড়িত থাকতে পারে।’

তবে পুলিশ কমিশনার জানিয়েছেন, মরদেহে কোনো রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের আলামত পাওয়া যায়নি। তার ভাষ্য, ‘মাদকসেবীরা একের পর এক খুন করেছে।’

বাড়ি নির্মাণের টাকার প্রসঙ্গ
নিহত গণপতির আরেক স্বজন বলেন, ‘উনি বাড়ি করার সময় অনেক সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলেন। আমাকে বলেছিলেন, তার কাছে টাকা চাওয়া হয়েছিল, পরে তিনি সেটা মীমাংসা করেছেন।’

ময়নাতদন্তে যা পাওয়া গেছে
এদিকে ময়নাতদন্তে নিশ্চিত হয়েছে, নিহতদের মৃত্যু শ্বাসরোধে হয়েছে। মরদেহে কোনো রাসায়নিক পদার্থ বা এসিড ব্যবহারের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ফরেনসিক বিভাগ জানিয়েছে, পচনের কারণেই মুখমণ্ডল ঝলসে যাওয়ার মতো দেখাচ্ছিল।

আইনি প্রক্রিয়া
এ ঘটনায় কোতয়ালি থানায় নিহতের বড়ো ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে মামলা করেছেন। মামলার আসামি সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে কারাগারে রয়েছেন।

পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত শেষে দ্রুত আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে। তবে স্বজন ও স্থানীয়দের দাবি, ঘটনার পুরো রহস্য উদঘাটনে আরও গভীর ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর