নেপালের জলবিদ্যুৎ টানেলে ৯ শতাধিক মানুষ আটকা
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর দেশটির ছয়টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেল ও ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় ৯০০ জনের বেশি মানুষ আটকা পড়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের উদ্ধারে কাদা ও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে টানেলে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন উদ্ধারকারীরা। খবর দ্য গার্ডিয়ানের।
সোমবার (৩১ আগস্ট) নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো থেকে ৯৩৩ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের উদ্ধারে বর্তমানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
গত বুধবার হিমালয় থেকে বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের ভয়াবহ স্রোত নেমে এসে নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকায় নজিরবিহীন ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। এতে দেশটিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯১৯ জনে দাঁড়িয়েছে। সীমান্তের তিব্বত অংশে আরও ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। নেপালে এখনো ৪ হাজার ২৪৭ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৫৯২ জন বিদেশি নাগরিক। তিব্বতে নিখোঁজ রয়েছেন আরও ৫৪৬ জন।
উদ্ধারকারী দলগুলোর প্রকাশ করা ছবি ও ভিডিওতে দেখা গেছে, ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে টানেলের প্রবেশমুখে জমে থাকা কাদা ও ধ্বংসস্তূপ সরানোর চেষ্টা চলছে। নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেত বলেন, বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ টানেলের ভেতরে জমে যাওয়ায় উদ্ধারকাজে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
রেসকিউ দলের সদস্য আশিস গুরুং জানান, টানেলের ভেতরের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। সেখানে কাদার গভীরতা কোথাও বুক পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। রোববার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি রুস্বানার চিলিমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে পৌঁছানোর চেষ্টা করছিল তার দল।
টানেলের ভেতরে কাদার গভীরতা পরিমাপ করতে পর্বতারোহীরা কাঠের তক্তা ব্যবহার করেন। পরে সেগুলো দিয়েই অস্থায়ী সেতু তৈরি করা হয়। নিরাপত্তার জন্য দড়ির ব্যবস্থাও করা হয়।
গুরুং বলেন, তারা টানেলের প্রায় ১৩০ মিটার ভেতরে যেতে পেরেছিলেন। এরপর আরও ভেতরে মরদেহের মতো কিছু দেখা যাচ্ছিল।
তবে জলবিদ্যুৎ কোম্পানি উদ্ধারকারী দলকে দেওয়া নকশায় জানিয়েছে, টানেলের ভেতরে এমন কিছু নিরাপদ এলাকা রয়েছে যেখানে আটকে পড়া ব্যক্তিরা আশ্রয় নিয়ে বেঁচে থাকতে পারেন।
গুরুং বলেন, তাদের জন্য ভেতরে একটি নিরাপদ জায়গা রয়েছে। তাদের কেউ কেউ হয়তো এখনো জীবিত আছেন। আমি আশা করছি, তারা বেঁচে আছেন।
শুক্রবার থেকে খারাপ আবহাওয়া ও নতুন বন্যার আশঙ্কায় কয়েক দফা উদ্ধার অভিযান বন্ধ রাখতে হয়েছে। নেপাল-চীন সীমান্তে দুর্যোগের কারণে তৈরি একটি হ্রদ উপচে পড়ায় নতুন করে নদীগুলোতে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে সোমবার আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় উদ্ধারকাজ আবার গতি পেয়েছে বলে জানিয়েছেন রাসুয়া জেলার প্রশাসক নরেন্দ্র পারিয়ার।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ এই বন্যাকে নজিরবিহীন ও ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। প্রতিকূল আবহাওয়া, দুর্গম ভূখণ্ড ও অব্যাহত ঝুঁকির মধ্যেও মানুষের জীবন বাঁচাতে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
শাহ জানান, উদ্ধার অভিযানে প্রায় ২১ হাজার নিরাপত্তাকর্মীর পাশাপাশি বেসামরিক কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীরাও কাজ করছেন।
অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজে বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন নেই বলে আগে জানিয়েছিল নেপাল। তবে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেল থেকে মানুষ উদ্ধারে প্রতিবেশী ভারত ও চীনের বিশেষজ্ঞ সহায়তা নিচ্ছে দেশটি।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, বেইজিং ২ হাজার একশর বেশি উদ্ধারকর্মী মোতায়েন করেছে। ত্রাণ ও উদ্ধারকাজে অন্তত ২২ কোটি ইউয়ান বরাদ্দ করা হয়েছে। সম্মুখসারির উদ্ধারকারীদের কাছে বিমান থেকে সরঞ্জাম ও ত্রাণসামগ্রীও পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। নিখোঁজদের সন্ধানে চীনা সেনারা জীবন শনাক্তকারী বিশেষ সরঞ্জাম ব্যবহার করছেন।
রেড ক্রসের হিসাবে, এই দুর্যোগে নেপালে ৯০ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
দুর্যোগটির সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা চলছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে হিমবাহের অস্থিতিশীলতা থেকেই এই বিপর্যয়ের সূত্রপাত হয়েছে। তিব্বত মালভূমিতে এ ধরনের ‘ক্রায়োস্ফিয়ার দুর্যোগ’ নতুন ও ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি হয়ে উঠছে বলেও উল্লেখ করেছে তারা।
তবে ভবিষ্যৎ দুর্যোগ মোকাবিলায় তথ্য ভাগাভাগি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রয়টার্সকে নেপালের দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চলতি বছরের শুরুতে সহযোগিতা জোরদার নিয়ে বৈঠকের পর হিমবাহের ঝুঁকি ও পানির স্তর সম্পর্কে চীন খুব বেশি তথ্য দেয়নি। তাদের আশঙ্কা, এ ধরনের তথ্যের ঘাটতি ভবিষ্যতে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতিতে বাধা তৈরি করতে পারে।
এদিকে বন্যায় ভেসে যাওয়া মরদেহগুলোর অনেকগুলো এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। হিমালয়ের বিভিন্ন এলাকায় সেগুলো অগভীর কবরে দাফন করা হচ্ছে। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা আরও পরিবর্তিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: