গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র সংকট
পোশাক খাতে ক্রয়াদেশ হারানোর বড় ঝুঁকিতে বাংলাদেশ
তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে দেশের তৈরি পোশাক খাতের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি না পাওয়ায় অনেক কারখানা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিদেশি ক্রেতাদের ক্রয়াদেশের পণ্য সরবরাহ করতে পারছে না। ফলে সংকট দ্রুত নিরসন না হলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের বড় ধরনের তৈরি পোশাকের ক্রয়াদেশ হারানোর আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
গাজীপুরসহ শিল্পাঞ্চলগুলোর অনেক কারখানায় গ্যাসের চাপ প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। কোথাও উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, আবার কোথাও গ্যাসনির্ভর ইউনিট বন্ধ রাখতে হচ্ছে। উৎপাদন সচল রাখতে কিছু কারখানা ডিজেলসহ বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত।
বিশ্ববাজারেও বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধি বর্তমানে চাপের মুখে রয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ৩ হাজার ৮৮২ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। আগের বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ। একই সময়ে বৈশ্বিক পোশাকের বাজার বেড়েছে ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ। বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনামের পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার ১৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৩ হাজার ৮৭০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। আগের অর্থবছরের ৩ হাজার ৯৩৫ কোটি ডলারের তুলনায় রপ্তানি আয় কমেছে ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ। ইউরোপীয় ইউনিয়নেও বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে ৩ দশমিক ৩১ শতাংশ।
গাজীপুরে তীব্র জ্বালানি সংকট
দেশের অন্যতম প্রধান পোশাক উৎপাদন অঞ্চল গাজীপুরে গ্যাস সংকট সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে শিল্পকারখানাগুলোকে। জেলায় শিল্পখাতে প্রতিদিন প্রায় ৫৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট। ফলে ঘাটতি রয়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশ।
কারখানাগুলোতে যেখানে ৭ থেকে ৮ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন, সেখানে অনেক সময় পাওয়া যাচ্ছে ২ পিএসআই বা তারও কম। এতে গ্যাসনির্ভর বয়লার, ডাইং, ফিনিশিংসহ বিভিন্ন ইউনিটের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
সময়মতো ক্রয়াদেশের পণ্য সরবরাহের জন্য কোনো কোনো কারখানা বাধ্য হয়ে ডিজেল কিংবা অন্যান্য বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করছে। এতে উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। শুধু তৈরি পোশাক কারখানাই নয়, সুতা, বয়ন, নিটিং, ডাইং ও ফিনিশিংয়ের মতো ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পও একই সংকটে পড়েছে।
ক্রয়াদেশ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
এখন পর্যন্ত বিদেশি ক্রেতারা ব্যাপক হারে ক্রয়াদেশ বাতিল না করলেও দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে ব্যর্থ হলে নতুন ক্রয়াদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সতর্ক হতে পারেন বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।
বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, বিদেশি ক্রেতারা চাইলেই তাৎক্ষণিকভাবে ক্রয়াদেশ প্রত্যাহার করতে পারেন না। তাই এখনই বড় ধরনের ক্রয়াদেশ বাতিলের ঘটনা দেখা যাচ্ছে না। তবে দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়তে পারে।
তিনি বলেন, সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে ভবিষ্যতে নতুন কার্যাদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে ক্রেতারা সতর্ক অবস্থান নিতে পারেন।
প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ভোক্তা ব্যয় কমেছে। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা পোশাকের দাম কমানোর জন্য চাপ দিচ্ছেন। একই সময়ে চীন, ভারত ও ভিয়েতনামের রপ্তানিকারকেরা বাজার দখলে আগ্রাসী কৌশল নিয়েছেন।
এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের তুলনামূলক কম দামে ক্রয়াদেশ নিতে হচ্ছে। কিন্তু গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের কারণে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে গিয়ে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। ফলে কম দামে নেওয়া ক্রয়াদেশে মুনাফার পরিমাণ আরও কমে যাচ্ছে।
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে নাজুক পোশাক শিল্প
গার্মেন্টস খাতের প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহসভাপতি সেলিম রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদার পরিবর্তন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, ব্যাংকিং জটিলতা ও নীতিগত অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে অনেক কারখানাকেই টিকে থাকতে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, তার কারখানার ইউরোপীয় এক ক্রেতা প্রতিশ্রুতির তুলনায় ক্রয়াদেশ এক-তৃতীয়াংশ কমিয়েছে। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ক্রেতারা ঝুঁকি নিতে চাইছেন না বলে জানান তিনি।
তার মতে, রপ্তানি কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কারখানা বন্ধ, কর্মসংস্থান হ্রাস, ব্যাংকিং জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার মধ্যে নতুন করে জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে।
এদিকে বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ও এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির পরিবর্তনের পর চীন ও ভিয়েতনাম ইউরোপের বাজারে আগ্রাসী বিপণন কৌশল নিয়েছে। নীতিগত জটিলতা ও গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বাংলাদেশ সেই প্রতিযোগিতায় তাল মেলাতে পারছে না।
দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতের দাবি
এ অবস্থায় তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় কমাতে সহায়তা, সহজ অর্থায়ন, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং ঘোষিত প্রণোদনা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন তারা।
খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু উৎপাদন ব্যাহত হওয়া নয়, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: