infoamaderdin@gmail.com শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
১৪ ভাদ্র ১৪৩৩

দ্রব্যমূল্যের চাপে পিষ্ট মানুষ, দাম না বাড়িয়েও বাড়ছে খরচ

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২৯ আগষ্ট ২০২৬ ১৬:০৮ পিএম

‘আগে হিসাব করতাম পকেটের টাকা দিয়ে কীভাবে ভালোভাবে মাস কাটাব। এখন হিসাব করি, কম খরচে কীভাবে মাসটা শেষ করব।’ কথাটি পাঁচ সদস্যের সংসারের একজন চাকরিজীবী কবির আহমেদের। নিত্যপণ্যের বাড়তি দামের চাপে তার সাপ্তাহিক বাজারের তালিকা থেকে একে একে বাদ পড়ছে পছন্দের খাবার। মাছ-মাংসের বদলে ডিম, সেটিও ব্যয়বহুল মনে হলে ডিমের পরিমাণ কমিয়ে দিতে হচ্ছে। দুধ ও ফলও এখন নিয়মিত কেনা হয় না।

শুধু কবির আহমেদ নন, সীমিত ও নির্দিষ্ট আয়ের বহু পরিবারের একই অবস্থা। আয় একই থাকলেও বিদ্যুৎ, গ্যাস, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার পণ্য, চাল, তেল, ডিম, মুরগিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যে বাড়তি ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে সংসারের বাজেটে টান পড়ছে এবং অনেক পরিবার বাধ্য হচ্ছে খাদ্য ও প্রয়োজনীয় পণ্যে কাটছাঁট করতে।

পুরান ঢাকার বাসিন্দা সায়েদুল হকের সংসারও এমন চাপের মধ্যে পড়েছে। বিয়ের দেড় বছর পরও দুই সদস্যের সংসারে নতুন মুখ আসেনি। তিনি ছাত্র পড়িয়ে এবং তার স্ত্রী চাকরি করে সংসার চালান। কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়তে থাকায় সংসারের প্রতি বিরক্তি তৈরি হচ্ছে বলে জানান তিনি।

সায়েদুলের হিসাবে, মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও টয়লেট্রিজ পণ্যের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চার মাস আগে এক হাজার টাকা বিদ্যুৎ রিচার্জ করে প্রায় ৩৫ দিন ব্যবহার করলেও সাম্প্রতিক সময়ে একই পরিমাণ টাকায় ২১ থেকে ২২ দিনও চলা কঠিন হয়ে পড়েছে। তার দাবি, গত তিন মাসে বিদ্যুৎ বাবদ খরচ প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে।

গ্যাসের খরচও বেড়েছে বলে জানান তিনি। ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডার চার মাস আগে ১ হাজার ৫০০ টাকায় কিনলেও গত মাসে একই সিলিন্ডারের জন্য তাকে দিতে হয়েছে ২ হাজার ২৫০ টাকা।

টয়লেট্রিজ পণ্যের খরচও তার সংসারে বড় চাপ তৈরি করেছে। প্রতি দুই মাসে এসব পণ্যের জন্য যেখানে প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা বাজেট রাখতেন, গত ১৪ আগস্ট একই ধরনের পণ্য কিনতে গিয়ে প্রায় ২ হাজার ৫০০ টাকা খরচ হয়েছে। বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে এখন তুলনামূলক কম দামের স্থানীয় ব্র্যান্ডের পণ্য ব্যবহারের কথা ভাবছেন তিনি।

শুধু ব্র্যান্ডের পণ্য নয়, একই দামে কমছে পরিমাণও। মোহাম্মদপুরের একটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকানের স্বত্বাধিকারী তানভীর জয় জানান, অনেক পণ্যের প্যাকেটের দাম অপরিবর্তিত থাকলেও ওজন কমে যাচ্ছে। বাজারে এই প্রবণতাকে ‘শ্রিংকফ্লেশন’ বলা হয়।

তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৬ গ্রাম ওজনের একটি সার্ফ এক্সেল প্যাকেটের দাম এখন ৫ টাকা। সপ্তাহখানেক আগেও একই দামে প্যাকেটটির ওজন ছিল ১৮ গ্রাম। ১০ টাকার প্যাকেটের ওজন কমে ৩৬ গ্রাম হয়েছে, যেখানে আগে ছিল ৪০ গ্রাম। ৮৫ গ্রামের লাক্স সাবান কমে হয়েছে ৮০ গ্রাম এবং ৬৫ গ্রামেরটি কমে হয়েছে ৬০ গ্রাম।

রিন পাউডারের ক্ষেত্রেও দাম বেড়েছে। এক কেজি রিন পাউডার বর্তমানে ১৭৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এক মাস আগেও সেটি ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে বিক্রি করতেন বলে জানান তানভীর।

ইউনিলিভার জানিয়েছে, কাঁচামালের ব্যয় যতটা বেড়েছে, তার পুরো চাপ ভোক্তার ওপর দেওয়া হয়নি। ভোক্তাদের ওপর মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কমাতে কোম্পানি বিভিন্ন ব্যয়-সাশ্রয়ী উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে পণ্যের ফর্মুলেশন বা উপাদানের অনুপাত পুনর্বিন্যাস করে বিভিন্ন উপকরণের ব্যবহার কমানোর উদ্যোগও রয়েছে।

এদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের বাজারেও বাড়তি দামের চাপ রয়েছে। মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের পাইকারি চাল ব্যবসায়ী মোজাম্মেল হকের ভাষ্য, গত এক সপ্তাহে মিনিকেট চালের ৫০ কেজির বস্তায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দাম পড়েছে। পাইজাম বা মাঝারি মানের চাল কিনতে হচ্ছে বস্তাপ্রতি ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ২৫০ টাকায়। খুচরা বাজারে এর কেজিপ্রতি দাম দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৫২ থেকে ৫৫ টাকা।

গত এক মাসের বাজারচিত্রেও বেশ কয়েকটি পণ্যের দাম বাড়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। খোলা আটার দাম প্রায় সাড়ে ১৪ শতাংশ বেড়েছে। এক মাস আগে ৫৮ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও এখন তা ৬৫ থেকে ৭০ টাকা। প্যাকেটজাত ময়দার দামও বেড়েছে।

পেঁয়াজের দামও বেড়েছে। এক মাস আগে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া পেঁয়াজ এখন ৫৫ থেকে ৬০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১৮৫ থেকে ১৯০ টাকা লিটার এবং খোলা পাম তেল ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকা লিটারে।

বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বর্তমানে প্রায় ২০০ টাকা লিটার। বাজারে সরবরাহ নিয়েও কিছু জায়গায় সংকট দেখা যাচ্ছে। মোহাম্মদপুরের একটি দোকানে এক লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল না পাওয়ার কথাও জানিয়েছেন ক্রেতারা।

ডিমের দামও বেড়েছে। গত মাসে খামারের ডিমের এক ডজনের দাম ১২৫ থেকে ১৩০ টাকা থাকলেও বর্তমানে তা ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ১৯০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে।

তবে সব পণ্যের দাম একসঙ্গে বাড়েনি। সরবরাহ বাড়ায় কিছু সবজির দাম কমেছে। আমদানির কারণে কাঁচামরিচের দামও আগের তুলনায় নিম্নমুখী রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইলিশ, দেশি পেঁয়াজ, মুরগি, কাঁচামরিচ ও রুই মাছের দাম কমার তথ্যও সরকারি পর্যালোচনায় উঠে এসেছে।

সরকারি পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমার চিত্র দেখা গেলেও সাধারণ মানুষের বাজারের অভিজ্ঞতা বলছে ভিন্ন কথা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। আট মাসের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন এবং গত বছরের নভেম্বরের পর সর্বনিম্ন মূল্যস্ফীতি।

তবে ভোক্তাদের দৈনন্দিন ব্যয়ের হিসাব অনেক ক্ষেত্রেই সেই স্বস্তির প্রতিফলন দেখাচ্ছে না। কারণ শুধু পণ্যের মূল্য নয়, জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যয়ের প্রভাবও পরিবারের মোট ব্যয়ের ওপর পড়ছে।

পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি ও জ্বালানি সংকটের প্রভাবে কয়েক দফায় জ্বালানি তেল, এলপিজি ও বিদ্যুতের ব্যয় বাড়ার বিষয়টিও জীবনযাত্রার খরচে প্রভাব ফেলছে। বিদ্যুতের খুচরা দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত থেকে আবাসিকের প্রান্তিক ও প্রথম ধাপের গ্রাহকদের ক্ষেত্রে সরকার সরে এলেও অনেক গ্রাহক বাড়তি বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ করছেন।

গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় অনেকে রান্নার কাজে এলপিজির পাশাপাশি বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছেন। এতে একদিকে বিদ্যুতের খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে এলপিজি কিনতেও বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে।

এলপিজির দামেও সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্য ওঠানামা হয়েছে। এপ্রিল মাসে দুই দফায় দাম বাড়িয়ে ১২ কেজির সিলিন্ডারের নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৯৪০ টাকা পর্যন্ত করা হয়েছিল। সংকটের সময়ে বাজারে গ্রাহকদের ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্তও ব্যয় করতে হয়েছে। জুলাইয়ে দাম কমে ১ হাজার ৫২৮ টাকা হলেও আগস্টে আবার ৭০ টাকা বাড়িয়ে নির্ধারিত মূল্য করা হয় ১ হাজার ৫৯৮ টাকা। তবে বাজারে অনেক সময় নির্ধারিত দামে এলপিজি পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক মোস্তফা কে মুজেরীর মতে, বর্তমানে উৎপাদন বাড়িয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও আয় বাড়ানো কিংবা দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করে মানুষকে স্বস্তি দেওয়া—দুই ক্ষেত্রেই জ্বালানি নিরাপত্তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

তার মতে, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা দূর করা না গেলে অর্থনীতিকে সচল রাখা এবং অন্য উদ্যোগগুলো সফল করা কঠিন হবে।

অন্যদিকে অর্থনীতিবিদদের মতে, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফেরাতে মূলত দুটি পথ রয়েছে। একটি হলো মানুষের আয় বাড়ানো, অন্যটি হলো পণ্য ও সেবার মান ঠিক রেখে দাম ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা।

মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, পণ্যের দাম কমলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে। আবার আয় বাড়লেও ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে। তাই সরকারের একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যদিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

তিনি ‘ডিসেন্ট ওয়ার্ক’ বা ভালো মজুরি ও সঠিক বেতনের কর্মসংস্থান তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেন। তার মতে, মানুষের আয় বাড়ানো এবং নিত্যপণ্যের দাম ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

তবে এই উদ্যোগের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি সংকট। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি সংকটের কারণে বিভিন্ন কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনাও ঘটছে।

আরেক অর্থনীতিবিদ কে এ এস মুর্শিদের মতে, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দেশে পর্যাপ্ত বাফার বা রিজার্ভ না থাকায় বৈশ্বিক কিংবা অভ্যন্তরীণ সরবরাহ সংকট দেখা দিলে তা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

তার মতে, খাদ্য নিরাপত্তার জন্য সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত চাল ও সারের মজুত যেমন প্রয়োজন, তেমনি জ্বালানির ক্ষেত্রেও প্রয়োজন নিরাপত্তামূলক রিজার্ভ। সরবরাহে সংকট দেখা দিলে পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা না থাকলে সাধারণ মানুষের ওপর তার সরাসরি প্রভাব পড়ে।

সব মিলিয়ে সরকারি পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও সীমিত আয়ের মানুষের সংসারে স্বস্তি ফেরেনি। বরং বিদ্যুৎ, গ্যাস, নিত্যপণ্য ও ব্যক্তিগত ব্যবহারের সামগ্রীর বাড়তি খরচে অনেক পরিবারকে খাবার ও প্রয়োজনীয় পণ্যে কাটছাঁট করতে হচ্ছে। আয় না বাড়লে এবং বাজারে পণ্য ও জ্বালানির স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত না হলে এই চাপ থেকে সাধারণ মানুষের দ্রুত মুক্তি মিলবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


দ্রব্যমূল্যের চাপে পিষ্ট মানুষ, দাম না বাড়িয়েও বাড়ছে খরচ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৯ আগষ্ট ২০২৬ ১৬:০৮ পিএম

‘আগে হিসাব করতাম পকেটের টাকা দিয়ে কীভাবে ভালোভাবে মাস কাটাব। এখন হিসাব করি, কম খরচে কীভাবে মাসটা শেষ করব।’ কথাটি পাঁচ সদস্যের সংসারের একজন চাকরিজীবী কবির আহমেদের। নিত্যপণ্যের বাড়তি দামের চাপে তার সাপ্তাহিক বাজারের তালিকা থেকে একে একে বাদ পড়ছে পছন্দের খাবার। মাছ-মাংসের বদলে ডিম, সেটিও ব্যয়বহুল মনে হলে ডিমের পরিমাণ কমিয়ে দিতে হচ্ছে। দুধ ও ফলও এখন নিয়মিত কেনা হয় না।

শুধু কবির আহমেদ নন, সীমিত ও নির্দিষ্ট আয়ের বহু পরিবারের একই অবস্থা। আয় একই থাকলেও বিদ্যুৎ, গ্যাস, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার পণ্য, চাল, তেল, ডিম, মুরগিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যে বাড়তি ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে সংসারের বাজেটে টান পড়ছে এবং অনেক পরিবার বাধ্য হচ্ছে খাদ্য ও প্রয়োজনীয় পণ্যে কাটছাঁট করতে।

পুরান ঢাকার বাসিন্দা সায়েদুল হকের সংসারও এমন চাপের মধ্যে পড়েছে। বিয়ের দেড় বছর পরও দুই সদস্যের সংসারে নতুন মুখ আসেনি। তিনি ছাত্র পড়িয়ে এবং তার স্ত্রী চাকরি করে সংসার চালান। কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়তে থাকায় সংসারের প্রতি বিরক্তি তৈরি হচ্ছে বলে জানান তিনি।

সায়েদুলের হিসাবে, মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও টয়লেট্রিজ পণ্যের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চার মাস আগে এক হাজার টাকা বিদ্যুৎ রিচার্জ করে প্রায় ৩৫ দিন ব্যবহার করলেও সাম্প্রতিক সময়ে একই পরিমাণ টাকায় ২১ থেকে ২২ দিনও চলা কঠিন হয়ে পড়েছে। তার দাবি, গত তিন মাসে বিদ্যুৎ বাবদ খরচ প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে।

গ্যাসের খরচও বেড়েছে বলে জানান তিনি। ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডার চার মাস আগে ১ হাজার ৫০০ টাকায় কিনলেও গত মাসে একই সিলিন্ডারের জন্য তাকে দিতে হয়েছে ২ হাজার ২৫০ টাকা।

টয়লেট্রিজ পণ্যের খরচও তার সংসারে বড় চাপ তৈরি করেছে। প্রতি দুই মাসে এসব পণ্যের জন্য যেখানে প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা বাজেট রাখতেন, গত ১৪ আগস্ট একই ধরনের পণ্য কিনতে গিয়ে প্রায় ২ হাজার ৫০০ টাকা খরচ হয়েছে। বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে এখন তুলনামূলক কম দামের স্থানীয় ব্র্যান্ডের পণ্য ব্যবহারের কথা ভাবছেন তিনি।

শুধু ব্র্যান্ডের পণ্য নয়, একই দামে কমছে পরিমাণও। মোহাম্মদপুরের একটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকানের স্বত্বাধিকারী তানভীর জয় জানান, অনেক পণ্যের প্যাকেটের দাম অপরিবর্তিত থাকলেও ওজন কমে যাচ্ছে। বাজারে এই প্রবণতাকে ‘শ্রিংকফ্লেশন’ বলা হয়।

তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৬ গ্রাম ওজনের একটি সার্ফ এক্সেল প্যাকেটের দাম এখন ৫ টাকা। সপ্তাহখানেক আগেও একই দামে প্যাকেটটির ওজন ছিল ১৮ গ্রাম। ১০ টাকার প্যাকেটের ওজন কমে ৩৬ গ্রাম হয়েছে, যেখানে আগে ছিল ৪০ গ্রাম। ৮৫ গ্রামের লাক্স সাবান কমে হয়েছে ৮০ গ্রাম এবং ৬৫ গ্রামেরটি কমে হয়েছে ৬০ গ্রাম।

রিন পাউডারের ক্ষেত্রেও দাম বেড়েছে। এক কেজি রিন পাউডার বর্তমানে ১৭৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এক মাস আগেও সেটি ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে বিক্রি করতেন বলে জানান তানভীর।

ইউনিলিভার জানিয়েছে, কাঁচামালের ব্যয় যতটা বেড়েছে, তার পুরো চাপ ভোক্তার ওপর দেওয়া হয়নি। ভোক্তাদের ওপর মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কমাতে কোম্পানি বিভিন্ন ব্যয়-সাশ্রয়ী উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে পণ্যের ফর্মুলেশন বা উপাদানের অনুপাত পুনর্বিন্যাস করে বিভিন্ন উপকরণের ব্যবহার কমানোর উদ্যোগও রয়েছে।

এদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের বাজারেও বাড়তি দামের চাপ রয়েছে। মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের পাইকারি চাল ব্যবসায়ী মোজাম্মেল হকের ভাষ্য, গত এক সপ্তাহে মিনিকেট চালের ৫০ কেজির বস্তায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দাম পড়েছে। পাইজাম বা মাঝারি মানের চাল কিনতে হচ্ছে বস্তাপ্রতি ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ২৫০ টাকায়। খুচরা বাজারে এর কেজিপ্রতি দাম দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৫২ থেকে ৫৫ টাকা।

গত এক মাসের বাজারচিত্রেও বেশ কয়েকটি পণ্যের দাম বাড়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। খোলা আটার দাম প্রায় সাড়ে ১৪ শতাংশ বেড়েছে। এক মাস আগে ৫৮ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও এখন তা ৬৫ থেকে ৭০ টাকা। প্যাকেটজাত ময়দার দামও বেড়েছে।

পেঁয়াজের দামও বেড়েছে। এক মাস আগে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া পেঁয়াজ এখন ৫৫ থেকে ৬০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১৮৫ থেকে ১৯০ টাকা লিটার এবং খোলা পাম তেল ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকা লিটারে।

বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বর্তমানে প্রায় ২০০ টাকা লিটার। বাজারে সরবরাহ নিয়েও কিছু জায়গায় সংকট দেখা যাচ্ছে। মোহাম্মদপুরের একটি দোকানে এক লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল না পাওয়ার কথাও জানিয়েছেন ক্রেতারা।

ডিমের দামও বেড়েছে। গত মাসে খামারের ডিমের এক ডজনের দাম ১২৫ থেকে ১৩০ টাকা থাকলেও বর্তমানে তা ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ১৯০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে।

তবে সব পণ্যের দাম একসঙ্গে বাড়েনি। সরবরাহ বাড়ায় কিছু সবজির দাম কমেছে। আমদানির কারণে কাঁচামরিচের দামও আগের তুলনায় নিম্নমুখী রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইলিশ, দেশি পেঁয়াজ, মুরগি, কাঁচামরিচ ও রুই মাছের দাম কমার তথ্যও সরকারি পর্যালোচনায় উঠে এসেছে।

সরকারি পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমার চিত্র দেখা গেলেও সাধারণ মানুষের বাজারের অভিজ্ঞতা বলছে ভিন্ন কথা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। আট মাসের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন এবং গত বছরের নভেম্বরের পর সর্বনিম্ন মূল্যস্ফীতি।

তবে ভোক্তাদের দৈনন্দিন ব্যয়ের হিসাব অনেক ক্ষেত্রেই সেই স্বস্তির প্রতিফলন দেখাচ্ছে না। কারণ শুধু পণ্যের মূল্য নয়, জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যয়ের প্রভাবও পরিবারের মোট ব্যয়ের ওপর পড়ছে।

পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি ও জ্বালানি সংকটের প্রভাবে কয়েক দফায় জ্বালানি তেল, এলপিজি ও বিদ্যুতের ব্যয় বাড়ার বিষয়টিও জীবনযাত্রার খরচে প্রভাব ফেলছে। বিদ্যুতের খুচরা দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত থেকে আবাসিকের প্রান্তিক ও প্রথম ধাপের গ্রাহকদের ক্ষেত্রে সরকার সরে এলেও অনেক গ্রাহক বাড়তি বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ করছেন।

গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় অনেকে রান্নার কাজে এলপিজির পাশাপাশি বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছেন। এতে একদিকে বিদ্যুতের খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে এলপিজি কিনতেও বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে।

এলপিজির দামেও সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্য ওঠানামা হয়েছে। এপ্রিল মাসে দুই দফায় দাম বাড়িয়ে ১২ কেজির সিলিন্ডারের নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৯৪০ টাকা পর্যন্ত করা হয়েছিল। সংকটের সময়ে বাজারে গ্রাহকদের ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্তও ব্যয় করতে হয়েছে। জুলাইয়ে দাম কমে ১ হাজার ৫২৮ টাকা হলেও আগস্টে আবার ৭০ টাকা বাড়িয়ে নির্ধারিত মূল্য করা হয় ১ হাজার ৫৯৮ টাকা। তবে বাজারে অনেক সময় নির্ধারিত দামে এলপিজি পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক মোস্তফা কে মুজেরীর মতে, বর্তমানে উৎপাদন বাড়িয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও আয় বাড়ানো কিংবা দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করে মানুষকে স্বস্তি দেওয়া—দুই ক্ষেত্রেই জ্বালানি নিরাপত্তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

তার মতে, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা দূর করা না গেলে অর্থনীতিকে সচল রাখা এবং অন্য উদ্যোগগুলো সফল করা কঠিন হবে।

অন্যদিকে অর্থনীতিবিদদের মতে, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফেরাতে মূলত দুটি পথ রয়েছে। একটি হলো মানুষের আয় বাড়ানো, অন্যটি হলো পণ্য ও সেবার মান ঠিক রেখে দাম ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা।

মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, পণ্যের দাম কমলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে। আবার আয় বাড়লেও ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে। তাই সরকারের একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যদিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

তিনি ‘ডিসেন্ট ওয়ার্ক’ বা ভালো মজুরি ও সঠিক বেতনের কর্মসংস্থান তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেন। তার মতে, মানুষের আয় বাড়ানো এবং নিত্যপণ্যের দাম ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

তবে এই উদ্যোগের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি সংকট। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি সংকটের কারণে বিভিন্ন কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনাও ঘটছে।

আরেক অর্থনীতিবিদ কে এ এস মুর্শিদের মতে, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দেশে পর্যাপ্ত বাফার বা রিজার্ভ না থাকায় বৈশ্বিক কিংবা অভ্যন্তরীণ সরবরাহ সংকট দেখা দিলে তা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

তার মতে, খাদ্য নিরাপত্তার জন্য সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত চাল ও সারের মজুত যেমন প্রয়োজন, তেমনি জ্বালানির ক্ষেত্রেও প্রয়োজন নিরাপত্তামূলক রিজার্ভ। সরবরাহে সংকট দেখা দিলে পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা না থাকলে সাধারণ মানুষের ওপর তার সরাসরি প্রভাব পড়ে।

সব মিলিয়ে সরকারি পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও সীমিত আয়ের মানুষের সংসারে স্বস্তি ফেরেনি। বরং বিদ্যুৎ, গ্যাস, নিত্যপণ্য ও ব্যক্তিগত ব্যবহারের সামগ্রীর বাড়তি খরচে অনেক পরিবারকে খাবার ও প্রয়োজনীয় পণ্যে কাটছাঁট করতে হচ্ছে। আয় না বাড়লে এবং বাজারে পণ্য ও জ্বালানির স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত না হলে এই চাপ থেকে সাধারণ মানুষের দ্রুত মুক্তি মিলবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর