infoamaderdin@gmail.com বৃহঃস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
১ শ্রাবণ ১৪৩৩

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সংকটে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতাল, চিকিৎসা না পেয়ে রাজশাহীতে ছুটছেন রোগীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১৬ জুলাই ২০২৬ ১৭:০৭ পিএম

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবলের তীব্র সংকটে ভুগছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতাল। ফলে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে এসে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। বিশেষ করে মেডিসিন, সার্জারি ও শিশু বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে অনেক জটিল রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে।

হাসপাতালে এসে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের খোঁজে এক ওয়ার্ড থেকে আরেক ওয়ার্ডে ঘুরতে হচ্ছে অনেককে। শাহাবাজপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা মাহতাব উদ্দিন নাতনিকে নিয়ে শিশু বিশেষজ্ঞের সন্ধানে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও চিকিৎসকের দেখা পাননি। হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “শিশু ডাক্তারকে খুঁজছি, কিন্তু কোথায় পাব বুঝতে পারছি না।”

শুধু মাহতাব উদ্দিনই নন, প্রতিদিন শত শত রোগী একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসকদের অনুমোদিত ৮৫টি পদের মধ্যে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৩৮ জন। ফলে ৪৭টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। সিনিয়র কনসালট্যান্টের ১০টি পদের বিপরীতে রয়েছেন মাত্র দুজন। জুনিয়র কনসালট্যান্টের ১৪টি পদের মধ্যে কর্মরত সাতজন, ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসারের আটটি পদের মধ্যে দুজন এবং সহকারী সার্জনের ২৮টি পদের বিপরীতে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ১০ জন চিকিৎসক। এছাড়া প্যাথলজিস্ট, রেডিওলজিস্ট ও সহকারী রেজিস্ট্রারের একাধিক পদও শূন্য রয়েছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত এক মাসে সাতজন চিকিৎসক বদলি হলেও নতুন যোগ দিয়েছেন মাত্র একজন। এতে সার্জারি ও মেডিসিন বিভাগে সংকট আরও প্রকট হয়েছে।

চর অনুপনগরের বাসিন্দা আজিজুর রহমান জানান, অসুস্থ মাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করলেও পরদিনই রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “এখানে ভর্তি করে লাভ কী, যদি চিকিৎসাই না পাওয়া যায়?”

চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা নিয়েও রয়েছে রোগীদের অভিযোগ। সদর উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আসিয়া খাতুন জানান, স্বামীকে নিয়ে তিন দিন ধরে হাসপাতালে অবস্থান করছেন। এ সময় হাসপাতালের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তার অভিযোগ, টয়লেটসহ বিভিন্ন স্থানে দুর্গন্ধে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে এবং কয়েক দিনেও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি।

হাসপাতালে রোগীর চাপও দিন দিন বাড়ছে। ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ রোগী ভর্তি থাকেন। পাশাপাশি বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজারের বেশি রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন।

হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানান, সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রতিদিন প্রায় ২০০ রোগী দেখতে হয়। মঙ্গলবার দুপুরেও তার কক্ষের সামনে আরও ৩০ থেকে ৪০ জন রোগী অপেক্ষা করছিলেন।

হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মাহবুব হাসান বলেন, সীমিত জনবল নিয়ে বিপুলসংখ্যক রোগীর চিকিৎসাসেবা দিতে চিকিৎসকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। তিনি জানান, ২৫০ শয্যার বিপরীতে প্রয়োজনীয় জনবল এখনো পাওয়া যায়নি। পদোন্নতিজনিত কারণে কয়েকজন চিকিৎসকের বদলির ফলে সার্জারি ও মেডিসিন বিভাগে সংকট আরও বেড়েছে। বিষয়টি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. জমির মো. হাসিবুস সাত্তার বলেন, বর্তমানে সার্জারি, মেডিসিন ও শিশু বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট রয়েছে। রোগীর চাপের তুলনায় চিকিৎসক কম থাকায় কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। শূন্য পদে চিকিৎসক নিয়োগের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। নতুন চিকিৎসক যোগ দিলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সংকটে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতাল, চিকিৎসা না পেয়ে রাজশাহীতে ছুটছেন রোগীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৬ জুলাই ২০২৬ ১৭:০৭ পিএম

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবলের তীব্র সংকটে ভুগছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতাল। ফলে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে এসে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। বিশেষ করে মেডিসিন, সার্জারি ও শিশু বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে অনেক জটিল রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে।

হাসপাতালে এসে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের খোঁজে এক ওয়ার্ড থেকে আরেক ওয়ার্ডে ঘুরতে হচ্ছে অনেককে। শাহাবাজপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা মাহতাব উদ্দিন নাতনিকে নিয়ে শিশু বিশেষজ্ঞের সন্ধানে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও চিকিৎসকের দেখা পাননি। হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “শিশু ডাক্তারকে খুঁজছি, কিন্তু কোথায় পাব বুঝতে পারছি না।”

শুধু মাহতাব উদ্দিনই নন, প্রতিদিন শত শত রোগী একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসকদের অনুমোদিত ৮৫টি পদের মধ্যে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৩৮ জন। ফলে ৪৭টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। সিনিয়র কনসালট্যান্টের ১০টি পদের বিপরীতে রয়েছেন মাত্র দুজন। জুনিয়র কনসালট্যান্টের ১৪টি পদের মধ্যে কর্মরত সাতজন, ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসারের আটটি পদের মধ্যে দুজন এবং সহকারী সার্জনের ২৮টি পদের বিপরীতে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ১০ জন চিকিৎসক। এছাড়া প্যাথলজিস্ট, রেডিওলজিস্ট ও সহকারী রেজিস্ট্রারের একাধিক পদও শূন্য রয়েছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত এক মাসে সাতজন চিকিৎসক বদলি হলেও নতুন যোগ দিয়েছেন মাত্র একজন। এতে সার্জারি ও মেডিসিন বিভাগে সংকট আরও প্রকট হয়েছে।

চর অনুপনগরের বাসিন্দা আজিজুর রহমান জানান, অসুস্থ মাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করলেও পরদিনই রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “এখানে ভর্তি করে লাভ কী, যদি চিকিৎসাই না পাওয়া যায়?”

চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা নিয়েও রয়েছে রোগীদের অভিযোগ। সদর উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আসিয়া খাতুন জানান, স্বামীকে নিয়ে তিন দিন ধরে হাসপাতালে অবস্থান করছেন। এ সময় হাসপাতালের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তার অভিযোগ, টয়লেটসহ বিভিন্ন স্থানে দুর্গন্ধে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে এবং কয়েক দিনেও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি।

হাসপাতালে রোগীর চাপও দিন দিন বাড়ছে। ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ রোগী ভর্তি থাকেন। পাশাপাশি বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজারের বেশি রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন।

হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানান, সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রতিদিন প্রায় ২০০ রোগী দেখতে হয়। মঙ্গলবার দুপুরেও তার কক্ষের সামনে আরও ৩০ থেকে ৪০ জন রোগী অপেক্ষা করছিলেন।

হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মাহবুব হাসান বলেন, সীমিত জনবল নিয়ে বিপুলসংখ্যক রোগীর চিকিৎসাসেবা দিতে চিকিৎসকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। তিনি জানান, ২৫০ শয্যার বিপরীতে প্রয়োজনীয় জনবল এখনো পাওয়া যায়নি। পদোন্নতিজনিত কারণে কয়েকজন চিকিৎসকের বদলির ফলে সার্জারি ও মেডিসিন বিভাগে সংকট আরও বেড়েছে। বিষয়টি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. জমির মো. হাসিবুস সাত্তার বলেন, বর্তমানে সার্জারি, মেডিসিন ও শিশু বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট রয়েছে। রোগীর চাপের তুলনায় চিকিৎসক কম থাকায় কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। শূন্য পদে চিকিৎসক নিয়োগের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। নতুন চিকিৎসক যোগ দিলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর