infoamaderdin@gmail.com বৃহঃস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
১ শ্রাবণ ১৪৩৩

গবেষণা অনুদানে নতুন নীতি: বৈশ্বিক মডেলের পথে ইউজিসি

আতাউর রহমান প্রকাশিত: ১৬ জুলাই ২০২৬ ১৩:০৭ পিএম

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় গবেষণা অর্থায়ন নিয়ে সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, এখন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বাজেট সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) মাধ্যমে পরিচালিত হবে।

অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই বরাদ্দকে তাদের নিজস্ব বার্ষিক বাজেটের অংশ হিসেবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাখার পক্ষে মত দিচ্ছে। প্রথম দর্শনে বিষয়টিকে কেবল ‘অর্থ কার অধীনে থাকবে’—এমন একটি প্রশাসনিক বিতর্ক মনে হতে পারে। তবে গভীর বিচারে এর পরিধি আরও ব্যাপক। এটি মূলত গবেষণার মান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কোন পদ্ধতিটি সবচেয়ে কার্যকর হবে, তা নির্ধারণের নীতিগত লড়াই।

অনেকের কাছে এই নতুন নীতিকে একটি ব্যতিক্রমী বা নতুন ধারণা মনে হতে পারে। তবে বাস্তবে বিশ্বজুড়ে গবেষণায় উন্নত দেশগুলোতে এটিই দীর্ঘদিনের অনুসৃত ও প্রতিষ্ঠিত একটি ব্যবস্থা।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও সফল মডেল
আমাদের প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা কমিশন (এইচইসি) দীর্ঘদিন ধরে প্রতিযোগিতামূলক গবেষণা অনুদান কর্মসূচির মাধ্যমে অর্থায়ন পরিচালনা করছে। সেখানে গবেষণা প্রস্তাব আহ্বান করা, ‘পিয়ার রিভিউ’ বা সহকর্মী মূল্যায়ন, ধাপে ধাপে অর্থ ছাড় এবং গবেষণার অগ্রগতি কঠোরভাবে মূল্যায়ন করার মাধ্যমে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।

ভারতে গবেষণার অর্থায়ন কাঠামোতেও গত কয়েক বছরে বড় পরিবর্তন এসেছে। সেখানে বরাদ্দের একটি বড় অংশ এখন বিশেষায়িত জাতীয় সংস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যেখানে অনুদান দেওয়া হয় প্রতিযোগিতামূলক মূল্যায়নের ভিত্তিতে। এর মূল লক্ষ্য হলো—প্রতিষ্ঠানের নামের চেয়ে গবেষণার মান, গবেষকের সক্ষমতা এবং তার সামাজিক প্রভাবকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

হংকংয়ের গবেষণা অর্থায়ন ব্যবস্থাও এ ক্ষেত্রে একটি বড় উদাহরণ। সেখানে প্রতিযোগিতামূলক অনুদানের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে প্রস্তাব মূল্যায়ন করা হয়। সেখানে গবেষণার সফলতাকে কেবল প্রকাশিত প্রবন্ধের সংখ্যা দিয়ে মাপা হয় না, বরং সমাজ, অর্থনীতি কিংবা নীতিনির্ধারণে তার বাস্তব প্রভাব কতটা, তাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। শুধু এরাই নয়; যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি ও কানাডার মতো গবেষণায় অগ্রসর দেশগুলোতে গবেষণা অনুদান বার্ষিক বাজেটের অংশ হিসেবে স্বায়ত্বশাসিতভাবে বরাদ্দ করা হয় না। বরং তা কঠোর প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গবেষকদের অর্জন করতে হয়।

বাংলাদেশের বাস্তবতা ও পরিবর্তনের তাগিদ
আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষার বাস্তবতায় এই রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য বাজেট থাকলেও প্রায়ই দেখা যায় সেই অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। কোথাও বরাদ্দ অলস পড়ে থাকে, কোথাও গবেষণার মান প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায় না, আবার কোথাও পর্যাপ্ত মেধা থাকা সত্ত্বেও তরুণ গবেষকেরা প্রয়োজনীয় অর্থায়নের অভাবে তাদের সম্ভাবনাময় গবেষণা শুরু করার সুযোগ পান না।

গত দুই দশকে দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বেড়েছে। উচ্চশিক্ষার এই পরিমাণগত প্রসারের পর এখন আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো গুণগত উৎকর্ষ নিশ্চিত করা। আন্তর্জাতিক মানের গবেষণায় আমরা এখনও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য থেকে বেশ দূরে আছি। এই বাস্তবতায় প্রচলিত গবেষণা অর্থায়ন পদ্ধতির সংস্কার জরুরি হয়ে পড়েছে।

সফল বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
ইউজিসির মাধ্যমে গবেষণা বাজেট পরিচালনার সরকারি এই সিদ্ধান্তকে তাই বিচ্ছিন্ন কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মূলত বৈশ্বিক ব্যবস্থার সঙ্গে আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষাকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার একটি প্রয়াস। এর আওতায় গবেষণা প্রস্তাব আহ্বান, পিয়ার রিভিউ, যোগ্য গবেষকদের অনুদান প্রদান, ধাপে ধাপে অর্থ ছাড় এবং ফলাফল মূল্যায়নের একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে কেবল ইউজিসির মাধ্যমে বাজেট পরিচালনা করলেই যে রাতারাতি সব বদলে যাবে, তা নয়। এই ব্যবস্থার সফলতা নির্ভর করবে এর শতভাগ নিরপেক্ষ ও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। প্রস্তাব মূল্যায়নে দেশীয় বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক গবেষকদের সম্পৃক্ত করা, মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখা অপরিহার্য।

একই সঙ্গে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে যেন এই অনুদান কেবল বড় ও নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না হয়ে পড়ে। নতুন বা আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরাও যেন তাদের ভালো প্রস্তাবের জন্য সমান সুযোগ পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের নাম নয়, গবেষণার মানই হতে হবে অনুদান পাওয়ার একমাত্র চাবিকাঠি।

মূল্যায়নের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি
আমাদের গবেষণার ফলাফল মূল্যায়নের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাতে হবে। শুধু কয়েকটি জার্নালে প্রবন্ধ প্রকাশ পেলেই গবেষণা সফল—এমন সনাতন ধারণার বাইরে আসতে হবে। গবেষণাটি কোনো শিল্প খাতের প্রয়োজন মেটাতে পারছে কি না, সরকারি নীতিনির্ধারণে কোনো ভূমিকা রাখছে কি না, কিংবা কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা প্রযুক্তি খাতে বাস্তব পরিবর্তন আনছে কি না, তা মূল্যায়নের আওতায় আনতে হবে।

ভবিষ্যতের বিনিয়োগ
গবেষণা বাজেট নিয়ে ইউজিসি ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতপার্থক্যকে বৈরী ভাবাপন্ন না দেখে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ হিসেবে নেওয়া উচিত। এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে গবেষকদের একাডেমিক স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন থাকবে, আবার একই সঙ্গে সরকারি অর্থের সর্বোচ্চ ব্যবহার ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে।

গবেষণায় অর্থায়ন মানে কেবল কয়েকটি প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া নয়, এটি আসলে আমাদের ভবিষ্যতের বাংলাদেশে বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগের প্রতিটি টাকা যদি যোগ্যতম গবেষক, সবচেয়ে উদ্ভাবনী ধারণা এবং সর্বাধিক জনকল্যাণ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই নতুন এই ব্যবস্থার লক্ষ্য সফল হবে। নতুন এই পথে চ্যালেঞ্জ থাকবে, দ্বিমত থাকবে; তবে বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা আমাদের বলে—গবেষণায় উৎকর্ষ অর্জন করতে হলে তার অর্থায়নের নীতিতেও উৎকর্ষ আনতে হবে।

লেখক: পিআর অ্যান্ড পি বিভাগ, ইউজিসি

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


গবেষণা অনুদানে নতুন নীতি: বৈশ্বিক মডেলের পথে ইউজিসি

আতাউর রহমান

প্রকাশিত: ১৬ জুলাই ২০২৬ ১৩:০৭ পিএম

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় গবেষণা অর্থায়ন নিয়ে সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, এখন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বাজেট সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) মাধ্যমে পরিচালিত হবে।

অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই বরাদ্দকে তাদের নিজস্ব বার্ষিক বাজেটের অংশ হিসেবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাখার পক্ষে মত দিচ্ছে। প্রথম দর্শনে বিষয়টিকে কেবল ‘অর্থ কার অধীনে থাকবে’—এমন একটি প্রশাসনিক বিতর্ক মনে হতে পারে। তবে গভীর বিচারে এর পরিধি আরও ব্যাপক। এটি মূলত গবেষণার মান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কোন পদ্ধতিটি সবচেয়ে কার্যকর হবে, তা নির্ধারণের নীতিগত লড়াই।

অনেকের কাছে এই নতুন নীতিকে একটি ব্যতিক্রমী বা নতুন ধারণা মনে হতে পারে। তবে বাস্তবে বিশ্বজুড়ে গবেষণায় উন্নত দেশগুলোতে এটিই দীর্ঘদিনের অনুসৃত ও প্রতিষ্ঠিত একটি ব্যবস্থা।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও সফল মডেল
আমাদের প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা কমিশন (এইচইসি) দীর্ঘদিন ধরে প্রতিযোগিতামূলক গবেষণা অনুদান কর্মসূচির মাধ্যমে অর্থায়ন পরিচালনা করছে। সেখানে গবেষণা প্রস্তাব আহ্বান করা, ‘পিয়ার রিভিউ’ বা সহকর্মী মূল্যায়ন, ধাপে ধাপে অর্থ ছাড় এবং গবেষণার অগ্রগতি কঠোরভাবে মূল্যায়ন করার মাধ্যমে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।

ভারতে গবেষণার অর্থায়ন কাঠামোতেও গত কয়েক বছরে বড় পরিবর্তন এসেছে। সেখানে বরাদ্দের একটি বড় অংশ এখন বিশেষায়িত জাতীয় সংস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যেখানে অনুদান দেওয়া হয় প্রতিযোগিতামূলক মূল্যায়নের ভিত্তিতে। এর মূল লক্ষ্য হলো—প্রতিষ্ঠানের নামের চেয়ে গবেষণার মান, গবেষকের সক্ষমতা এবং তার সামাজিক প্রভাবকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

হংকংয়ের গবেষণা অর্থায়ন ব্যবস্থাও এ ক্ষেত্রে একটি বড় উদাহরণ। সেখানে প্রতিযোগিতামূলক অনুদানের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে প্রস্তাব মূল্যায়ন করা হয়। সেখানে গবেষণার সফলতাকে কেবল প্রকাশিত প্রবন্ধের সংখ্যা দিয়ে মাপা হয় না, বরং সমাজ, অর্থনীতি কিংবা নীতিনির্ধারণে তার বাস্তব প্রভাব কতটা, তাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। শুধু এরাই নয়; যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি ও কানাডার মতো গবেষণায় অগ্রসর দেশগুলোতে গবেষণা অনুদান বার্ষিক বাজেটের অংশ হিসেবে স্বায়ত্বশাসিতভাবে বরাদ্দ করা হয় না। বরং তা কঠোর প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গবেষকদের অর্জন করতে হয়।

বাংলাদেশের বাস্তবতা ও পরিবর্তনের তাগিদ
আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষার বাস্তবতায় এই রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য বাজেট থাকলেও প্রায়ই দেখা যায় সেই অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। কোথাও বরাদ্দ অলস পড়ে থাকে, কোথাও গবেষণার মান প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায় না, আবার কোথাও পর্যাপ্ত মেধা থাকা সত্ত্বেও তরুণ গবেষকেরা প্রয়োজনীয় অর্থায়নের অভাবে তাদের সম্ভাবনাময় গবেষণা শুরু করার সুযোগ পান না।

গত দুই দশকে দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বেড়েছে। উচ্চশিক্ষার এই পরিমাণগত প্রসারের পর এখন আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো গুণগত উৎকর্ষ নিশ্চিত করা। আন্তর্জাতিক মানের গবেষণায় আমরা এখনও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য থেকে বেশ দূরে আছি। এই বাস্তবতায় প্রচলিত গবেষণা অর্থায়ন পদ্ধতির সংস্কার জরুরি হয়ে পড়েছে।

সফল বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
ইউজিসির মাধ্যমে গবেষণা বাজেট পরিচালনার সরকারি এই সিদ্ধান্তকে তাই বিচ্ছিন্ন কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মূলত বৈশ্বিক ব্যবস্থার সঙ্গে আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষাকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার একটি প্রয়াস। এর আওতায় গবেষণা প্রস্তাব আহ্বান, পিয়ার রিভিউ, যোগ্য গবেষকদের অনুদান প্রদান, ধাপে ধাপে অর্থ ছাড় এবং ফলাফল মূল্যায়নের একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে কেবল ইউজিসির মাধ্যমে বাজেট পরিচালনা করলেই যে রাতারাতি সব বদলে যাবে, তা নয়। এই ব্যবস্থার সফলতা নির্ভর করবে এর শতভাগ নিরপেক্ষ ও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। প্রস্তাব মূল্যায়নে দেশীয় বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক গবেষকদের সম্পৃক্ত করা, মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখা অপরিহার্য।

একই সঙ্গে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে যেন এই অনুদান কেবল বড় ও নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না হয়ে পড়ে। নতুন বা আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরাও যেন তাদের ভালো প্রস্তাবের জন্য সমান সুযোগ পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের নাম নয়, গবেষণার মানই হতে হবে অনুদান পাওয়ার একমাত্র চাবিকাঠি।

মূল্যায়নের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি
আমাদের গবেষণার ফলাফল মূল্যায়নের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাতে হবে। শুধু কয়েকটি জার্নালে প্রবন্ধ প্রকাশ পেলেই গবেষণা সফল—এমন সনাতন ধারণার বাইরে আসতে হবে। গবেষণাটি কোনো শিল্প খাতের প্রয়োজন মেটাতে পারছে কি না, সরকারি নীতিনির্ধারণে কোনো ভূমিকা রাখছে কি না, কিংবা কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা প্রযুক্তি খাতে বাস্তব পরিবর্তন আনছে কি না, তা মূল্যায়নের আওতায় আনতে হবে।

ভবিষ্যতের বিনিয়োগ
গবেষণা বাজেট নিয়ে ইউজিসি ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতপার্থক্যকে বৈরী ভাবাপন্ন না দেখে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ হিসেবে নেওয়া উচিত। এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে গবেষকদের একাডেমিক স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন থাকবে, আবার একই সঙ্গে সরকারি অর্থের সর্বোচ্চ ব্যবহার ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে।

গবেষণায় অর্থায়ন মানে কেবল কয়েকটি প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া নয়, এটি আসলে আমাদের ভবিষ্যতের বাংলাদেশে বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগের প্রতিটি টাকা যদি যোগ্যতম গবেষক, সবচেয়ে উদ্ভাবনী ধারণা এবং সর্বাধিক জনকল্যাণ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই নতুন এই ব্যবস্থার লক্ষ্য সফল হবে। নতুন এই পথে চ্যালেঞ্জ থাকবে, দ্বিমত থাকবে; তবে বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা আমাদের বলে—গবেষণায় উৎকর্ষ অর্জন করতে হলে তার অর্থায়নের নীতিতেও উৎকর্ষ আনতে হবে।

লেখক: পিআর অ্যান্ড পি বিভাগ, ইউজিসি

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর