ব্যাংক খাতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, ৫ বছরে তিন ধাপে সংস্কারের পরিকল্পনা
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপকে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে সরকারের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)। এ সংকট মোকাবিলায় আগামী পাঁচ বছরে তিন ধাপে ব্যাংক খাতের ব্যাপক সংস্কারের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব কমানো, ব্যাংকের সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনগত স্বায়ত্তশাসন বাড়ানো, খেলাপি ঋণ কমানো এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠন।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের ‘ফাইভ-ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক ফর রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (জুলাই ২০২৬–জুন ২০৩১)’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব সংস্কার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে ব্যাংক খাতের বর্তমান সংকটের কারণ ও তা থেকে উত্তরণের জন্য পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সমন্বিত রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের পাশাপাশি দুর্বল পরিচালনা পর্ষদ, যথাযথ যাচাই ছাড়া ঋণ বিতরণ, দুর্বল অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, বারবার ঋণ পুনঃতফসিল, খেলাপিদের সুবিধা দেওয়া এবং ঋণ আদায়ে দীর্ঘ আইনি জটিলতাকে ব্যাংক খাতের সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবে নিয়োগ এবং ব্যাংকের লাইসেন্স পাওয়ার মতো ঘটনাও এ সংকটকে আরও গভীর করেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
জিইডির মতে, এসব কারণে বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মূলধন, মুনাফা এবং আমানতকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঋণ কেলেঙ্কারি ও নির্দেশিত ঋণ বিতরণও দুর্নীতির অন্যতম বড় চ্যানেলে পরিণত হয়েছে।
খেলাপি ঋণ কমানোর বড় লক্ষ্য
সরকারের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সাল শেষে দেশের ব্যাংক খাতে সামগ্রিক খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে ৩০ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। টাকার হিসাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা। এর দেড় বছর আগে, ২০২৪ সালের জুনে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংক খাতে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ আনুমানিক ৬ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা ছিল।
সংস্কার পরিকল্পনায় খেলাপি ঋণের হার ২০২৭ অর্থবছরে ২৫ শতাংশ, ২০২৮ অর্থবছরে ১৫ শতাংশ এবং ২০৩১ অর্থবছরে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ঋণ আদায় ত্বরান্বিত করতে বিচারিক সক্ষমতা বাড়ানো, আইনি ফাঁকের অপব্যবহার বন্ধ এবং সমস্যাগ্রস্ত সম্পদ পুনরুদ্ধার ও নিষ্পত্তির জন্য অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি বা এএমসির মতো ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
পাঁচ বছরে তিন ধাপে সংস্কার
জিইডির প্রতিবেদনে ব্যাংক খাত সংস্কারের জন্য তিনটি পর্যায় নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রথম এক বছরকে ‘রিকভারি অ্যান্ড স্ট্যাবিলাইজেশন’ পর্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এ সময়ে জরুরি ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি স্থিতিশীল করা, আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং সংকটাপন্ন ব্যাংকের ক্ষতি সীমিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
প্রথম পর্যায়ে উচ্চঝুঁকির ব্যাংকগুলো শনাক্ত করে আমানতকারী ও সম্পদের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। অনিয়মে জড়িত বা ব্যর্থ পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, সংকটাপন্ন ব্যাংকের ওপর কঠোর নজরদারি, আমানত সুরক্ষা তহবিল কার্যকর এবং প্রয়োজন অনুযায়ী একীভূত ব্যাংকের মূলধন শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।
দ্বিতীয় পর্যায় হবে প্রথম থেকে তৃতীয় বছর পর্যন্ত ‘রেস্টোরেশন’। এ সময়ে ব্যাংকের ব্যালান্সশিট ও আর্থিক ভিত্তি পুনর্গঠন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, তদারকি ও সুশাসন জোরদার করা হবে।
তৃতীয় থেকে পঞ্চম বছর পর্যন্ত ‘রিকনস্ট্রাকশন অ্যান্ড গ্রোথ অ্যাক্সিলারেশন’ পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করা হবে। এ সময়ে ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতার পাশাপাশি উৎপাদনশীল খাতে নিরাপদ ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হবে।
বড় ঋণে কঠোর যাচাই
নতুন করে খেলাপি ঋণ তৈরি ঠেকাতে বড় ঋণের ক্ষেত্রে কঠোর যাচাই ও অনুমোদন ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। নির্দিষ্ট সীমার বেশি ঋণের ক্ষেত্রে ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা পর্ষদ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
একক ঋণগ্রহীতার ঋণসীমা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, বারবার ঋণ পুনঃতফসিল এবং ঋণ অবলোপনের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনাও রয়েছে। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে সম্পদ জব্দ এবং ব্যাংক হিসাব সীমিত করার মতো আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জিইডির মতে, শুধু ঋণ বাড়িয়ে ব্যাংক খাতের সংকট সমাধান সম্ভব নয়। আগে খেলাপি ও অবলোপন করা ঋণের বোঝা কমিয়ে ব্যাংকের ব্যালান্সশিট শক্তিশালী করতে হবে।
রাজনৈতিক প্রভাব কমাতে বদলাবে নিয়োগব্যবস্থা
ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক প্রভাব কমাতে মেধাভিত্তিক ও স্বচ্ছ নিয়োগ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পরিচালক, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ‘ফিট অ্যান্ড প্রপার’ মানদণ্ড কঠোর করা হবে।
পাশাপাশি ব্যাংকের মালিকানা ও প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিকানায় স্বচ্ছতা বাড়ানো হবে। পরিচালকদের মেয়াদ, সংখ্যা এবং পরিবারভিত্তিক প্রভাব নিয়ন্ত্রণে আইন সংশোধনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমানোর পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতা ও স্বায়ত্তশাসন বাড়াতেও আইন সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২ এবং ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ সংশোধনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক ক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছে।
এর মধ্যে পরিচালনা পর্ষদে পরিবারভিত্তিক প্রভাব ও পরিচালকদের মেয়াদ-সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, সরকারি প্রতিনিধিদের পর্ষদে থাকার সুযোগ সীমিত করা এবং প্রয়োজন হলে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।
তদারকিতে আসছে নতুন ব্যবস্থা
সংস্কারের দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছরে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, বড় ঋণগ্রহীতাদের ওপর নজরদারি, ঋণের পুরো চক্র পর্যবেক্ষণ এবং কঠোর ক্রেডিট ডিসিপ্লিন চালু করা হবে।
একই সঙ্গে ব্যাংকের স্ট্রেস টেস্টিং জোরদার করা হবে। দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বাড়ানো, পূর্ণাঙ্গ আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থা, পে-বক্স প্লাস মডেল, সমন্বিত আর্থিক তথ্য অবকাঠামো, রিয়েল-টাইম রিপোর্টিং এবং জনসম্মুখে তথ্য প্রকাশের ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।
বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ ফেরাতে বিশেষ ব্যবস্থা
ব্যাংক খাতের অনিয়মের সঙ্গে বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ ফেরাতেও বিশেষায়িত ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে (বিএফআইইউ) বিশেষায়িত দল গঠন, আন্তর্জাতিক লিটিগেশন ফার্মের সঙ্গে সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদে পাচার হওয়া সম্পদ ফেরাতে পৃথক সংস্থা গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।
সংস্কার বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আইন ও নীতিগত সংস্কারে সমন্বয় করবে।
সংস্কারের অগ্রগতি পরিমাপ করা হবে খেলাপি ঋণ, মূলধন পর্যাপ্ততা, তারল্য, পুনঃতফসিল ও অবলোপন করা ঋণ, মুনাফা, নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা, বাসেল-৩ বাস্তবায়ন, আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ এবং আমানতকারীদের আস্থার মতো সূচকের মাধ্যমে। প্রতিবছর অগ্রগতি পর্যালোচনার পাশাপাশি ২০২৮ অর্থবছরে একটি মধ্যমেয়াদি মূল্যায়ন করা হবে।
জিইডির মতে, ব্যাংক খাতের সংস্কারে সুশাসন, নিয়ন্ত্রক স্বাধীনতা এবং কার্যকর ঋণ আদায় ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে এসএমই, কৃষি ও শিল্পসহ উৎপাদনশীল খাতে নিরাপদ ঋণপ্রবাহ বাড়ানো সম্ভব হবে। ফলে আগামী পাঁচ বছরের সংস্কার পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হবে শুধু ব্যাংকের ঋণ বিতরণ বাড়ানো নয়, বরং পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ভিত্তি শক্তিশালী করা।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: