infoamaderdin@gmail.com শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
১৪ ভাদ্র ১৪৩৩

খিলক্ষেতে মাত্র ২০০ টাকায় থাকার সুযোগ, জানেন না অধিকাংশ প্রবাসী

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২৯ আগষ্ট ২০২৬ ১৮:০৮ পিএম

বিদেশে যাওয়ার আগে কিংবা প্রবাস থেকে দেশে ফিরে অনেক কর্মীকেই বিমানবন্দরের আশপাশে রাত কাটাতে হয়। কম খরচে নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা না থাকায় কেউ বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল হোটেলে ওঠেন, আবার কেউ বিমানবন্দরের বাইরে লাগেজ নিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেন।

অথচ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছেই প্রবাসী কর্মীদের জন্য রয়েছে সরকারি আবাসনকেন্দ্র, যেখানে মাত্র ২০০ টাকায় এক রাত থাকার সুযোগ রয়েছে। তবে প্রচারের অভাবে এই সুবিধার কথা জানেন না অনেক প্রবাসী কর্মী।

খিলক্ষেত থানার বরুয়া এলাকার লঞ্জনীপাড়ায় রয়েছে ওয়েজ আর্নার্স সেন্টার। বিদেশগামী ও প্রবাসফেরত কর্মীদের অস্থায়ী আবাসনের জন্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই কেন্দ্রে এক রাত থাকার জন্য একজন কর্মীকে দিতে হয় মাত্র ২০০ টাকা। বিমানবন্দর থেকে সেন্টারে যাতায়াতের জন্য রয়েছে বিনা মূল্যের পরিবহনসুবিধাও।

শুধু আবাসন নয়, ওয়েজ আর্নার্স সেন্টারে লাগেজ রাখার ব্যবস্থা, ইন্টারনেট, টেলিফোন, বিদ্যুৎ, প্রাথমিক চিকিৎসা ও কাউন্সেলিংয়ের মতো সুবিধাও রয়েছে। নারী ও পুরুষের জন্য রাখা হয়েছে পৃথক আবাসনের ব্যবস্থা।

তবে উদ্বোধনের চার বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেন্টারটি প্রত্যাশিত মাত্রায় ব্যবহার হচ্ছে না। অধিকাংশ সময়ই খালি পড়ে থাকছে এর বেশির ভাগ শয্যা। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রবাসী কর্মীদের বড় একটি অংশ এখনো সেন্টারটির অবস্থান, থাকার নিয়ম ও সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে পর্যাপ্ত জানেন না।

২০২২ সালে উদ্বোধন

২০২২ সালের ১৮ মার্চ ওয়েজ আর্নার্স সেন্টারটির উদ্বোধন করা হয়। বিদেশগামী ও প্রবাসফেরত কর্মীদের ঢাকায় সাময়িক আবাসনের ব্যবস্থা করাই ছিল এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।

খিলক্ষেতের বরুয়া এলাকার লঞ্জনীপাড়ায় প্রায় ১৪০ কাঠা জমির ওপর নির্মিত সেন্টারটিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩০ কোটি টাকা। এখানে একই সময়ে প্রায় ৫০ জনের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। এর মধ্যে পুরুষদের জন্য ৪০টি এবং নারীদের জন্য ১০টি শয্যা রাখা হয়েছে।

সেন্টারে থাকার খরচও রাখা হয়েছে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে। একজন কর্মীকে এক রাতের জন্য দিতে হয় মাত্র ২০০ টাকা। সিট বুকিংয়ের জন্য রয়েছে ১০০ টাকা আবেদন ফি। একজন কর্মী সর্বোচ্চ দুই রাত থাকতে পারেন।

আবেদনের সময় পাসপোর্ট ও ফ্লাইটের টিকিটের কপি জমা দিতে হয়। সরাসরি আবেদনের পাশাপাশি অনলাইনেও আবেদন করার সুযোগ রয়েছে।

মাসে গড়ে থাকছেন দু-তিনজন

সেন্টারের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুনে সেখানে অবস্থান করেছেন মাত্র ৮৪ জন। জুলাইয়ে ছিলেন ৮০ জন। অর্থাৎ মাসের হিসাবে সেখানে প্রতিদিন গড়ে মাত্র দু-তিনজন প্রবাসী কর্মী অবস্থান করেছেন।

সেন্টারের সক্ষমতার তুলনায় এই সংখ্যা খুবই কম। প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সরকারি এই আবাসনকেন্দ্রের বড় অংশের শয্যা খালি থাকায় এর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

সেন্টারে অবস্থান করা কয়েকজন প্রবাসী কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আবাসনের পরিবেশ নিয়ে তাদের বড় কোনো অভিযোগ নেই। বরং স্বল্প খরচে নিরাপদে থাকার সুযোগকে তারা সুবিধাজনক মনে করছেন। তবে তাদের অনেকেই আগে থেকে এই সেন্টারের বিষয়ে জানতেন না।

বিমানবন্দরে রাত কাটান অনেক কর্মী

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বিদেশগামী কর্মীদের একটি বড় অংশ ফ্লাইটের ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টা আগেই ঢাকায় চলে আসেন। বিশেষ করে ভোররাত বা গভীর রাতে ফ্লাইট থাকলে আগেভাগেই বিমানবন্দরের কাছে পৌঁছে যান তারা।

কিন্তু নির্ধারিত সময়ের আগে টার্মিনালে প্রবেশের সুযোগ না থাকায় অনেককে বাইরে অপেক্ষা করতে হয়। লাগেজ নিয়ে বিমানবন্দরের ক্যানপি বা আশপাশের এলাকায় দীর্ঘ সময় বসে থাকতে দেখা যায় তাদের।

এমনই একজন বিদেশগামী কর্মীকে ওয়েজ আর্নার্স সেন্টারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, তিনি এ ধরনের কোনো সরকারি আবাসনকেন্দ্রের কথা জানতেন না।

একজন কর্মীর এই অজ্ঞতা বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে হলেও সেন্টারে অবস্থানকারীদের সংখ্যা ও ব্যবহারচিত্র বলছে, যাদের জন্য এই ব্যবস্থা করা হয়েছে, তাদের বড় একটি অংশের কাছেই এখনো এর তথ্য পৌঁছায়নি।

প্রচারণা বাড়ানোর তাগিদ

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ওয়েজ আর্নার্স সেন্টারের প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বিমানবন্দরের প্রবাসী লাউঞ্জেও সেন্টারটির তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তারপরও বিমানবন্দরে আসা অনেক বিদেশগামী কর্মী মাত্র ২০০ টাকায় নিরাপদে থাকার এই সুযোগ সম্পর্কে জানেন না।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদেশ যাওয়ার প্রক্রিয়ার শুরুতেই কর্মীদের এই আবাসনসুবিধার বিষয়ে জানানো প্রয়োজন। জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস, কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র, রিক্রুটিং এজেন্সি এবং বিদেশগামী কর্মীদের প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোতে নিয়মিত প্রচারণা চালানো হলে তথ্যটি সহজেই কর্মীদের কাছে পৌঁছাতে পারে।

বিমানবন্দরের ভেতরেও সেন্টারটির প্রচারণা আরও দৃশ্যমান করার সুযোগ রয়েছে। আগমন ও বহির্গমন এলাকায় বড় সাইনবোর্ড, ডিজিটাল ডিসপ্লে, তথ্যকেন্দ্র ও দিকনির্দেশনামূলক ব্যবস্থা থাকলে বিমানবন্দরে পৌঁছেই একজন কর্মী সেন্টারটির অবস্থান ও সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে জানতে পারবেন।

এ ছাড়া ২৪ ঘণ্টার হেল্পলাইন চালু করা হলে কর্মীদের ভোগান্তি আরও কমতে পারে। ফ্লাইটের সময়, আসনপ্রাপ্যতা, যাতায়াত, বুকিং ও থাকার নিয়ম সম্পর্কে এক জায়গা থেকে তথ্য পাওয়ার সুযোগ থাকলে বিদেশগামী কর্মীদের জন্য সেবাটি আরও সহজ হবে।

যাতায়াতেও বাধা

শুধু প্রচারণার ঘাটতিই নয়, সেন্টারে যাতায়াতের ক্ষেত্রেও সমস্যা রয়েছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সেন্টারটির দূরত্ব প্রায় সাড়ে ছয় কিলোমিটার। স্বাভাবিক সময়ে গাড়িতে যেতে ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় লাগে।

তবে সেন্টারের সামনের সড়ক ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সড়ক ও ড্রেনেজ উন্নয়নকাজ চলায় স্বাভাবিক যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে। ফলে বিমানবন্দর থেকে দেওয়া বিনা মূল্যের পরিবহনসুবিধাটিও অনেক সময় প্রত্যাশিতভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

সেন্টারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সড়কের উন্নয়নকাজের কারণে যাতায়াতে সমস্যা তৈরি হয়েছে। এ কারণে বিনা মূল্যের পরিবহনসেবার ব্যবহারও কমেছে।

প্রবাসী কর্মীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিদেশ যাওয়ার সময় তাদের সঙ্গে থাকে একাধিক লাগেজ। প্রথমবার ঢাকায় আসা একজন কর্মীর জন্য অপরিচিত এলাকায় নির্মাণাধীন বা সমস্যাগ্রস্ত সড়ক দিয়ে যাতায়াত করাও সহজ নয়।

আশকোনা হজ ক্যাম্পেও নতুন আবাসন

প্রবাসী কর্মীদের আবাসনের প্রয়োজনীয়তা এখনো রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ভোররাত বা মধ্যরাতের ফ্লাইটের ক্ষেত্রে অনেক কর্মী আগের দিন ঢাকায় চলে আসেন। কেউ পরিচিতজনের বাসায় থাকেন, কেউ হোটেলে ওঠেন, আবার কেউ বিমানবন্দরের আশপাশে অপেক্ষা করেন।

এই বাস্তবতায় খিলক্ষেতের লঞ্জনীপাড়ার ওয়েজ আর্নার্স সেন্টারটি কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গেলে প্রবাসী কর্মীদের একটি বড় অংশ উপকৃত হতে পারেন।

এর পাশাপাশি প্রবাসী কর্মীদের জন্য নতুন আবাসন তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। আশকোনা হজ ক্যাম্পে বিদেশগামী কর্মীদের জন্য আরও ১০০ শয্যার আবাসন ব্যবস্থা করার উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে। ফ্লাইট বিলম্ব বা বাতিল হলে কর্মীদের সাময়িক আবাসনের জন্য এই ব্যবস্থা ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।

নতুন অবকাঠামো প্রয়োজন হলেও এর পাশাপাশি খিলক্ষেতের বরুয়া এলাকার লঞ্জনীপাড়ায় বিদ্যমান ওয়েজ আর্নার্স সেন্টারটির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই স্থাপনাটি প্রবাসী কর্মীদের সেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই তৈরি করা হয়েছে।

বিদেশগামী কর্মীদের অনেকেই জীবনের সঞ্চয় খরচ করে বিদেশে যান। কেউ জমি বিক্রি করেন, কেউ ঋণ নেন, আবার কেউ পরিবারের সঞ্চয় ভেঙে বিদেশে পাড়ি জমান। তাদের জন্য বিদেশযাত্রার আগের রাতটুকু নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

মাত্র ২০০ টাকায় এক রাত থাকার সুযোগ একজন স্বল্পআয়ের বিদেশগামী কর্মীর জন্য ব্যয়বহুল হোটেলের তুলনায় বড় স্বস্তি হতে পারে। কিন্তু সেই সুবিধার খবরই যদি কর্মীদের কাছে না পৌঁছায়, তাহলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত সরকারি স্থাপনাটির কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন।

তাই এখন প্রয়োজন ওয়েজ আর্নার্স সেন্টারের প্রচারণা বাড়ানো, বিমানবন্দর থেকে নির্ভরযোগ্য পরিবহন নিশ্চিত করা এবং বুকিং ও তথ্যসেবা আরও সহজ করা। প্রবাসী কর্মীরা যেন দেশ ছাড়ার আগে জানতে পারেন, বিমানবন্দরের কাছেই মাত্র ২০০ টাকায় তাদের জন্য রয়েছে নিরাপদ থাকার সরকারি ব্যবস্থা—নিশ্চিত করতে হবে সেই তথ্যের ব্যাপক প্রচার।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


খিলক্ষেতে মাত্র ২০০ টাকায় থাকার সুযোগ, জানেন না অধিকাংশ প্রবাসী

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৯ আগষ্ট ২০২৬ ১৮:০৮ পিএম

বিদেশে যাওয়ার আগে কিংবা প্রবাস থেকে দেশে ফিরে অনেক কর্মীকেই বিমানবন্দরের আশপাশে রাত কাটাতে হয়। কম খরচে নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা না থাকায় কেউ বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল হোটেলে ওঠেন, আবার কেউ বিমানবন্দরের বাইরে লাগেজ নিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেন।

অথচ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছেই প্রবাসী কর্মীদের জন্য রয়েছে সরকারি আবাসনকেন্দ্র, যেখানে মাত্র ২০০ টাকায় এক রাত থাকার সুযোগ রয়েছে। তবে প্রচারের অভাবে এই সুবিধার কথা জানেন না অনেক প্রবাসী কর্মী।

খিলক্ষেত থানার বরুয়া এলাকার লঞ্জনীপাড়ায় রয়েছে ওয়েজ আর্নার্স সেন্টার। বিদেশগামী ও প্রবাসফেরত কর্মীদের অস্থায়ী আবাসনের জন্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই কেন্দ্রে এক রাত থাকার জন্য একজন কর্মীকে দিতে হয় মাত্র ২০০ টাকা। বিমানবন্দর থেকে সেন্টারে যাতায়াতের জন্য রয়েছে বিনা মূল্যের পরিবহনসুবিধাও।

শুধু আবাসন নয়, ওয়েজ আর্নার্স সেন্টারে লাগেজ রাখার ব্যবস্থা, ইন্টারনেট, টেলিফোন, বিদ্যুৎ, প্রাথমিক চিকিৎসা ও কাউন্সেলিংয়ের মতো সুবিধাও রয়েছে। নারী ও পুরুষের জন্য রাখা হয়েছে পৃথক আবাসনের ব্যবস্থা।

তবে উদ্বোধনের চার বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেন্টারটি প্রত্যাশিত মাত্রায় ব্যবহার হচ্ছে না। অধিকাংশ সময়ই খালি পড়ে থাকছে এর বেশির ভাগ শয্যা। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রবাসী কর্মীদের বড় একটি অংশ এখনো সেন্টারটির অবস্থান, থাকার নিয়ম ও সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে পর্যাপ্ত জানেন না।

২০২২ সালে উদ্বোধন

২০২২ সালের ১৮ মার্চ ওয়েজ আর্নার্স সেন্টারটির উদ্বোধন করা হয়। বিদেশগামী ও প্রবাসফেরত কর্মীদের ঢাকায় সাময়িক আবাসনের ব্যবস্থা করাই ছিল এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।

খিলক্ষেতের বরুয়া এলাকার লঞ্জনীপাড়ায় প্রায় ১৪০ কাঠা জমির ওপর নির্মিত সেন্টারটিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩০ কোটি টাকা। এখানে একই সময়ে প্রায় ৫০ জনের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। এর মধ্যে পুরুষদের জন্য ৪০টি এবং নারীদের জন্য ১০টি শয্যা রাখা হয়েছে।

সেন্টারে থাকার খরচও রাখা হয়েছে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে। একজন কর্মীকে এক রাতের জন্য দিতে হয় মাত্র ২০০ টাকা। সিট বুকিংয়ের জন্য রয়েছে ১০০ টাকা আবেদন ফি। একজন কর্মী সর্বোচ্চ দুই রাত থাকতে পারেন।

আবেদনের সময় পাসপোর্ট ও ফ্লাইটের টিকিটের কপি জমা দিতে হয়। সরাসরি আবেদনের পাশাপাশি অনলাইনেও আবেদন করার সুযোগ রয়েছে।

মাসে গড়ে থাকছেন দু-তিনজন

সেন্টারের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুনে সেখানে অবস্থান করেছেন মাত্র ৮৪ জন। জুলাইয়ে ছিলেন ৮০ জন। অর্থাৎ মাসের হিসাবে সেখানে প্রতিদিন গড়ে মাত্র দু-তিনজন প্রবাসী কর্মী অবস্থান করেছেন।

সেন্টারের সক্ষমতার তুলনায় এই সংখ্যা খুবই কম। প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সরকারি এই আবাসনকেন্দ্রের বড় অংশের শয্যা খালি থাকায় এর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

সেন্টারে অবস্থান করা কয়েকজন প্রবাসী কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আবাসনের পরিবেশ নিয়ে তাদের বড় কোনো অভিযোগ নেই। বরং স্বল্প খরচে নিরাপদে থাকার সুযোগকে তারা সুবিধাজনক মনে করছেন। তবে তাদের অনেকেই আগে থেকে এই সেন্টারের বিষয়ে জানতেন না।

বিমানবন্দরে রাত কাটান অনেক কর্মী

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বিদেশগামী কর্মীদের একটি বড় অংশ ফ্লাইটের ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টা আগেই ঢাকায় চলে আসেন। বিশেষ করে ভোররাত বা গভীর রাতে ফ্লাইট থাকলে আগেভাগেই বিমানবন্দরের কাছে পৌঁছে যান তারা।

কিন্তু নির্ধারিত সময়ের আগে টার্মিনালে প্রবেশের সুযোগ না থাকায় অনেককে বাইরে অপেক্ষা করতে হয়। লাগেজ নিয়ে বিমানবন্দরের ক্যানপি বা আশপাশের এলাকায় দীর্ঘ সময় বসে থাকতে দেখা যায় তাদের।

এমনই একজন বিদেশগামী কর্মীকে ওয়েজ আর্নার্স সেন্টারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, তিনি এ ধরনের কোনো সরকারি আবাসনকেন্দ্রের কথা জানতেন না।

একজন কর্মীর এই অজ্ঞতা বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে হলেও সেন্টারে অবস্থানকারীদের সংখ্যা ও ব্যবহারচিত্র বলছে, যাদের জন্য এই ব্যবস্থা করা হয়েছে, তাদের বড় একটি অংশের কাছেই এখনো এর তথ্য পৌঁছায়নি।

প্রচারণা বাড়ানোর তাগিদ

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ওয়েজ আর্নার্স সেন্টারের প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বিমানবন্দরের প্রবাসী লাউঞ্জেও সেন্টারটির তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তারপরও বিমানবন্দরে আসা অনেক বিদেশগামী কর্মী মাত্র ২০০ টাকায় নিরাপদে থাকার এই সুযোগ সম্পর্কে জানেন না।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদেশ যাওয়ার প্রক্রিয়ার শুরুতেই কর্মীদের এই আবাসনসুবিধার বিষয়ে জানানো প্রয়োজন। জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস, কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র, রিক্রুটিং এজেন্সি এবং বিদেশগামী কর্মীদের প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোতে নিয়মিত প্রচারণা চালানো হলে তথ্যটি সহজেই কর্মীদের কাছে পৌঁছাতে পারে।

বিমানবন্দরের ভেতরেও সেন্টারটির প্রচারণা আরও দৃশ্যমান করার সুযোগ রয়েছে। আগমন ও বহির্গমন এলাকায় বড় সাইনবোর্ড, ডিজিটাল ডিসপ্লে, তথ্যকেন্দ্র ও দিকনির্দেশনামূলক ব্যবস্থা থাকলে বিমানবন্দরে পৌঁছেই একজন কর্মী সেন্টারটির অবস্থান ও সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে জানতে পারবেন।

এ ছাড়া ২৪ ঘণ্টার হেল্পলাইন চালু করা হলে কর্মীদের ভোগান্তি আরও কমতে পারে। ফ্লাইটের সময়, আসনপ্রাপ্যতা, যাতায়াত, বুকিং ও থাকার নিয়ম সম্পর্কে এক জায়গা থেকে তথ্য পাওয়ার সুযোগ থাকলে বিদেশগামী কর্মীদের জন্য সেবাটি আরও সহজ হবে।

যাতায়াতেও বাধা

শুধু প্রচারণার ঘাটতিই নয়, সেন্টারে যাতায়াতের ক্ষেত্রেও সমস্যা রয়েছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সেন্টারটির দূরত্ব প্রায় সাড়ে ছয় কিলোমিটার। স্বাভাবিক সময়ে গাড়িতে যেতে ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় লাগে।

তবে সেন্টারের সামনের সড়ক ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সড়ক ও ড্রেনেজ উন্নয়নকাজ চলায় স্বাভাবিক যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে। ফলে বিমানবন্দর থেকে দেওয়া বিনা মূল্যের পরিবহনসুবিধাটিও অনেক সময় প্রত্যাশিতভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

সেন্টারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সড়কের উন্নয়নকাজের কারণে যাতায়াতে সমস্যা তৈরি হয়েছে। এ কারণে বিনা মূল্যের পরিবহনসেবার ব্যবহারও কমেছে।

প্রবাসী কর্মীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিদেশ যাওয়ার সময় তাদের সঙ্গে থাকে একাধিক লাগেজ। প্রথমবার ঢাকায় আসা একজন কর্মীর জন্য অপরিচিত এলাকায় নির্মাণাধীন বা সমস্যাগ্রস্ত সড়ক দিয়ে যাতায়াত করাও সহজ নয়।

আশকোনা হজ ক্যাম্পেও নতুন আবাসন

প্রবাসী কর্মীদের আবাসনের প্রয়োজনীয়তা এখনো রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ভোররাত বা মধ্যরাতের ফ্লাইটের ক্ষেত্রে অনেক কর্মী আগের দিন ঢাকায় চলে আসেন। কেউ পরিচিতজনের বাসায় থাকেন, কেউ হোটেলে ওঠেন, আবার কেউ বিমানবন্দরের আশপাশে অপেক্ষা করেন।

এই বাস্তবতায় খিলক্ষেতের লঞ্জনীপাড়ার ওয়েজ আর্নার্স সেন্টারটি কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গেলে প্রবাসী কর্মীদের একটি বড় অংশ উপকৃত হতে পারেন।

এর পাশাপাশি প্রবাসী কর্মীদের জন্য নতুন আবাসন তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। আশকোনা হজ ক্যাম্পে বিদেশগামী কর্মীদের জন্য আরও ১০০ শয্যার আবাসন ব্যবস্থা করার উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে। ফ্লাইট বিলম্ব বা বাতিল হলে কর্মীদের সাময়িক আবাসনের জন্য এই ব্যবস্থা ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।

নতুন অবকাঠামো প্রয়োজন হলেও এর পাশাপাশি খিলক্ষেতের বরুয়া এলাকার লঞ্জনীপাড়ায় বিদ্যমান ওয়েজ আর্নার্স সেন্টারটির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই স্থাপনাটি প্রবাসী কর্মীদের সেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই তৈরি করা হয়েছে।

বিদেশগামী কর্মীদের অনেকেই জীবনের সঞ্চয় খরচ করে বিদেশে যান। কেউ জমি বিক্রি করেন, কেউ ঋণ নেন, আবার কেউ পরিবারের সঞ্চয় ভেঙে বিদেশে পাড়ি জমান। তাদের জন্য বিদেশযাত্রার আগের রাতটুকু নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

মাত্র ২০০ টাকায় এক রাত থাকার সুযোগ একজন স্বল্পআয়ের বিদেশগামী কর্মীর জন্য ব্যয়বহুল হোটেলের তুলনায় বড় স্বস্তি হতে পারে। কিন্তু সেই সুবিধার খবরই যদি কর্মীদের কাছে না পৌঁছায়, তাহলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত সরকারি স্থাপনাটির কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন।

তাই এখন প্রয়োজন ওয়েজ আর্নার্স সেন্টারের প্রচারণা বাড়ানো, বিমানবন্দর থেকে নির্ভরযোগ্য পরিবহন নিশ্চিত করা এবং বুকিং ও তথ্যসেবা আরও সহজ করা। প্রবাসী কর্মীরা যেন দেশ ছাড়ার আগে জানতে পারেন, বিমানবন্দরের কাছেই মাত্র ২০০ টাকায় তাদের জন্য রয়েছে নিরাপদ থাকার সরকারি ব্যবস্থা—নিশ্চিত করতে হবে সেই তথ্যের ব্যাপক প্রচার।

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর