infoamaderdin@gmail.com শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
১৪ ভাদ্র ১৪৩৩

সাত মাসে ২,০৭৬ খুন, বাড়ছে উদ্বেগ; রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব থেকে আধিপত্যের লড়াই

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২৯ আগষ্ট ২০২৬ ১৮:০৮ পিএম

সারা দেশে খুনের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক কোন্দল, দখল ও চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ, ব্যক্তিগত বিরোধ, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, আন্ডারওয়ার্ল্ডের সংঘাত, মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ, কিশোর গ্যাংয়ের দ্বন্দ্ব, জমি দখল এবং পারিবারিক ও সামাজিক কলহকে কেন্দ্র করে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে ঢাকাসহ সারা দেশে ২ হাজার ৭৬টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে খুনের ঘটনায়। এই পরিসংখ্যান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, জানুয়ারিতে সারা দেশে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০টি, মার্চে ৩১৭টি, এপ্রিলে ২৮৮টি, মে মাসে ৩১০টি, জুনে ৩২৬টি এবং জুলাইয়ে ২৯৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সাত মাসে মোট হত্যাকাণ্ড দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৬টি।

জুলাই মাসেই ২৯৮টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে গণপিটুনিতে ২১ জন এবং রাজনৈতিক সহিংসতায় ১১ জন নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় হত্যা মামলা হয়েছে বলে পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে।

আগের বছরের তুলনায়ও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সারা দেশে ৩৬২টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল। একই বছরের জুনে খুনের ঘটনা ছিল ৩৪৪টি।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন সংঘাত

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাত বেড়েছে। কারাগার থেকে একাধিক অপরাধী ও সন্ত্রাসী জামিনে বেরিয়ে আসা, দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকা অপরাধীদের পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠা এবং স্থানীয় অনুসারীদের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টায় বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে সংঘাত তৈরি হচ্ছে।

আন্ডারওয়ার্ল্ডের আধিপত্য বিস্তারের লড়াইও অনেক ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে চলে এসেছে। নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপকে সরিয়ে দিতে সন্ত্রাসীরা হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

এ ছাড়া রাজনৈতিক মেরুকরণের কারণেও বিভিন্ন এলাকায় সংঘাত ও হত্যার ঘটনা ঘটছে। গত সাত মাসে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে ৭৫ জন নিহত হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। নিহতদের বড় একটি অংশ বিএনপির নেতাকর্মী বলে দাবি করা হয়েছে।

একাধিক আলোচিত হত্যাকাণ্ড

চলতি বছরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেশ কিছু হত্যাকাণ্ড ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামের রাউজানে পূর্ব গুজরা ইউনিয়নে নিজ বাড়ির সামনে মুখোশধারী দুর্বৃত্তদের গুলিতে যুবদল নেতা জানে আলম সিকদার নিহত হন।

২৮ এপ্রিল রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় গুলিতে নিহত হন শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন।

৭ মে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে একটি তালাবদ্ধ ঘর থেকে বর্ষা আক্তার নামে ২০ বছর বয়সী এক পোশাককর্মীর গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্বামীর একাধিক সম্পর্কের বিষয়ে বিরোধের জেরে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়।

৮ মে খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে পারিবারিক কলহের জেরে কোদালের আঘাতে মাহিনুর আক্তার নামে এক গৃহবধূ নিহত হন। একই দিনে চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হাসান রাজু নামে এক যুবককে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় রেশমি নামে ১১ বছর বয়সী এক শিশুও চোখে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয়।

৯ মে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় আন্দালিব সাদমান রাফি নামে এক শিশুকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। একই দিনে গাজীপুরের কাপাসিয়ার রাউৎকোনা গ্রামে শারমিন আক্তার, তার তিন সন্তান মীম খানম, উম্মে হাবিবা ও ফারিয়া এবং রসুল মিয়াসহ পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। আর্থিক লেনদেন, পরকীয়া ও পারিবারিক কলহের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়।

১৩ জুন চট্টগ্রামের রাউজানের একটি জনাকীর্ণ বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে হত্যা করা হয়।

সাম্প্রতিক সময়েও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা থামেনি। ৬ আগস্ট ঢাকার সবুজবাগ থানাধীন বাগানবাড়ী কালভার্ট এলাকায় এক নারীর খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে তার পরিচয় ছুরাইয়া আক্তার হিসেবে জানা যায়।

২০ আগস্ট খুলনার বটিয়াঘাটায় এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর দুই দিন পর ২২ আগস্ট রাতে রংপুর নগরের কামালকাছনা এলাকার মাছুয়াপাড়ায় একটি বাড়ির দ্বিতীয় তলা থেকে একই পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে।

পুলিশ বলছে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই

খুনসহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মাঠে কাজ করছে বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। পুলিশের এআইজি মিডিয়া ও জনসংযোগ এএইচএম শাহদাত হোসাইন বলেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

পুলিশের দাবি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাহিনী আবারও সক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করেছে। খুনের ঘটনায় দ্রুত মামলা নেওয়া, আসামিদের গ্রেপ্তার এবং তদন্ত কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরে একাধিক বৈঠক করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, আগের তুলনায় টহল বাড়ানো হয়েছে। নিয়মিত অভিযান চালিয়ে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। বিশেষ করে রাতের টহল আরও জোরদার করা হয়েছে।

ঢাকার মোহাম্মদপুরসহ কয়েকটি এলাকায় অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না এলেও পুলিশ সেখানে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ঢাকার বাইরে খুলনাসহ বিভিন্ন এলাকাতেও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নিয়ে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

অপরাধ বিজ্ঞানীর মতে, বিচারহীনতাই বড় কারণ

অপরাধ বিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হকের মতে, বিচারহীনতা ও মামলার দীর্ঘসূত্রতার কারণে অপরাধীরা উৎসাহিত হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমে শিথিলতা বা ধীরগতি থাকলেও অপরাধীরা তার সুযোগ নেয়।

তার মতে, অপরাধীর রাজনৈতিক বা অন্য কোনো পরিচয় বিবেচনা না করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

অবৈধ অস্ত্র নিয়ে বাড়ছে শঙ্কা

সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান জোরদার করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন থানা ও পুলিশ ব্যারাক থেকে অস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটে। লুট হওয়া এসব অস্ত্রের একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বাহিনীর ১ হাজার ৩১১টি অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা যায়নি। এসব অস্ত্রের মধ্যে এসএমজি, চায়না রাইফেল, পিস্তলসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আশঙ্কা, লুট হওয়া এসব অস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে গেলে রাজনৈতিক সহিংসতা ও অপরাধ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে এসব অস্ত্র উগ্রবাদী বা সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের হাতে পৌঁছালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

অস্ত্র উদ্ধারে সহায়তাকারীদের পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছে পুলিশ। তবে এখন পর্যন্ত বিপুলসংখ্যক অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

খুন ঠেকাতে কার্যকর উদ্যোগের তাগিদ

দেশে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক বিরোধ থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, আধিপত্য বিস্তার, মাদক, জমি দখল ও পারিবারিক কলহ—বিভিন্ন কারণ কাজ করছে। ফলে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান বাড়ালেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, মাদক ও চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া এবং মামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

সাত মাসে ২ হাজারের বেশি হত্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যান বলছে, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে স্বস্তি ফেরাতে এখনই কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। অন্যথায় আধিপত্যের সংঘাত, অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার ও সামাজিক বিরোধ থেকে হত্যাকাণ্ডের এই প্রবণতা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


সাত মাসে ২,০৭৬ খুন, বাড়ছে উদ্বেগ; রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব থেকে আধিপত্যের লড়াই

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৯ আগষ্ট ২০২৬ ১৮:০৮ পিএম

সারা দেশে খুনের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক কোন্দল, দখল ও চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ, ব্যক্তিগত বিরোধ, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, আন্ডারওয়ার্ল্ডের সংঘাত, মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ, কিশোর গ্যাংয়ের দ্বন্দ্ব, জমি দখল এবং পারিবারিক ও সামাজিক কলহকে কেন্দ্র করে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে ঢাকাসহ সারা দেশে ২ হাজার ৭৬টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে খুনের ঘটনায়। এই পরিসংখ্যান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, জানুয়ারিতে সারা দেশে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০টি, মার্চে ৩১৭টি, এপ্রিলে ২৮৮টি, মে মাসে ৩১০টি, জুনে ৩২৬টি এবং জুলাইয়ে ২৯৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সাত মাসে মোট হত্যাকাণ্ড দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৬টি।

জুলাই মাসেই ২৯৮টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে গণপিটুনিতে ২১ জন এবং রাজনৈতিক সহিংসতায় ১১ জন নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় হত্যা মামলা হয়েছে বলে পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে।

আগের বছরের তুলনায়ও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সারা দেশে ৩৬২টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল। একই বছরের জুনে খুনের ঘটনা ছিল ৩৪৪টি।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন সংঘাত

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাত বেড়েছে। কারাগার থেকে একাধিক অপরাধী ও সন্ত্রাসী জামিনে বেরিয়ে আসা, দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকা অপরাধীদের পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠা এবং স্থানীয় অনুসারীদের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টায় বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে সংঘাত তৈরি হচ্ছে।

আন্ডারওয়ার্ল্ডের আধিপত্য বিস্তারের লড়াইও অনেক ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে চলে এসেছে। নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপকে সরিয়ে দিতে সন্ত্রাসীরা হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

এ ছাড়া রাজনৈতিক মেরুকরণের কারণেও বিভিন্ন এলাকায় সংঘাত ও হত্যার ঘটনা ঘটছে। গত সাত মাসে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে ৭৫ জন নিহত হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। নিহতদের বড় একটি অংশ বিএনপির নেতাকর্মী বলে দাবি করা হয়েছে।

একাধিক আলোচিত হত্যাকাণ্ড

চলতি বছরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেশ কিছু হত্যাকাণ্ড ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামের রাউজানে পূর্ব গুজরা ইউনিয়নে নিজ বাড়ির সামনে মুখোশধারী দুর্বৃত্তদের গুলিতে যুবদল নেতা জানে আলম সিকদার নিহত হন।

২৮ এপ্রিল রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় গুলিতে নিহত হন শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন।

৭ মে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে একটি তালাবদ্ধ ঘর থেকে বর্ষা আক্তার নামে ২০ বছর বয়সী এক পোশাককর্মীর গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্বামীর একাধিক সম্পর্কের বিষয়ে বিরোধের জেরে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়।

৮ মে খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে পারিবারিক কলহের জেরে কোদালের আঘাতে মাহিনুর আক্তার নামে এক গৃহবধূ নিহত হন। একই দিনে চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হাসান রাজু নামে এক যুবককে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় রেশমি নামে ১১ বছর বয়সী এক শিশুও চোখে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয়।

৯ মে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় আন্দালিব সাদমান রাফি নামে এক শিশুকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। একই দিনে গাজীপুরের কাপাসিয়ার রাউৎকোনা গ্রামে শারমিন আক্তার, তার তিন সন্তান মীম খানম, উম্মে হাবিবা ও ফারিয়া এবং রসুল মিয়াসহ পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। আর্থিক লেনদেন, পরকীয়া ও পারিবারিক কলহের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়।

১৩ জুন চট্টগ্রামের রাউজানের একটি জনাকীর্ণ বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে হত্যা করা হয়।

সাম্প্রতিক সময়েও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা থামেনি। ৬ আগস্ট ঢাকার সবুজবাগ থানাধীন বাগানবাড়ী কালভার্ট এলাকায় এক নারীর খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে তার পরিচয় ছুরাইয়া আক্তার হিসেবে জানা যায়।

২০ আগস্ট খুলনার বটিয়াঘাটায় এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর দুই দিন পর ২২ আগস্ট রাতে রংপুর নগরের কামালকাছনা এলাকার মাছুয়াপাড়ায় একটি বাড়ির দ্বিতীয় তলা থেকে একই পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে।

পুলিশ বলছে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই

খুনসহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মাঠে কাজ করছে বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। পুলিশের এআইজি মিডিয়া ও জনসংযোগ এএইচএম শাহদাত হোসাইন বলেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

পুলিশের দাবি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাহিনী আবারও সক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করেছে। খুনের ঘটনায় দ্রুত মামলা নেওয়া, আসামিদের গ্রেপ্তার এবং তদন্ত কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরে একাধিক বৈঠক করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, আগের তুলনায় টহল বাড়ানো হয়েছে। নিয়মিত অভিযান চালিয়ে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। বিশেষ করে রাতের টহল আরও জোরদার করা হয়েছে।

ঢাকার মোহাম্মদপুরসহ কয়েকটি এলাকায় অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না এলেও পুলিশ সেখানে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ঢাকার বাইরে খুলনাসহ বিভিন্ন এলাকাতেও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নিয়ে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

অপরাধ বিজ্ঞানীর মতে, বিচারহীনতাই বড় কারণ

অপরাধ বিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হকের মতে, বিচারহীনতা ও মামলার দীর্ঘসূত্রতার কারণে অপরাধীরা উৎসাহিত হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমে শিথিলতা বা ধীরগতি থাকলেও অপরাধীরা তার সুযোগ নেয়।

তার মতে, অপরাধীর রাজনৈতিক বা অন্য কোনো পরিচয় বিবেচনা না করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

অবৈধ অস্ত্র নিয়ে বাড়ছে শঙ্কা

সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান জোরদার করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন থানা ও পুলিশ ব্যারাক থেকে অস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটে। লুট হওয়া এসব অস্ত্রের একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বাহিনীর ১ হাজার ৩১১টি অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা যায়নি। এসব অস্ত্রের মধ্যে এসএমজি, চায়না রাইফেল, পিস্তলসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আশঙ্কা, লুট হওয়া এসব অস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে গেলে রাজনৈতিক সহিংসতা ও অপরাধ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে এসব অস্ত্র উগ্রবাদী বা সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের হাতে পৌঁছালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

অস্ত্র উদ্ধারে সহায়তাকারীদের পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছে পুলিশ। তবে এখন পর্যন্ত বিপুলসংখ্যক অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

খুন ঠেকাতে কার্যকর উদ্যোগের তাগিদ

দেশে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক বিরোধ থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, আধিপত্য বিস্তার, মাদক, জমি দখল ও পারিবারিক কলহ—বিভিন্ন কারণ কাজ করছে। ফলে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান বাড়ালেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, মাদক ও চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া এবং মামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

সাত মাসে ২ হাজারের বেশি হত্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যান বলছে, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে স্বস্তি ফেরাতে এখনই কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। অন্যথায় আধিপত্যের সংঘাত, অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার ও সামাজিক বিরোধ থেকে হত্যাকাণ্ডের এই প্রবণতা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর