শপথের পর নিজের ও পরিবারের নামে ৪০ কোটি টাকার কাজ নিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম
আইন ও নৈতিকতার তোয়াক্কা না করে সরকারের সাথে দেদারসে ঠিকাদারি ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। আইন অনুযায়ী মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা সংসদ সদস্যরা সরকারের সাথে কোনো ব্যবসা করতে না পারলেও, প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে প্রায় ৪০ কোটি টাকার সরকারি কাজ নিয়েছেন বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
এসব ঠিকাদারির মধ্যে প্রতিমন্ত্রীর নিজের মন্ত্রণালয়ের কাজও রয়েছে, যাকে সম্পূর্ণ নীতি ও সংবিধান বহির্ভূত বলছেন আইনবিদ ও সংশ্লিষ্টরা।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত ১৭ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে বর্তমান সরকার গঠনের পর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন মীর শাহে আলম। এর পরপরই তার ছেলে মীর শাখরুল আলম সীমান্তের নামে থাকা লাইসেন্সে ১৩ কোটি ৫৫ লাখ ৮৯ হাজার ৯৯১ টাকার ৬টি কাজ দেওয়া হয়। এই কাজগুলোর দরপত্র আহ্বান ও চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর সম্পন্ন হয়। মন্ত্রণালয়ের গোপনীয় বিষয়াবলী প্রতিমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণাধীন থাকায় তার ছেলের এই কাজ পাওয়া নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছে।
শুধু ছেলের নামেই নয়, শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বিসিকের পটাশিয়াম আয়োডাইড বা আয়োডিন সরবরাহের বড় কাজ হাতিয়ে নিয়েছে প্রতিমন্ত্রীর নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ‘রুপসী রাইস এন্ড পুষ্টি মিলস লিমিটেড’। ইজিপির (e-GP) নথিতে দেখা যায়, এই কোম্পানির ৫০ শতাংশ করে শেয়ারের মালিক প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম ও তার ছেলে মীর শাখরুল আলম। প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর গত ১২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে এই প্রতিষ্ঠানটি ২৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকার কাজ পায়। এছাড়া বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেও কোটি কোটি টাকার আয়োডিন সরবরাহের কাজ পেয়েছিলেন তিনি। মজার ব্যাপার হলো, এই কোম্পানির পাওয়া অধিকাংশ দরপত্রেই মীর শাহে আলম ছিলেন ‘একক দরদাতা’ (Single Bidder), যা পাবলিক প্রকিউরমেন্ট নিয়মে অত্যন্ত সন্দেহজনক।
এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে তার জনসংযোগ কর্মকর্তা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে গত ৯ই জুন সচিবালয়ে এক বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী দাবি করেন, স্বার্থের দ্বন্দ্ব (Conflict of Interest) এড়াতে তিনি শপথ নেওয়ার পরপরই তার ৪টি লিমিটেড ও প্রোপাইটরশিপ কোম্পানি পরিবার ও সন্তানের নামে হস্তান্তর করেছেন।
তবে সরকারি নথি বলছে অন্য কথা। ইজিপির তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে কোম্পানিটি কাজ পাওয়ার পর, ১৬ এপ্রিল যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরে (RJSC) প্রতিমন্ত্রীর শেয়ার তার স্ত্রী মীর লাবনী আক্তারের নামে স্থানান্তর করা হয়। অর্থাৎ, কাজ পাওয়ার পরেই তিনি কৌশলে স্ত্রীর নামে শেয়ার বদল করেন।
আইনবিদদের মতে, প্রতিমন্ত্রীর এই কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ স্বার্থের দ্বন্দ্ব এবং সংবিধানের ১৪৭ অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আইনবিদ জানান, "সরকারের সাথে ব্যবসা করা সংবিধানের ১৪৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নিষিদ্ধ। তিনি যদি মালিক থাকা অবস্থায় কাজ পেয়ে থাকেন, তবে তার পদ বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।"
এই বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, "আইনের ফাঁকফোকর ও অপব্যাখ্যার মাধ্যমেই অতীতে দুর্নীতি সহায়করূপী চোরতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বর্তমান সরকার তাদের ৩১ দফায় যে জুলাই সনদের কথা বলেছে, এই ধরনের প্রবণতা তার সাথে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।"
আইন বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করেন, আইনের একটি নির্দিষ্ট দর্শন বা 'স্পিরিট' থাকে। সংবিধানে ১৪৭ অনুচ্ছেদ যুক্ত করার মূল উদ্দেশ্যই ছিল যেন সরকারের কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যবসা করতে না পারেন। ফলে কাজ পাওয়ার পর স্ত্রী বা ছেলের নামে কাগজ কলমে কোম্পানি লিখে দিলেও আইনের স্পিরিট অনুযায়ী স্বার্থের দ্বন্দ্ব বহাল থাকে এবং এতে সংবিধান লঙ্ঘিত হয়।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: