পারমাণবিক বোমার সমান তীব্রতায় জ্বলছে ইউরোপের দাবানল, সতর্ক করলেন বিশেষজ্ঞরা
ইউরোপজুড়ে ভয়াবহ দাবানল নতুন এক সংকটের রূপ নিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এসব দাবানল এখন এতটাই তীব্র হয়ে উঠছে যে, এর শক্তি কয়েকটি পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণের সমান। ফ্রান্স, স্পেন, গ্রিস ও তুরস্কে ছড়িয়ে পড়া আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খাচ্ছেন দমকলকর্মীরা। কোথাও কোথাও দাবানলের তাপে তৈরি হচ্ছে বিরল অগ্নি মেঘ, যা নতুন করে আগুন ছড়িয়ে পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।
ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে চলমান দাবানলে এখন পর্যন্ত এক লাখ ৬০ হাজার হেক্টরের বেশি বনভূমি পুড়ে গেছে। এটি দেশটির ইতিহাসে দাবানলে সবচেয়ে বড় ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে ভয়াবহ সংকট হিসেবে উল্লেখ করেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। তাঁর ভাষায়, এত ভয়াবহ দাবানল ফ্রান্স আগে কখনো দেখেনি।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বোর্দোর কাছে জিরন্দ অঞ্চলে। সেখানে দাবানলের তীব্র তাপ থেকে সৃষ্টি হয়েছে ‘পাইরোকিউমুলোনিম্বাস’ নামে বিরল অগ্নি মেঘ। এই ধরনের মেঘ নিজেই প্রবল বাতাস সৃষ্টি করতে পারে, বজ্রপাত ঘটাতে পারে এবং নতুন দাবানলেরও জন্ম দিতে সক্ষম। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের ঘটনা আগে দেখা গেলেও ইউরোপে এটি অত্যন্ত বিরল।
স্পেনেও দাবানলের পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। রাজধানী মাদ্রিদের পশ্চিমে আভিলা প্রদেশের দাবানল দেশটির ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ দাবানলে পরিণত হয়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ফ্রান্স ও স্পেন উভয় দেশই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তা চেয়েছে। দুই দেশে মিলিয়ে ইতোমধ্যে তিন লাখের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। যদিও কিছু এলাকায় আগুনের তীব্রতা কমে আসায় আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা অনেক বাসিন্দা নিজ নিজ বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছেন।
অন্যদিকে, গ্রিসের ক্রিট দ্বীপে দাবানল নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে গিয়ে দুই দমকলকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। প্রবল বাতাসের কারণে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া আগুনের মুখে রেথিমনো অঞ্চলের কয়েকটি বসতি খালি করে দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে তুরস্কের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় মুগলা প্রদেশেও বনাঞ্চল ও কৃষিজমিতে দাবানল ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইউরোপে দাবানলের প্রকৃতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। গত শীতে অতিবৃষ্টির ফলে প্রচুর গাছপালা জন্মেছিল। পরে দীর্ঘ তাপপ্রবাহে সেগুলো শুকিয়ে গিয়ে দাবানলের জ্বালানিতে পরিণত হয়েছে। এই পরিবর্তনকে বিজ্ঞানীরা ‘হুইপল্যাশ ইফেক্ট’ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।
স্পেনের ইউনিভার্সিটি অব লেইডার বন ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ভিক্টর রেসকো দে দিয়োস বলেন, বিশ্ব এমন এক সময়ে প্রবেশ করেছে, যখন কিছু দাবানল আর প্রচলিত উপায়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। তাঁর মতে, এসব দাবানলের শক্তি কয়েকটি পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণের সমান তীব্রতা সৃষ্টি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো না গেলে ইউরোপে এমন ভয়াবহ দাবানল ভবিষ্যতে আরও ঘন ঘন এবং আরও বিধ্বংসী রূপে দেখা দেবে। তাঁদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বা অস্ট্রেলিয়ার মতো লাখ লাখ হেক্টরজুড়ে দাবানল ভবিষ্যতে ইউরোপেও নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হতে পারে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: