infoamaderdin@gmail.com বৃহঃস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
৮ শ্রাবণ ১৪৩৩

রোড রোলারের প্রশিক্ষণে ঠিকাদারের টাকায় সুইডেন সফর, চসিক কর্মকর্তাদের বিদেশযাত্রা নিয়ে বিতর্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২৩ জুলাই ২০২৬ ১৪:০৭ পিএম

রোড রোলার পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) পাঁচ কর্মকর্তার সুইডেন সফরের অনুমোদন ঘিরে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।

সরকারি অনুমোদন অনুযায়ী, আগামী ২৫ জুলাই থেকে ৩ আগস্ট পর্যন্ত তাদের সুইডেন সফরের কথা রয়েছে। তবে সফরের প্রয়োজনীয়তা, সময় নির্বাচন এবং ব্যয়ভার বহনের বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের গত ৬ জুলাই প্রকাশিত সরকারি আদেশ অনুযায়ী, সফরে অংশ নেওয়ার তালিকায় রয়েছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর একান্ত সচিব মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সচিব আশরাফুল আমিন, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জসীম উদ্দিন, নির্বাহী প্রকৌশলী আশিকুল ইসলাম এবং নির্বাহী প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মুহাম্মদ ইমরান হোছাইন খোকা।

জানা গেছে, ৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকা ব্যয়ে পাঁচটি ডাবল ড্রাম রোড রোলার সরবরাহের দায়িত্ব পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সরকার কবির আহমেদ। চুক্তি অনুযায়ী, রোলার সরবরাহের পর একজন উপসহকারী প্রকৌশলী এবং প্রতিটি রোলারের জন্য একজন চালককে একদিনের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা ছিল। এ বাবদ প্রায় ১৩ লাখ ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়, যার ব্যয়ভার বহনের কথা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের।

গত ১১ মার্চ রোলারগুলো চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের স্টকে যুক্ত হলেও প্রায় চার মাস পর কর্মকর্তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, এর আগে ২০২৫ সালের অক্টোবরে একই ধরনের একটি সফরের অনুমোদন দেওয়া হলেও সরকারি বিদেশ সফর সীমিত করার সিদ্ধান্তের কারণে তা স্থগিত হয়ে যায়। সম্প্রতি নতুন আদেশে সফরের মেয়াদ সাত দিনের পরিবর্তে ১০ দিন করা হয়েছে এবং আগের তালিকায় থাকা এক কর্মকর্তার পরিবর্তে নতুন একজনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

যদিও সফরের তালিকায় থাকা এক কর্মকর্তা বিদেশ যাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন, তবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সফরসংক্রান্ত প্রক্রিয়া গোপন রেখেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনে পরবর্তী সময়ে সফরটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন বলেন, এই সফরে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা তার নেই। তিনি দাবি করেন, আগে সফরটি স্থগিত ছিল, তবে বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার বিদেশ সফরের অনুমোদন পুনরায় দেওয়া হচ্ছে বলেই এ অনুমোদন এসেছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, বিষয়টি তাকে অবহিত করা হয়নি। তিনি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান।

অন্যদিকে, সাবেক এক সিটি করপোরেশন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রোড রোলার পরিচালনার প্রশিক্ষণে চালক ও কারিগরি কর্মীদের যাওয়ার কথা। সেখানে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সফরের যৌক্তিকতা নেই। তার মতে, সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত অনেক বিদেশ সফর বাস্তবে প্রমোদ ভ্রমণে পরিণত হয়।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি চুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর নীতিগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ এবং বিদ্যমান আইনের আলোকে এটি অপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে। তারা বলছেন, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ-সংক্রান্ত আইনে এ ধরনের সুবিধা গ্রহণের বিষয়ে স্পষ্ট বিধান রয়েছে।

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) টিআইবি চট্টগ্রামের সভাপতি অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী বলেন, অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর নিরুৎসাহিত করার সরকারি নীতির মধ্যে রোড রোলারের প্রশিক্ষণের জন্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সুইডেন সফর জনমনে প্রশ্ন তৈরি করেছে। তার মতে, ঠিকাদারের অর্থায়নে এমন সফর সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


রোড রোলারের প্রশিক্ষণে ঠিকাদারের টাকায় সুইডেন সফর, চসিক কর্মকর্তাদের বিদেশযাত্রা নিয়ে বিতর্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৩ জুলাই ২০২৬ ১৪:০৭ পিএম

রোড রোলার পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) পাঁচ কর্মকর্তার সুইডেন সফরের অনুমোদন ঘিরে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।

সরকারি অনুমোদন অনুযায়ী, আগামী ২৫ জুলাই থেকে ৩ আগস্ট পর্যন্ত তাদের সুইডেন সফরের কথা রয়েছে। তবে সফরের প্রয়োজনীয়তা, সময় নির্বাচন এবং ব্যয়ভার বহনের বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের গত ৬ জুলাই প্রকাশিত সরকারি আদেশ অনুযায়ী, সফরে অংশ নেওয়ার তালিকায় রয়েছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর একান্ত সচিব মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সচিব আশরাফুল আমিন, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জসীম উদ্দিন, নির্বাহী প্রকৌশলী আশিকুল ইসলাম এবং নির্বাহী প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মুহাম্মদ ইমরান হোছাইন খোকা।

জানা গেছে, ৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকা ব্যয়ে পাঁচটি ডাবল ড্রাম রোড রোলার সরবরাহের দায়িত্ব পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সরকার কবির আহমেদ। চুক্তি অনুযায়ী, রোলার সরবরাহের পর একজন উপসহকারী প্রকৌশলী এবং প্রতিটি রোলারের জন্য একজন চালককে একদিনের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা ছিল। এ বাবদ প্রায় ১৩ লাখ ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়, যার ব্যয়ভার বহনের কথা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের।

গত ১১ মার্চ রোলারগুলো চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের স্টকে যুক্ত হলেও প্রায় চার মাস পর কর্মকর্তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, এর আগে ২০২৫ সালের অক্টোবরে একই ধরনের একটি সফরের অনুমোদন দেওয়া হলেও সরকারি বিদেশ সফর সীমিত করার সিদ্ধান্তের কারণে তা স্থগিত হয়ে যায়। সম্প্রতি নতুন আদেশে সফরের মেয়াদ সাত দিনের পরিবর্তে ১০ দিন করা হয়েছে এবং আগের তালিকায় থাকা এক কর্মকর্তার পরিবর্তে নতুন একজনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

যদিও সফরের তালিকায় থাকা এক কর্মকর্তা বিদেশ যাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন, তবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সফরসংক্রান্ত প্রক্রিয়া গোপন রেখেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনে পরবর্তী সময়ে সফরটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন বলেন, এই সফরে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা তার নেই। তিনি দাবি করেন, আগে সফরটি স্থগিত ছিল, তবে বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার বিদেশ সফরের অনুমোদন পুনরায় দেওয়া হচ্ছে বলেই এ অনুমোদন এসেছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, বিষয়টি তাকে অবহিত করা হয়নি। তিনি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান।

অন্যদিকে, সাবেক এক সিটি করপোরেশন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রোড রোলার পরিচালনার প্রশিক্ষণে চালক ও কারিগরি কর্মীদের যাওয়ার কথা। সেখানে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সফরের যৌক্তিকতা নেই। তার মতে, সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত অনেক বিদেশ সফর বাস্তবে প্রমোদ ভ্রমণে পরিণত হয়।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি চুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর নীতিগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ এবং বিদ্যমান আইনের আলোকে এটি অপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে। তারা বলছেন, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ-সংক্রান্ত আইনে এ ধরনের সুবিধা গ্রহণের বিষয়ে স্পষ্ট বিধান রয়েছে।

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) টিআইবি চট্টগ্রামের সভাপতি অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী বলেন, অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর নিরুৎসাহিত করার সরকারি নীতির মধ্যে রোড রোলারের প্রশিক্ষণের জন্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সুইডেন সফর জনমনে প্রশ্ন তৈরি করেছে। তার মতে, ঠিকাদারের অর্থায়নে এমন সফর সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে।

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর