infoamaderdin@gmail.com মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১৭ ভাদ্র ১৪৩৩

খুলনায় ভয়াবহ ডেঙ্গু, হাসপাতালের ধারণক্ষমতার চার গুণ রোগী; ৮ মাসে মৃত্যু ২০

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৮:০৯ পিএম

খুলনায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা, একই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে রোগীর চাপ। নির্ধারিত শয্যা পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় কোথাও বারান্দা, করিডোর ও মেঝেতে বেড পেতে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। এমনকি কোনো কোনো হাসপাতালে নির্ধারিত ডেঙ্গু শয্যার কয়েক গুণ বেশি রোগী ভর্তি রয়েছেন।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত খুলনা বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৫ হাজার ৮৪৮ জন। এ সময়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৪ হাজার ৯৫৪ জন এবং মারা গেছেন ২০ জন। বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৭৬০ জন ডেঙ্গু রোগী।

গত ২৪ ঘণ্টায়ই খুলনা বিভাগে নতুন করে ২৮৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে ২২৩ জন এবং বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ভর্তি হয়েছেন ৬০ জন।

খুলনা জেলাতেই নতুন রোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। গত ২৪ ঘণ্টায় এ জেলায় ১৪৬ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে ৮৭ জন এবং বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ৫৯ জন। এ ছাড়া খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নতুন করে আরও ৫৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন।

বিভাগের অন্য জেলাগুলোর মধ্যে যশোরে ৩২ জন, নড়াইলে ১২, ঝিনাইদহে ৮, সাতক্ষীরায় ৭, মেডিকেল কলেজসহ ১৩, বাগেরহাটে ৫, মাগুরায় ৫, মেহেরপুরে ৪ এবং কুষ্টিয়ায় ৩ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চুয়াডাঙ্গায় নতুন করে কোনো রোগী ভর্তি হননি।

খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শেখ মো. মোশাররফ হোসেন জানান, চলতি বছরের শুরু থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত বিভাগে মোট ৫ হাজার ৮৪৮ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ৪ হাজার ৯৫৪ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন এবং ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে ৭৬০ জন রোগী চিকিৎসাধীন।

মৃত্যুর পরিসংখ্যানেও খুলনা জেলা সবচেয়ে এগিয়ে। বিভাগে ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ২০ জনের মধ্যে ১৯ জনই খুলনা জেলার বাসিন্দা। বাগেরহাটে মারা গেছেন একজন। গত ২৮ জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে বিভাগে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছিল ৮ জনের। আর শুধু আগস্ট মাসেই মারা গেছেন ১২ জন। অর্থাৎ চলতি বছরের আট মাসের মধ্যে আগস্টেই ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে।

সবচেয়ে সংকটপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। বিভাগে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন এই হাসপাতালে। এ পর্যন্ত সেখানে মোট ১ হাজার ৩৮৯ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৭ জন মারা গেছেন। বর্তমানে হাসপাতালটিতে ১৯৯ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন।

হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ এতটাই বেড়েছে যে নির্ধারিত ডেঙ্গু ওয়ার্ডের বাইরে বারান্দা, করিডোর ও মেঝেতেও বেড বসিয়ে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও খুলনা জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে। বিশেষ করে শিশু ওয়ার্ডে ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে বিপাকে পড়েছেন অভিভাবকেরা। চিকিৎসক ও নার্সরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও শয্যা ও জনবল সংকটে সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

শুধু সরকারি হাসপাতালেই নয়, বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও শয্যা সংকট দেখা দিয়েছে। খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারিত ১৫টি বেড থাকলেও বর্তমানে ভর্তি রয়েছেন ৫২ জন। হাসপাতালটির ম্যানেজার মো. হামিদুল ইসলাম জানান, সংকটকালীন সময়ে বিভিন্ন ওয়ার্ড ও কেবিনে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

খুলনার আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ম্যানেজার মো. হোসেন আলী জানান, সেখানেও ডেঙ্গু রোগীর চাপ অনেক বেশি। বর্তমানে একক বেড দেওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই। হাসপাতালে ৬০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন।

স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তার বাড়ে। ফলে জুলাইয়ের পর থেকেই সাধারণত ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে শুরু করে। খুলনা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার ডা. হিমেল ঘোষ বলেন, আগে এডিস মশা মূলত দিনে কামড়ানোর জন্য পরিচিত থাকলেও বর্তমানে রাত-দিন সমানভাবে কামড়ানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। নভেম্বর-ডিসেম্বরের দিকে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমতে পারে বলে আশা করছেন তিনি।

খুলনার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মো. শওকত আলী বলেন, এডিস মশা জমে থাকা পানিতে বংশবিস্তার করে। এখন দেখা যাচ্ছে, শুধু স্বচ্ছ পানিতে নয়, ময়লাযুক্ত পানিতেও এডিস মশার বংশবিস্তার হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতালগুলোতে শয্যা বাড়ানো হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ ও মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক কার্যক্রমও চলছে।

স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, খুলনার সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেঙ্গু আইসোলেশন ইউনিট বা ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। প্রতিটি ইউনিটে অন্তত পাঁচটি করে শয্যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নরমাল স্যালাইন, খাওয়ার স্যালাইন, প্যারাসিটামলসহ প্রয়োজনীয় ওষুধের মজুত রয়েছে। ভর্তি রোগীদের জন্য মশারিও সরবরাহ করা হচ্ছে।

এ ছাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা সদর হাসপাতালে ডেঙ্গু NS1 এবং Anti Dengue IgM পরীক্ষার কিট পর্যাপ্ত রয়েছে। খুলনা সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সমন্বয় করে মহানগরের ডেঙ্গু হটস্পটও চিহ্নিত করা হয়েছে। ১৭, ২২ ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের মাধ্যমে বিশেষ সচেতনতা ও চিকিৎসা ক্যাম্প পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব ক্যাম্পে বিনামূল্যে পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন সংগঠনও মাঠে নেমেছে। খুলনা মহানগর বিএনপি বর্তমান পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে দ্রুত খুলনাকে মহামারি এলাকা ঘোষণার দাবি জানিয়েছে। দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো বিভিন্ন ওয়ার্ডে মশক নিধন, সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ, রক্তদান এবং হাসপাতালে রোগীদের খোঁজখবর নেওয়ার কার্যক্রম চালাচ্ছে।

খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি শফিকুল আলম মনা জানান, ডেঙ্গু প্রতিরোধের পাশাপাশি রোগীদের চিকিৎসাসেবায়ও বিনামূল্যে সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসকের পরামর্শ, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং রক্তের গ্রুপ ম্যাচিং ও রক্ত সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আক্রান্ত থানা ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ সেবাকেন্দ্র গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

অন্যদিকে খুলনার আড়ংঘাটা থানা জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগেও ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়েছে। খুলনা মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমির মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধ কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের একার দায়িত্ব নয়; এটি একটি সামাজিক উদ্যোগ। জনগণের সচেতনতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর পথ।

এদিকে ডেঙ্গুর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে খুলনা সিটি করপোরেশনও ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালাচ্ছে। সংক্রমণ ও এডিস মশার লার্ভার ঘনত্বের ভিত্তিতে নগরীর ৩১টি ওয়ার্ডকে রেড, অরেঞ্জ ও ইয়েলো—তিনটি জোনে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১০টি ওয়ার্ডকে রেড জোন ঘোষণা করা হয়েছে।

রেড জোনের ওয়ার্ডগুলো হলো ১৭, ১৮, ২২, ২৩, ২৪, ২৫, ২৭, ২৮, ২৯ ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ড। এসব এলাকায় প্রতিদিন গড়ে ৭০ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন বলে নগর স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য। এ ছাড়া ১, ১৯, ২৬ ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ডকে অতিসংক্রামক এলাকা এবং ২, ১০ ও ১২ নম্বর ওয়ার্ডকে মৃদু আক্রান্ত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে ১৭, ২২ ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে বিনামূল্যে চিকিৎসা ক্যাম্প চালু করেছে কেসিসি। এসব ক্যাম্পে নাপা ট্যাবলেট ও স্যালাইন সরবরাহ করা হচ্ছে।

কেসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. শরীফ শামিউল ইসলাম জানিয়েছেন, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় নাপা ও স্যালাইন মজুত রয়েছে। মশক নিধন কার্যক্রম জোরদারে তিনটি উচ্চপর্যায়ের তদারকি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। প্রতিদিন সকালে লার্ভা ধ্বংসে অ্যাবেট স্প্রে এবং বিকেলে ফগিং মেশিনের মাধ্যমে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। পাশাপাশি নগরবাসীকে সচেতন করতে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে মাইকিং করা হচ্ছে।

এডিস মশার বংশবিস্তার রোধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে। কেসিসির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে বাসাবাড়ি, নির্মাণাধীন ভবন, ড্রেন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালানো হচ্ছে। কোথাও জমে থাকা পানি বা এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক জরিমানা করা হচ্ছে।

কেসিসি প্রশাসক নজরুল ইসলামু মঞ্জু বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী তিন মাস আগে থেকেই ডেঙ্গু প্রতিরোধে কাজ শুরু করা হয়েছে। পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা হলেও সংক্রমণ কমাতে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্য বিভাগের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করে মাঠে নামানো হয়েছে। তবে শুধু সিটি করপোরেশনের ওষুধ ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। নগরবাসীকেও নিজ নিজ বাড়ি ও আঙিনা পরিষ্কার রাখতে হবে। টব, এসি, ছাদ কিংবা অন্য কোথাও পানি জমে থাকলে তা অপসারণ করতে হবে। ঝোপঝাড় ও বদ্ধ পানি পরিষ্কার করেও এডিস মশার বংশবিস্তার বন্ধ করতে হবে।

সব মিলিয়ে খুলনায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি এখন স্বাস্থ্য বিভাগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে দ্রুত বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা, অন্যদিকে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে রোগীর চাপ। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের পরিস্থিতি আরও কঠিন হওয়ার আশঙ্কা থাকায় হাসপাতালের শয্যা ও জনবল বাড়ানোর পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং নগরবাসীর অংশগ্রহণে প্রতিরোধ কার্যক্রম জোরদার করা না গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


খুলনায় ভয়াবহ ডেঙ্গু, হাসপাতালের ধারণক্ষমতার চার গুণ রোগী; ৮ মাসে মৃত্যু ২০

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৮:০৯ পিএম

খুলনায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা, একই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে রোগীর চাপ। নির্ধারিত শয্যা পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় কোথাও বারান্দা, করিডোর ও মেঝেতে বেড পেতে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। এমনকি কোনো কোনো হাসপাতালে নির্ধারিত ডেঙ্গু শয্যার কয়েক গুণ বেশি রোগী ভর্তি রয়েছেন।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত খুলনা বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৫ হাজার ৮৪৮ জন। এ সময়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৪ হাজার ৯৫৪ জন এবং মারা গেছেন ২০ জন। বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৭৬০ জন ডেঙ্গু রোগী।

গত ২৪ ঘণ্টায়ই খুলনা বিভাগে নতুন করে ২৮৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে ২২৩ জন এবং বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ভর্তি হয়েছেন ৬০ জন।

খুলনা জেলাতেই নতুন রোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। গত ২৪ ঘণ্টায় এ জেলায় ১৪৬ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে ৮৭ জন এবং বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ৫৯ জন। এ ছাড়া খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নতুন করে আরও ৫৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন।

বিভাগের অন্য জেলাগুলোর মধ্যে যশোরে ৩২ জন, নড়াইলে ১২, ঝিনাইদহে ৮, সাতক্ষীরায় ৭, মেডিকেল কলেজসহ ১৩, বাগেরহাটে ৫, মাগুরায় ৫, মেহেরপুরে ৪ এবং কুষ্টিয়ায় ৩ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চুয়াডাঙ্গায় নতুন করে কোনো রোগী ভর্তি হননি।

খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শেখ মো. মোশাররফ হোসেন জানান, চলতি বছরের শুরু থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত বিভাগে মোট ৫ হাজার ৮৪৮ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ৪ হাজার ৯৫৪ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন এবং ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে ৭৬০ জন রোগী চিকিৎসাধীন।

মৃত্যুর পরিসংখ্যানেও খুলনা জেলা সবচেয়ে এগিয়ে। বিভাগে ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ২০ জনের মধ্যে ১৯ জনই খুলনা জেলার বাসিন্দা। বাগেরহাটে মারা গেছেন একজন। গত ২৮ জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে বিভাগে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছিল ৮ জনের। আর শুধু আগস্ট মাসেই মারা গেছেন ১২ জন। অর্থাৎ চলতি বছরের আট মাসের মধ্যে আগস্টেই ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে।

সবচেয়ে সংকটপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। বিভাগে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন এই হাসপাতালে। এ পর্যন্ত সেখানে মোট ১ হাজার ৩৮৯ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৭ জন মারা গেছেন। বর্তমানে হাসপাতালটিতে ১৯৯ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন।

হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ এতটাই বেড়েছে যে নির্ধারিত ডেঙ্গু ওয়ার্ডের বাইরে বারান্দা, করিডোর ও মেঝেতেও বেড বসিয়ে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও খুলনা জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে। বিশেষ করে শিশু ওয়ার্ডে ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে বিপাকে পড়েছেন অভিভাবকেরা। চিকিৎসক ও নার্সরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও শয্যা ও জনবল সংকটে সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

শুধু সরকারি হাসপাতালেই নয়, বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও শয্যা সংকট দেখা দিয়েছে। খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারিত ১৫টি বেড থাকলেও বর্তমানে ভর্তি রয়েছেন ৫২ জন। হাসপাতালটির ম্যানেজার মো. হামিদুল ইসলাম জানান, সংকটকালীন সময়ে বিভিন্ন ওয়ার্ড ও কেবিনে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

খুলনার আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ম্যানেজার মো. হোসেন আলী জানান, সেখানেও ডেঙ্গু রোগীর চাপ অনেক বেশি। বর্তমানে একক বেড দেওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই। হাসপাতালে ৬০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন।

স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তার বাড়ে। ফলে জুলাইয়ের পর থেকেই সাধারণত ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে শুরু করে। খুলনা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার ডা. হিমেল ঘোষ বলেন, আগে এডিস মশা মূলত দিনে কামড়ানোর জন্য পরিচিত থাকলেও বর্তমানে রাত-দিন সমানভাবে কামড়ানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। নভেম্বর-ডিসেম্বরের দিকে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমতে পারে বলে আশা করছেন তিনি।

খুলনার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মো. শওকত আলী বলেন, এডিস মশা জমে থাকা পানিতে বংশবিস্তার করে। এখন দেখা যাচ্ছে, শুধু স্বচ্ছ পানিতে নয়, ময়লাযুক্ত পানিতেও এডিস মশার বংশবিস্তার হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতালগুলোতে শয্যা বাড়ানো হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ ও মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক কার্যক্রমও চলছে।

স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, খুলনার সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেঙ্গু আইসোলেশন ইউনিট বা ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। প্রতিটি ইউনিটে অন্তত পাঁচটি করে শয্যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নরমাল স্যালাইন, খাওয়ার স্যালাইন, প্যারাসিটামলসহ প্রয়োজনীয় ওষুধের মজুত রয়েছে। ভর্তি রোগীদের জন্য মশারিও সরবরাহ করা হচ্ছে।

এ ছাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা সদর হাসপাতালে ডেঙ্গু NS1 এবং Anti Dengue IgM পরীক্ষার কিট পর্যাপ্ত রয়েছে। খুলনা সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সমন্বয় করে মহানগরের ডেঙ্গু হটস্পটও চিহ্নিত করা হয়েছে। ১৭, ২২ ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের মাধ্যমে বিশেষ সচেতনতা ও চিকিৎসা ক্যাম্প পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব ক্যাম্পে বিনামূল্যে পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন সংগঠনও মাঠে নেমেছে। খুলনা মহানগর বিএনপি বর্তমান পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে দ্রুত খুলনাকে মহামারি এলাকা ঘোষণার দাবি জানিয়েছে। দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো বিভিন্ন ওয়ার্ডে মশক নিধন, সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ, রক্তদান এবং হাসপাতালে রোগীদের খোঁজখবর নেওয়ার কার্যক্রম চালাচ্ছে।

খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি শফিকুল আলম মনা জানান, ডেঙ্গু প্রতিরোধের পাশাপাশি রোগীদের চিকিৎসাসেবায়ও বিনামূল্যে সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসকের পরামর্শ, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং রক্তের গ্রুপ ম্যাচিং ও রক্ত সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আক্রান্ত থানা ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ সেবাকেন্দ্র গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

অন্যদিকে খুলনার আড়ংঘাটা থানা জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগেও ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়েছে। খুলনা মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমির মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধ কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের একার দায়িত্ব নয়; এটি একটি সামাজিক উদ্যোগ। জনগণের সচেতনতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর পথ।

এদিকে ডেঙ্গুর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে খুলনা সিটি করপোরেশনও ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালাচ্ছে। সংক্রমণ ও এডিস মশার লার্ভার ঘনত্বের ভিত্তিতে নগরীর ৩১টি ওয়ার্ডকে রেড, অরেঞ্জ ও ইয়েলো—তিনটি জোনে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১০টি ওয়ার্ডকে রেড জোন ঘোষণা করা হয়েছে।

রেড জোনের ওয়ার্ডগুলো হলো ১৭, ১৮, ২২, ২৩, ২৪, ২৫, ২৭, ২৮, ২৯ ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ড। এসব এলাকায় প্রতিদিন গড়ে ৭০ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন বলে নগর স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য। এ ছাড়া ১, ১৯, ২৬ ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ডকে অতিসংক্রামক এলাকা এবং ২, ১০ ও ১২ নম্বর ওয়ার্ডকে মৃদু আক্রান্ত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে ১৭, ২২ ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে বিনামূল্যে চিকিৎসা ক্যাম্প চালু করেছে কেসিসি। এসব ক্যাম্পে নাপা ট্যাবলেট ও স্যালাইন সরবরাহ করা হচ্ছে।

কেসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. শরীফ শামিউল ইসলাম জানিয়েছেন, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় নাপা ও স্যালাইন মজুত রয়েছে। মশক নিধন কার্যক্রম জোরদারে তিনটি উচ্চপর্যায়ের তদারকি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। প্রতিদিন সকালে লার্ভা ধ্বংসে অ্যাবেট স্প্রে এবং বিকেলে ফগিং মেশিনের মাধ্যমে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। পাশাপাশি নগরবাসীকে সচেতন করতে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে মাইকিং করা হচ্ছে।

এডিস মশার বংশবিস্তার রোধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে। কেসিসির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে বাসাবাড়ি, নির্মাণাধীন ভবন, ড্রেন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালানো হচ্ছে। কোথাও জমে থাকা পানি বা এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক জরিমানা করা হচ্ছে।

কেসিসি প্রশাসক নজরুল ইসলামু মঞ্জু বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী তিন মাস আগে থেকেই ডেঙ্গু প্রতিরোধে কাজ শুরু করা হয়েছে। পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা হলেও সংক্রমণ কমাতে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্য বিভাগের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করে মাঠে নামানো হয়েছে। তবে শুধু সিটি করপোরেশনের ওষুধ ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। নগরবাসীকেও নিজ নিজ বাড়ি ও আঙিনা পরিষ্কার রাখতে হবে। টব, এসি, ছাদ কিংবা অন্য কোথাও পানি জমে থাকলে তা অপসারণ করতে হবে। ঝোপঝাড় ও বদ্ধ পানি পরিষ্কার করেও এডিস মশার বংশবিস্তার বন্ধ করতে হবে।

সব মিলিয়ে খুলনায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি এখন স্বাস্থ্য বিভাগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে দ্রুত বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা, অন্যদিকে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে রোগীর চাপ। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের পরিস্থিতি আরও কঠিন হওয়ার আশঙ্কা থাকায় হাসপাতালের শয্যা ও জনবল বাড়ানোর পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং নগরবাসীর অংশগ্রহণে প্রতিরোধ কার্যক্রম জোরদার করা না গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর