infoamaderdin@gmail.com সোমবার, ৩ আগস্ট ২০২৬
১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩

ব্যস্ত নগরীর ফুটপাত দখল: ইসলামে কত বড় গুনাহ?

নিউজ ডেস্ক প্রকাশিত: ০২ আগষ্ট ২০২৬ ১৯:০৮ পিএম

একটি সভ্য নগরীর পরিচয় শুধু সুউচ্চ ভবন বা প্রশস্ত সড়কে প্রকাশ পায় না। নগর জীবনে মানুষের নির্বিঘ্ন চলাচলের নিশ্চয়তায় ও নিরাপত্তাও এর অন্যতম নির্ণায়ক। কিন্তু আজ দেশের অধিকাংশ ব্যস্ত শহরে ফুটপাত দখল, অবৈধ দোকান, নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখা, অবৈধ পার্কিং কিংবা বিভিন্ন স্থাপনার কারণে পথচারীদের দুর্ভোগ নিত্যদিনের বাস্তবতা।

বৃদ্ধ, শিশু, নারী, শিক্ষার্থী ও প্রতিবন্ধীরা বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মূল সড়কে হাঁটছেন। ফলে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা, এমনকি প্রাণহানিও। এতে যেমন বাড়ছে নাগরিক শৃঙ্খলার লঙ্ঘণের মাত্রা। তেমনি নু বুঝে মারাত্মক গুণানের শিকার হচ্ছে অনেক মুসলিম ভাই-বোনোরা। কারণ ইসলামের দৃষ্টিতে ফুটপাত দখল বা বিনা কারণে চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি অত্যন্ত গুরুতর গুনাহ।

রাসূলুল্লাহ (সা.) মানুষের চলার পথে কষ্ট সৃষ্টি করার ব্যাপারে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মুসলমানদের চলার পথে কষ্ট দেয়, তার ওপর তাদের লানত (অভিশাপ) অবধারিত হয়ে যায়।’ (সহিহুত তারগীব ওয়াত তারহীব, হাদিস: ১৪৮; আলবানী রহ. হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন।)

এই হাদিসে ‘কষ্ট’ (أذى) শব্দটি ব্যাপক অর্থ বহন করে। ইমাম আল-মুনাবী (রহ.) লিখেছেন, মানুষের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা, বিপদ ডেকে আনা বা তাদের স্বাভাবিক যাতায়াতে বিঘ্ন ঘটানো সবই এই সতর্কবার্তার অন্তর্ভুক্ত। (ফাইযুল কাদীর, ৬/৪৩৭)

পথ মানুষের অধিকার

ইসলাম জনসাধারণের অধিকারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। রাস্তা, ফুটপাত, সেতু বা জনপথ কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের একক সম্পত্তি নয়; এগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত। তাই ব্যক্তিগত লাভের জন্য এগুলো দখল করা অন্যের হক নষ্ট করার শামিল।

একবার সাহাবায়ে কেরাম রাস্তার পাশে বসে আলাপ করছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘তোমরা রাস্তার পাশে বসা থেকে বিরত থাকো।’ সাহাবিরা বললেন, আমাদের তো সেখানে বসা ছাড়া উপায় নেই। তখন তিনি বললেন, ‘যদি বসতেই হয়, তবে রাস্তার হক আদায় করবে।’
জিজ্ঞাসা করা হলো, রাস্তার হক কী? তিনি বললেন, ‘দৃষ্টি সংযত রাখা, কাউকে কষ্ট না দেওয়া, সালামের জবাব দেওয়া, সৎকাজের আদেশ করা এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করা।’ (বুখারি, হাদিস: ২৪৬৫; মুসলিম, হাদিস: ২১২১)

যেখানে রাস্তার পাশে বসার ক্ষেত্রেও এত শর্ত, সেখানে পুরো ফুটপাত দখল করে মানুষের চলার পথ বন্ধ করে দেওয়া যে কত বড় অন্যায়, তা সহজেই অনুমেয়।

পথ পরিষ্কার রাখাও ঈমানের অংশ

ইসলাম শুধু কষ্ট দিতে নিষেধ করেনি; বরং পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়াকে ঈমানের নিদর্শন হিসেবে ঘোষণা করেছে।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ঈমানের সত্তরেরও বেশি শাখা রয়েছে... আর পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়াও ঈমানের একটি শাখা।’ (মুসলিম, হাদিস: ৩৫)

অন্য একটি হাদিসে এসেছে, একজন ব্যক্তি রাস্তার ওপর পড়ে থাকা কাঁটাযুক্ত ডাল সরিয়ে দেওয়ার কারণে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করেন এবং জান্নাতের সুসংবাদ পান। (মুসলিম, হাদিস: ১৯১৪)

অর্থাৎ যে ধর্ম পথ পরিষ্কার করাকে জান্নাতের কারণ বলে, সেই ধর্মে ফুটপাত দখল করে মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি করা কতটা নিন্দনীয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

কোরআনের নির্দেশনা

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো; আর পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা করো না।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত : ২)

ফুটপাত দখল, অবৈধ স্থাপনা কিংবা জনপথে বাধা সৃষ্টি যদি সমাজের জন্য দুর্ভোগের কারণ হয়, তাহলে এ কাজে সহযোগিতা করাও এই আয়াতের আলোকে নিন্দনীয়।

আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না।’ (সুরা আরাফ, আয়াত : ৫৬)

যে কাজ মানুষের জীবন, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক চলাচলকে ব্যাহত করে, তা সামাজিক ফাসাদ বা বিপর্যয়েরই একটি রূপ।

সমসাময়িক বাস্তবতা

বাংলাদেশের বড় শহরগুলোতে ফুটপাত দখল একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসা, অবৈধ পার্কিং, নির্মাণসামগ্রী বা বর্জ্যের কারণে পথচারীরা ফুটপাত ব্যবহার করতে পারেন না। ফলে তারা যানবাহনের সঙ্গে একই সড়কে চলতে বাধ্য হন, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই বাস্তবতায় বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্বেরও প্রশ্ন।

আমাদের করণীয়

একজন মুসলিম কখনো নিজের সুবিধার জন্য অন্যের কষ্টের কারণ হতে পারেন না। ব্যবসা-বাণিজ্য অবশ্যই বৈধ; কিন্তু তা যদি হাজারো মানুষের পথ রুদ্ধ করে, তবে তা ইসলামের ন্যায়বোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একইভাবে নাগরিকদেরও উচিত যেখানে-সেখানে গাড়ি পার্কিং না করা, ময়লা না ফেলা, নির্মাণসামগ্রী ফুটপাতে না রাখা এবং জনপথকে সবার যৌথ অধিকার হিসেবে সম্মান করা।

রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন একটি সমাজ গড়তে চেয়েছেন, যেখানে মানুষ একে অপরের জন্য নিরাপত্তা ও স্বস্তির কারণ হবে। তাই ব্যস্ত নগরীর ফুটপাত দখল যেমন আইনের লঙ্ঘন। তেমনি ইসলামের নৈতিকতা ও জনঅধিকারেরও সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। একজন মুমিনের প্রকৃত চারিত্রিক বৈশিষ্ট অন্যকে কষ্ট দেওয়ায় পরিবর্তে মানুষের পথ সহজ করে দেওয়ার মধ্যেই বেশি প্রকাশ পায়।

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


ব্যস্ত নগরীর ফুটপাত দখল: ইসলামে কত বড় গুনাহ?

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০২ আগষ্ট ২০২৬ ১৯:০৮ পিএম

একটি সভ্য নগরীর পরিচয় শুধু সুউচ্চ ভবন বা প্রশস্ত সড়কে প্রকাশ পায় না। নগর জীবনে মানুষের নির্বিঘ্ন চলাচলের নিশ্চয়তায় ও নিরাপত্তাও এর অন্যতম নির্ণায়ক। কিন্তু আজ দেশের অধিকাংশ ব্যস্ত শহরে ফুটপাত দখল, অবৈধ দোকান, নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখা, অবৈধ পার্কিং কিংবা বিভিন্ন স্থাপনার কারণে পথচারীদের দুর্ভোগ নিত্যদিনের বাস্তবতা।

বৃদ্ধ, শিশু, নারী, শিক্ষার্থী ও প্রতিবন্ধীরা বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মূল সড়কে হাঁটছেন। ফলে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা, এমনকি প্রাণহানিও। এতে যেমন বাড়ছে নাগরিক শৃঙ্খলার লঙ্ঘণের মাত্রা। তেমনি নু বুঝে মারাত্মক গুণানের শিকার হচ্ছে অনেক মুসলিম ভাই-বোনোরা। কারণ ইসলামের দৃষ্টিতে ফুটপাত দখল বা বিনা কারণে চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি অত্যন্ত গুরুতর গুনাহ।

রাসূলুল্লাহ (সা.) মানুষের চলার পথে কষ্ট সৃষ্টি করার ব্যাপারে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মুসলমানদের চলার পথে কষ্ট দেয়, তার ওপর তাদের লানত (অভিশাপ) অবধারিত হয়ে যায়।’ (সহিহুত তারগীব ওয়াত তারহীব, হাদিস: ১৪৮; আলবানী রহ. হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন।)

এই হাদিসে ‘কষ্ট’ (أذى) শব্দটি ব্যাপক অর্থ বহন করে। ইমাম আল-মুনাবী (রহ.) লিখেছেন, মানুষের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা, বিপদ ডেকে আনা বা তাদের স্বাভাবিক যাতায়াতে বিঘ্ন ঘটানো সবই এই সতর্কবার্তার অন্তর্ভুক্ত। (ফাইযুল কাদীর, ৬/৪৩৭)

পথ মানুষের অধিকার

ইসলাম জনসাধারণের অধিকারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। রাস্তা, ফুটপাত, সেতু বা জনপথ কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের একক সম্পত্তি নয়; এগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত। তাই ব্যক্তিগত লাভের জন্য এগুলো দখল করা অন্যের হক নষ্ট করার শামিল।

একবার সাহাবায়ে কেরাম রাস্তার পাশে বসে আলাপ করছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘তোমরা রাস্তার পাশে বসা থেকে বিরত থাকো।’ সাহাবিরা বললেন, আমাদের তো সেখানে বসা ছাড়া উপায় নেই। তখন তিনি বললেন, ‘যদি বসতেই হয়, তবে রাস্তার হক আদায় করবে।’
জিজ্ঞাসা করা হলো, রাস্তার হক কী? তিনি বললেন, ‘দৃষ্টি সংযত রাখা, কাউকে কষ্ট না দেওয়া, সালামের জবাব দেওয়া, সৎকাজের আদেশ করা এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করা।’ (বুখারি, হাদিস: ২৪৬৫; মুসলিম, হাদিস: ২১২১)

যেখানে রাস্তার পাশে বসার ক্ষেত্রেও এত শর্ত, সেখানে পুরো ফুটপাত দখল করে মানুষের চলার পথ বন্ধ করে দেওয়া যে কত বড় অন্যায়, তা সহজেই অনুমেয়।

পথ পরিষ্কার রাখাও ঈমানের অংশ

ইসলাম শুধু কষ্ট দিতে নিষেধ করেনি; বরং পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়াকে ঈমানের নিদর্শন হিসেবে ঘোষণা করেছে।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ঈমানের সত্তরেরও বেশি শাখা রয়েছে... আর পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়াও ঈমানের একটি শাখা।’ (মুসলিম, হাদিস: ৩৫)

অন্য একটি হাদিসে এসেছে, একজন ব্যক্তি রাস্তার ওপর পড়ে থাকা কাঁটাযুক্ত ডাল সরিয়ে দেওয়ার কারণে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করেন এবং জান্নাতের সুসংবাদ পান। (মুসলিম, হাদিস: ১৯১৪)

অর্থাৎ যে ধর্ম পথ পরিষ্কার করাকে জান্নাতের কারণ বলে, সেই ধর্মে ফুটপাত দখল করে মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি করা কতটা নিন্দনীয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

কোরআনের নির্দেশনা

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো; আর পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা করো না।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত : ২)

ফুটপাত দখল, অবৈধ স্থাপনা কিংবা জনপথে বাধা সৃষ্টি যদি সমাজের জন্য দুর্ভোগের কারণ হয়, তাহলে এ কাজে সহযোগিতা করাও এই আয়াতের আলোকে নিন্দনীয়।

আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না।’ (সুরা আরাফ, আয়াত : ৫৬)

যে কাজ মানুষের জীবন, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক চলাচলকে ব্যাহত করে, তা সামাজিক ফাসাদ বা বিপর্যয়েরই একটি রূপ।

সমসাময়িক বাস্তবতা

বাংলাদেশের বড় শহরগুলোতে ফুটপাত দখল একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসা, অবৈধ পার্কিং, নির্মাণসামগ্রী বা বর্জ্যের কারণে পথচারীরা ফুটপাত ব্যবহার করতে পারেন না। ফলে তারা যানবাহনের সঙ্গে একই সড়কে চলতে বাধ্য হন, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই বাস্তবতায় বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্বেরও প্রশ্ন।

আমাদের করণীয়

একজন মুসলিম কখনো নিজের সুবিধার জন্য অন্যের কষ্টের কারণ হতে পারেন না। ব্যবসা-বাণিজ্য অবশ্যই বৈধ; কিন্তু তা যদি হাজারো মানুষের পথ রুদ্ধ করে, তবে তা ইসলামের ন্যায়বোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একইভাবে নাগরিকদেরও উচিত যেখানে-সেখানে গাড়ি পার্কিং না করা, ময়লা না ফেলা, নির্মাণসামগ্রী ফুটপাতে না রাখা এবং জনপথকে সবার যৌথ অধিকার হিসেবে সম্মান করা।

রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন একটি সমাজ গড়তে চেয়েছেন, যেখানে মানুষ একে অপরের জন্য নিরাপত্তা ও স্বস্তির কারণ হবে। তাই ব্যস্ত নগরীর ফুটপাত দখল যেমন আইনের লঙ্ঘন। তেমনি ইসলামের নৈতিকতা ও জনঅধিকারেরও সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। একজন মুমিনের প্রকৃত চারিত্রিক বৈশিষ্ট অন্যকে কষ্ট দেওয়ায় পরিবর্তে মানুষের পথ সহজ করে দেওয়ার মধ্যেই বেশি প্রকাশ পায়।

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর