ইসলামী ব্যাংকিংয়ে ধসের শঙ্কা, গোপন খেলাপি ঋণ: তোপের মুখে বাংলাদেশ ব্যাংক
দেশের ব্যাংকিং খাতের প্রায় ৩০ শতাংশ শরিয়াহভিত্তিক হলেও মুদ্রানীতিতে ইসলামী ব্যাংকিংকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়া, একটি ইসলামী ব্যাংক থেকে এক মাসে হাজার হাজার কোটি টাকা আমানত উত্তোলন এবং দীর্ঘদিন গোপন থাকা খেলাপি ঋণের প্রকৃত তথ্য নিয়ে সংসদীয় কমিটির তীব্র প্রশ্নের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সংসদীয় কমিটির বৈঠকে সদস্যরা অভিযোগ করেন, শরিয়াহ বোর্ডের দুর্বলতা, সুশাসনের ঘাটতি ও ব্যাংকিং খাতে অনিয়মের কারণে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়লেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক কার্যকরভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেনি। একই সঙ্গে গোপন থাকা প্রকৃত খেলাপি ঋণের তথ্য প্রকাশ পাওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদ ভবনের ক্যাবিনেট কক্ষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠকে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমানসহ অর্থ মন্ত্রণালয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকের শুরুতে বাংলাদেশ ব্যাংকের উপস্থাপিত প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। কমিটির সভাপতি বলেন, প্রতিবেদনটি তথ্যসমৃদ্ধ হলেও অতিরিক্ত কারিগরি ও জটিল হওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সহজ ও সংক্ষিপ্তভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাংগঠনিক কাঠামো, জনবল, দায়িত্ব বণ্টন এবং গত কয়েক বছরের মুদ্রানীতির কার্যকারিতা নিয়ে আরও স্পষ্ট ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা এবং বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সহায়তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন কমিটির সদস্যরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষা করাই মুদ্রানীতির প্রধান অগ্রাধিকার। পরে ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান বিস্তারিত উপস্থাপনার মাধ্যমে মুদ্রানীতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
ডেপুটি গভর্নর জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। এর পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, বৈদেশিক মুদ্রাবাজার ও রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা এবং ব্যাংকগুলোর তদারকিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবর্তন ও দেশের আর্থিক খাতের বিকাশের কারণে মুদ্রা সরবরাহভিত্তিক নীতি থেকে ধীরে ধীরে নীতি সুদভিত্তিক মুদ্রানীতিতে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে গত কয়েক বছরে নীতি সুদের হার বাড়ানোর পরও মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশিত মাত্রায় কমেনি। সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে মুদ্রানীতির প্রভাব পুরোপুরি কার্যকর হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
গভর্নরও স্বীকার করেন, সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করে নীতি সুদের হার বাড়ানো হলেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এর প্রত্যাশিত প্রভাব পাওয়া যায়নি। বরং উচ্চ সুদের কারণে বেসরকারি ঋণপ্রবাহ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
সংসদ সদস্যদের একাংশ দেশের অর্থনীতিকে সচল করতে নীতি সুদের হার একক অঙ্কে নামিয়ে আনার দাবি জানান। তাঁদের মতে, উচ্চ সুদের হার ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পায়ন ও নতুন কর্মসংস্থানের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বৈঠকে একটি ইসলামী ব্যাংক থেকে মাত্র এক মাসে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা আমানত উত্তোলনের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। সংসদ সদস্যরা প্রশ্ন তোলেন, এত বড় অঙ্কের আমানত প্রত্যাহারের ঘটনা কীভাবে ঘটল এবং এ ধরনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি কতটা কার্যকর ছিল।
ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে শরিয়াহ বোর্ডের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। কমিটির সদস্যরা দেশের মোট ব্যাংকিং কার্যক্রমের বড় একটি অংশ শরিয়াহভিত্তিক হওয়ায় মুদ্রানীতিতে এ খাতের জন্য আরও স্পষ্ট নীতিগত কাঠামো এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং বিভাগ শক্তিশালী করার দাবি জানান।
গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান ইসলামী ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের উদ্যোগের কথা জানিয়ে শরিয়াহ বোর্ড পুনর্গঠন ও শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দেন। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোতে যথাযথ কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করার কথাও জানান তিনি।
বৈঠকে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়গুলোর একটি ছিল খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র। গভর্নর জানান, কয়েকটি ব্যাংকে বিশেষ নিরীক্ষা, সম্পদের মান পর্যালোচনা এবং ফরেনসিক অডিট শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন গোপন থাকা খেলাপি ঋণের প্রকৃত তথ্যও পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করা হচ্ছে।
খেলাপি ঋণ আদায়ে ১৮ মাসের একটি রোডম্যাপ নেওয়ার কথাও জানান গভর্নর। এর মধ্যে প্রথম ছয় মাস ব্যাংক ও গ্রাহকের মধ্যে সমঝোতার সুযোগ এবং পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগের মাধ্যমে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির পরিকল্পনা রয়েছে। ঋণের প্রকৃত সুবিধাভোগী বা আল্টিমেট বেনিফিশিয়ারি শনাক্ত করে তাদের আইনি জবাবদিহির আওতায় আনার উদ্যোগের কথাও জানানো হয়।
সংসদ সদস্যরা শুধু ঋণগ্রহীতাকে নয়, ঋণ অনুমোদনের সঙ্গে জড়িত ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানান। খেলাপি ঋণ উদ্ধারে তৃতীয় পক্ষ নিয়োগের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছ ও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
অন্যদিকে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ বিবেচনায় থাকার কথা জানিয়েছেন গভর্নর। তিনি জানান, অতীতে প্রণোদনার অর্থ অপব্যবহারের অভিযোগ থাকায় এবার বড় ব্যবসায়িক গ্রুপের পরিবর্তে ক্ষুদ্র ও উৎপাদনমুখী উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে এই প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থের উৎস ও ব্যবস্থাপনা নিয়েও সংসদ সদস্যদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। প্যাকেজের একটি অংশ উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন অর্থ বা হাই পাওয়ারড মানি থেকে জোগানের প্রস্তাব থাকায় এর ফলে অর্থ সরবরাহ কতটা বাড়তে পারে, সে বিষয়েও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।
বৈঠকে রুগ্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রস্তাবিত ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল নিয়েও আলোচনা হয়। কোন ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান এই তহবিল পাবে, বন্ধ কারখানা চালু ও নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে অর্থ কীভাবে ব্যবহার হবে এবং পুরো প্রক্রিয়ার নজরদারি কীভাবে করা হবে, তা জানতে চান সংসদ সদস্যরা।
এ ছাড়া মুদ্রানীতি প্রতি ছয় মাসের পরিবর্তে তিন মাস অন্তর পর্যালোচনার বিষয়টি বিবেচনা করার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সংসদ সদস্যদের একাংশ নিয়মিতভাবে তিন মাস অন্তর মুদ্রানীতি পর্যালোচনার পক্ষে মত দেন।
বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা, ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম, উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও গভর্নর জানান, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা ফেরাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে।
পরবর্তী বৈঠকে ব্যাংকিং খাত, ঋণের প্রকৃত সুদহার, কস্ট অব ফান্ড এবং উদ্যোক্তাদের সমস্যা নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা হবে বলে জানান কমিটির সভাপতি। তাঁর মতে, দেশের বিনিয়োগ ও বাণিজ্য পরিবেশ উন্নত করতে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।
সংসদীয় কমিটির সদস্যদের বক্তব্যে উঠে এসেছে, শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বা অর্থনীতি পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ইসলামী ব্যাংকিংয়ের কার্যকর সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব সুদের হার এবং জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলো সমন্বিতভাবে মোকাবিলা করলেই অর্থনীতিতে গতি ফেরানো সম্ভব।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: