তদবিরে জাতীয়করণ, যোগ্য প্রতিষ্ঠান বঞ্চিত: পিছিয়ে থাকা স্কুল-কলেজও তালিকায়
শিক্ষার মান, পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল ও অবকাঠামোগত সক্ষমতায় এগিয়ে থাকা অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ থেকে বঞ্চিত হলেও তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকা কিছু প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের তালিকায় জায়গা পেয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রভাবশালী ব্যক্তি, মন্ত্রী-এমপিদের ডিও লেটার ও সুপারিশের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে জাতীয়করণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ৩০ আগস্ট পর্যন্ত ২৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ বা সরকারিকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে সরকারিকরণের প্রজ্ঞাপন পেয়েছে। বাকি ২৪টি প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে।
অন্যদিকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় দেড় বছরে ১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ বা সরকারিকরণ করেছিল। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই নিজ নিজ উপজেলায় একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ার যোগ্যতা, ভালো ফলাফল কিংবা শিক্ষার মানের মতো বিষয় বিবেচনায় এগিয়ে ছিল।
শরীয়তপুরের ডামুড্যার আলহাজ্ব ইমাম উদ্দিন মডেল উচ্চ বিদ্যালয় ২০২২ সালে উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি পেয়েছিল। জেএসসি ও এসএসসিসহ বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির ফলাফলও ভালো। তবে এখনো জাতীয়করণের আওতায় আসেনি প্রতিষ্ঠানটি।
বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক আলমগীর হোসেন অভিযোগ করে বলেন, বর্তমানে তুলনামূলকভাবে অযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর জাতীয়করণের জন্যও চিঠি ইস্যু হচ্ছে। সংসদ সদস্যদের ডিও লেটার বা সুপারিশের ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সরকারি করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তার মতে, প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা, ফলাফল ও শিক্ষার মান যথাযথভাবে যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। অন্যথায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বৈষম্য তৈরি হবে।
কুষ্টিয়ার কুমারখালী এম এন মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. তৌহিদুল ইসলাম জানান, ১৮৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটি উপজেলা পর্যায়ে বরাবরই ভালো ফল করে আসছে। তার দাবি, সরকারি হওয়ার বিভিন্ন যোগ্যতা পূরণ করলেও প্রতিষ্ঠানটি জাতীয়করণ করা হয়নি। অথচ মন্ত্রী-এমপিদের ডিও লেটার বা সুপারিশের ভিত্তিতে তুলনামূলক কম যোগ্য প্রতিষ্ঠান সরকারি করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
জাতীয়করণের তালিকা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলা শহরের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের শতভাগ পাস করানোর পাশাপাশি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক জিপিএ-৫ অর্জন করেছে। শিক্ষার মান, ফলাফল ও অবকাঠামোগত সক্ষমতায় এগিয়ে থাকা এসব প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের তালিকায় না থাকলেও কম ফল করা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের তালিকায় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাধারণভাবে কোনো বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ বা সরকারিকরণের ক্ষেত্রে এমপিওভুক্ত হওয়া, প্যাটার্নভুক্ত শিক্ষক থাকা, শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফল এবং সংশ্লিষ্ট এলাকায় সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তার মতো বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়। আবেদনের পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে প্রয়োজনীয় কার্যক্রমের দায়িত্ব দেয়। মাউশির তদন্ত প্রতিবেদন এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতির পর সরকারিকরণের প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার কথা।
তবে বাস্তবে এই প্রক্রিয়ায় ব্যত্যয় ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জাতীয়করণ হওয়া কিংবা সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর্যায়ে থাকা অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই সংশ্লিষ্ট এলাকার মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সুপারিশের ভিত্তিতে নির্বাচিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হিসেবে বান্দরবানের থানচির তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নাম এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সরকারিকরণ করা হলেও সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, দুর্গম এলাকার বাস্তবতা ও মানবিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এটি জাতীয়করণ করা হয়েছে।
বগুড়ার গাবতলীতে অবস্থিত শহীদ জিয়া ডিগ্রি কলেজও জাতীয়করণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। চলতি বছরের ২০ এপ্রিল বগুড়ার এক সমাবেশে প্রতিষ্ঠানটি সরকারিকরণের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
বগুড়ার শিবগঞ্জ পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয় গত ২৫ আগস্ট সরকারিকরণ করা হয়েছে। একইভাবে গত ২৭ আগস্ট গাবতলী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ও সরকারি করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির নতুন নাম হয়েছে গাবতলী সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় এবং এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।
এ ছাড়া ভোলার তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারিকরণের প্রশাসনিক কার্যক্রম দ্রুত শেষ করতে গত ২০ জুলাই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো চরফ্যাশনের ফাতেমা-মতিন মহিলা মহাবিদ্যালয়, চরফ্যাশন বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং মনপুরার সাকুচিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এর আগে ভোলা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম নয়ন প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারিকরণের দাবিতে আবেদন করেছিলেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার শিবগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও শিবগঞ্জ মহিলা ডিগ্রি কলেজও জাতীয়করণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের তালিকায় রয়েছে। জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. মো. সাইমুম পারভেজ প্রতিষ্ঠান দুটি জাতীয়করণের জন্য আবেদন করেন। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গত ২১ আগস্ট প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট তালিকায় ১৯টি কলেজকে জাতীয়করণের প্রস্তাব পাওয়া গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের তথ্য যাচাই করে সরকারিকরণ কার্যক্রমের অগ্রগতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠাতে বলা হয়েছে।
তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর ফলাফল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পাবনার সেলিম রেজা হাবিব ডিগ্রি কলেজ থেকে ২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় ২০৯ জন অংশ নিয়ে পাস করেছে ১১১ জন। পাসের হার ৫৩ দশমিক ১১ শতাংশ। ওই বছর প্রতিষ্ঠানটির কোনো শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পায়নি।
গাজীপুরের কালিয়াকৈর কলেজের ফলাফলও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আশানুরূপ নয়। ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটির ৬৭৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৪০১ জন পাস করে। পাসের হার ছিল ৫৯ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছিল চারজন। ২০২৫ সালে ৬১২ জনের মধ্যে পাস করে ২৪০ জন। পাসের হার নেমে আসে ৩৯ দশমিক ২২ শতাংশে। ওই বছর জিপিএ-৫ পায় মাত্র দুজন।
বগুড়ার শহীদ জিয়া ডিগ্রি কলেজে ২০২৪ সালে ৩০৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২৭০ জন পাস করে। পাসের হার ছিল ৮৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পায় ১২ জন। তবে ২০২৫ সালে ২৬৪ জনের মধ্যে পাস করে ১১৫ জন। পাসের হার নেমে আসে ৪৩ দশমিক ৫৬ শতাংশে এবং জিপিএ-৫ পায় মাত্র তিনজন।
অন্যদিকে বগুড়ার গাবতলী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ফলাফল তুলনামূলকভাবে ভালো হলেও ২০২৬ সালে প্রতিষ্ঠানটির পাসের হার কমেছে। ২০২৪ সালে ১৯৪ জনের মধ্যে ১৫৮ জন পাস করে এবং ৩২ জন জিপিএ-৫ পায়। ২০২৫ সালে ২০৭ জনের মধ্যে ১৬৬ জন পাস করে এবং জিপিএ-৫ পায় ২৫ জন। ২০২৬ সালে ২১৯ জনের মধ্যে ১৩২ জন পাস করে। পাসের হার ছিল ৬০ দশমিক ২৭ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পায় ১২ জন।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ বড় ধরনের প্রশাসনিক ও আর্থিক সিদ্ধান্ত। শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষার্থীর সংখ্যা, ভৌগোলিক প্রয়োজন এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের ঘাটতির মতো বিষয় বিবেচনায় নিয়ে জাতীয়করণ করা হলে তা শিক্ষাব্যবস্থায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু স্বচ্ছ ও অভিন্ন নীতিমালা ছাড়া ব্যক্তি বা রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের সুপারিশের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠান সরকারি করা হলে দীর্ঘমেয়াদে বৈষম্য ও তদবিরের সংস্কৃতি আরও বাড়তে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, তদবির ও সুপারিশের ভিড়ে অনেক অযোগ্য প্রতিষ্ঠান সরকারি হচ্ছে। স্থানীয় নেতাদের চাপে মন্ত্রী-এমপিরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সুপারিশ পাঠান এবং সেই সুপারিশের ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান সরকারি হয়ে যায়। এ ধরনের প্রক্রিয়া বন্ধ হওয়া দরকার।
তিনি বলেন, জাতীয়করণের জন্য একটি শক্তিশালী নীতিমালা প্রয়োজন। কোন প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি হওয়া প্রয়োজন, তার একটি ম্যাপিং থাকতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে এমপিরা নিজেদের বাড়ির পাশের প্রতিষ্ঠান সরকারি করার জন্য সুপারিশ করেন। অথচ একই এলাকায় একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠান থাকলেও সেগুলোর ফলাফল খারাপ এবং অনেক প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীও পায় না।
অধ্যাপক মজিবুর রহমানের মতে, জাতীয়করণের জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকলে সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব। কিন্তু নীতিমালা না থাকার সুযোগে যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে সরকারি করার সুযোগ তৈরি হয়।
এদিকে জাতীয়করণের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিনের বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, জাতীয়করণের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক প্রভাবের পরিবর্তে শিক্ষার মান, ফলাফল, অবকাঠামো, শিক্ষার্থীর সংখ্যা, এলাকার প্রয়োজন এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের ঘাটতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। তা না হলে একদিকে যোগ্য প্রতিষ্ঠান বঞ্চিত হবে, অন্যদিকে জাতীয়করণ প্রক্রিয়া নিয়ে তদবির ও বৈষম্যের অভিযোগ আরও জোরালো হতে পারে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: