infoamaderdin@gmail.com শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬
২৭ আষাঢ় ১৪৩৩

সক্রিয় ফল্ট লাইনে বিশ্বের বৃহত্তম বাঁধ নির্মাণ করছে চীন, চীনা বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা—‘ভূতাত্ত্বিক টাইম বোমা’

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: ১১ জুলাই ২০২৬ ১৮:০৭ পিএম

তিব্বতের ইয়ারলুং সাংপো (ভারতে ব্রহ্মপুত্র এবং বাংলাদেশে যমুনা নামে পরিচিত) নদীর ওপর বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করছে চীন। তবে এই মেগা প্রকল্পের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। চীনের সরকারি ভূবিজ্ঞানীদের এক গবেষণায় প্রকল্পটির নিচে একটি সক্রিয় ভূগর্ভস্থ চ্যুতি (ফল্ট লাইন) শনাক্ত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।

গবেষকদের মতে, এটি ভবিষ্যতে বাঁধ, জলাধার এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

হংকংভিত্তিক সংবাদমাধ্যম *সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট* জানায়, চীনের রাষ্ট্রীয় সংস্থা **চায়না জিওলজিক্যাল সার্ভে**-এর তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। মান্দারিন ভাষায় প্রকাশিত **Sedimentary Geology and Tethyan Geology** সাময়িকীতে প্রকাশিত ওই গবেষণা পরিচালনা করেন চেংদু ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি, চায়না জিওলজিক্যাল সার্ভের সিভিল-মিলিটারি ইন্টিগ্রেশন সেন্টার এবং মিডল ইয়ারলুং সাংপো রিভার ন্যাচারাল রিসোর্সেস অবজারভেশন অ্যান্ড রিসার্চ স্টেশনের একদল ভূতাত্ত্বিক।

গবেষণায় বলা হয়েছে, **‘পাইঝেন ফল্ট’** নামে পরিচিত ভূগর্ভস্থ চ্যুতিটি প্লাইস্টোসিন যুগ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সক্রিয় রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ার ফলে আশপাশের শিলাস্তর ভেঙে দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে বিশাল জলাধারে পানি ধারণের পর বাঁধের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হলে কাঠামোগত ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন গবেষকেরা।

তাঁদের মতে, নির্মাণাধীন ৬০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিশাল জলাধার পূর্ণ হলে দীর্ঘমেয়াদি পানির চাপ, ফল্ট লাইনের সক্রিয়তা এবং সম্ভাব্য ভূমিকম্প মিলিয়ে পার্বত্য ঢালে বড় ধরনের ভূমিধসের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এতে বাঁধ, সেতু, টানেল, সংযোগ সড়ক এবং প্রকল্পে কর্মরত ব্যক্তিদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।

গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়, প্রকল্পটি হিমালয়ের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত। চীন ও ভারতীয় উপমহাদেশের টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষের কারণে এই এলাকায় নিয়মিত ভূমিকম্প ঘটে থাকে। কোয়াটারনারি যুগের ভূতাত্ত্বিক তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখতে পেয়েছেন, পাইঝেন ফল্টটি এখনো সক্রিয় রয়েছে।

প্রাচীন হ্রদের তলদেশের পলির কার্বন ডেটিং বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় ৯ হাজার ৫০০ বছর আগেও এই ফল্ট লাইনে ভূতাত্ত্বিক কার্যক্রম চলমান ছিল। এছাড়া ২০১৭ সালে তিব্বতের মিলিন এলাকায় সংঘটিত ৬ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্পও এই ফল্ট লাইনের উত্তরাংশের কাছাকাছি সংঘটিত হয়েছিল বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, ভবিষ্যতে যদি মাঝারি বা বড় মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে, তাহলে বাঁধের কাঠামো মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে ভূমিধস ও আকস্মিক কৃত্রিম বন্যার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তার প্রভাব ভাটির দেশ ভারত ও বাংলাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।

উল্লেখ্য, তিব্বতে গত বছর এই মেগা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী এর উৎপাদনক্ষমতা হবে প্রায় **৬০ হাজার মেগাওয়াট**, যা বিদ্যমান থ্রি গর্জেস বাঁধের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি। বছরে প্রায় **৩০০ বিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা** বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

ইয়ারলুং সাংপো নদী তিব্বত থেকে ভারতের অরুণাচল প্রদেশ ও আসামের মধ্য দিয়ে **ব্রহ্মপুত্র** নামে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে **যমুনা** নামে প্রবেশ করে। ফলে নদীটির ভাটিতে অবস্থানরত ভারত ও বাংলাদেশের জন্য প্রকল্পটির সম্ভাব্য পরিবেশগত, ভূতাত্ত্বিক ও জলসম্পদ-সংক্রান্ত প্রভাব নিয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে।

যদিও চীনা গবেষকেরা সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করেছেন, তবে বাঁধটি নিশ্চিতভাবে বিপর্যয়ের মুখে পড়বে—এমন সিদ্ধান্ত তাঁরা দেননি। গবেষণায় মূলত সক্রিয় ফল্ট লাইনের উপস্থিতির কারণে প্রকল্পটির নিরাপত্তা মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


সক্রিয় ফল্ট লাইনে বিশ্বের বৃহত্তম বাঁধ নির্মাণ করছে চীন, চীনা বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা—‘ভূতাত্ত্বিক টাইম বোমা’

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১ জুলাই ২০২৬ ১৮:০৭ পিএম

তিব্বতের ইয়ারলুং সাংপো (ভারতে ব্রহ্মপুত্র এবং বাংলাদেশে যমুনা নামে পরিচিত) নদীর ওপর বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করছে চীন। তবে এই মেগা প্রকল্পের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। চীনের সরকারি ভূবিজ্ঞানীদের এক গবেষণায় প্রকল্পটির নিচে একটি সক্রিয় ভূগর্ভস্থ চ্যুতি (ফল্ট লাইন) শনাক্ত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।

গবেষকদের মতে, এটি ভবিষ্যতে বাঁধ, জলাধার এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

হংকংভিত্তিক সংবাদমাধ্যম *সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট* জানায়, চীনের রাষ্ট্রীয় সংস্থা **চায়না জিওলজিক্যাল সার্ভে**-এর তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। মান্দারিন ভাষায় প্রকাশিত **Sedimentary Geology and Tethyan Geology** সাময়িকীতে প্রকাশিত ওই গবেষণা পরিচালনা করেন চেংদু ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি, চায়না জিওলজিক্যাল সার্ভের সিভিল-মিলিটারি ইন্টিগ্রেশন সেন্টার এবং মিডল ইয়ারলুং সাংপো রিভার ন্যাচারাল রিসোর্সেস অবজারভেশন অ্যান্ড রিসার্চ স্টেশনের একদল ভূতাত্ত্বিক।

গবেষণায় বলা হয়েছে, **‘পাইঝেন ফল্ট’** নামে পরিচিত ভূগর্ভস্থ চ্যুতিটি প্লাইস্টোসিন যুগ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সক্রিয় রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ার ফলে আশপাশের শিলাস্তর ভেঙে দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে বিশাল জলাধারে পানি ধারণের পর বাঁধের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হলে কাঠামোগত ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন গবেষকেরা।

তাঁদের মতে, নির্মাণাধীন ৬০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিশাল জলাধার পূর্ণ হলে দীর্ঘমেয়াদি পানির চাপ, ফল্ট লাইনের সক্রিয়তা এবং সম্ভাব্য ভূমিকম্প মিলিয়ে পার্বত্য ঢালে বড় ধরনের ভূমিধসের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এতে বাঁধ, সেতু, টানেল, সংযোগ সড়ক এবং প্রকল্পে কর্মরত ব্যক্তিদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।

গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়, প্রকল্পটি হিমালয়ের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত। চীন ও ভারতীয় উপমহাদেশের টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষের কারণে এই এলাকায় নিয়মিত ভূমিকম্প ঘটে থাকে। কোয়াটারনারি যুগের ভূতাত্ত্বিক তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখতে পেয়েছেন, পাইঝেন ফল্টটি এখনো সক্রিয় রয়েছে।

প্রাচীন হ্রদের তলদেশের পলির কার্বন ডেটিং বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় ৯ হাজার ৫০০ বছর আগেও এই ফল্ট লাইনে ভূতাত্ত্বিক কার্যক্রম চলমান ছিল। এছাড়া ২০১৭ সালে তিব্বতের মিলিন এলাকায় সংঘটিত ৬ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্পও এই ফল্ট লাইনের উত্তরাংশের কাছাকাছি সংঘটিত হয়েছিল বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, ভবিষ্যতে যদি মাঝারি বা বড় মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে, তাহলে বাঁধের কাঠামো মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে ভূমিধস ও আকস্মিক কৃত্রিম বন্যার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তার প্রভাব ভাটির দেশ ভারত ও বাংলাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।

উল্লেখ্য, তিব্বতে গত বছর এই মেগা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী এর উৎপাদনক্ষমতা হবে প্রায় **৬০ হাজার মেগাওয়াট**, যা বিদ্যমান থ্রি গর্জেস বাঁধের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি। বছরে প্রায় **৩০০ বিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা** বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

ইয়ারলুং সাংপো নদী তিব্বত থেকে ভারতের অরুণাচল প্রদেশ ও আসামের মধ্য দিয়ে **ব্রহ্মপুত্র** নামে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে **যমুনা** নামে প্রবেশ করে। ফলে নদীটির ভাটিতে অবস্থানরত ভারত ও বাংলাদেশের জন্য প্রকল্পটির সম্ভাব্য পরিবেশগত, ভূতাত্ত্বিক ও জলসম্পদ-সংক্রান্ত প্রভাব নিয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে।

যদিও চীনা গবেষকেরা সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করেছেন, তবে বাঁধটি নিশ্চিতভাবে বিপর্যয়ের মুখে পড়বে—এমন সিদ্ধান্ত তাঁরা দেননি। গবেষণায় মূলত সক্রিয় ফল্ট লাইনের উপস্থিতির কারণে প্রকল্পটির নিরাপত্তা মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর