জিয়াউলকে ঘিরে স্যাবোটাজের আশঙ্কা, অস্ত্র ছিনিয়ে পালানোর পরিকল্পনার তথ্য
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাবেক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানকে হাজির করার সময় হঠাৎ করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। এতদিন স্বাভাবিকভাবে ট্রাইব্যুনালে আনা হলেও গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে তাকে হাতকড়া, বুলেটপ্রুফ ভেস্ট ও হেলমেট পরিয়ে হাজির করা হচ্ছে। বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যের সংখ্যাও।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, জিয়াউল আহসানকে ঘিরে সম্ভাব্য স্যাবোটাজ বা নাশকতার আশঙ্কা থেকে এ ধরনের বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্যের কাছ থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে ব্রাশফায়ার করে পালানোর পরিকল্পনা থাকতে পারে—এমন গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার কথাও জানিয়েছে একটি সূত্র। তবে এ তথ্যের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
জিয়াউল আহসান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত গুম ও হত্যার অভিযোগে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাসহ একাধিক মামলায় আসামি। তার বিরুদ্ধে করা শতাধিক গুম-খুনের মামলাটি বর্তমানে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। এ মামলায় সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া, জিয়াউলের সাবেক দেহরক্ষী ইমরুল কায়েসসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা সাক্ষ্য দিয়েছেন।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, গুম ও হত্যার শিকার ব্যক্তিদের স্বজন এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যে জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ উঠে আসছে। এ মামলায় এখন পর্যন্ত ১০ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর দাবি
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মামলার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন সাক্ষী, বিশেষ করে জিয়াউলের সাবেক দেহরক্ষী, র্যাবের সাবেক সিওসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাক্ষ্যের পর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়। একই সময়ে ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তা নিয়েও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সতর্কতা জারি করেছে বলে দাবি সূত্রের।
একটি দায়িত্বশীল সূত্রের ভাষ্য, ট্রাইব্যুনালে আসামি আনা-নেওয়ার দায়িত্বে থাকা কোনো পুলিশ সদস্যের কাছ থেকে ভারী অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড চালানোর পরিকল্পনা থাকতে পারে। ব্রাশফায়ার করে পালানোর পরিকল্পনার কথাও গোয়েন্দা তথ্য হিসেবে সামনে এসেছে বলে সূত্রটি দাবি করেছে।
এ ছাড়া জিয়াউল আহসানের কাছে থাকা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের কারণে অন্য কোনো পক্ষও তাকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে—এমন আশঙ্কার কথাও বলা হচ্ছে। এসব তথ্য পাওয়ার পর গত সপ্তাহে প্রসিকিউশন টিমের সঙ্গে বৈঠক করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। এরপর ট্রাইব্যুনালের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা আরও জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
১ সেপ্টেম্বর থেকে বদলে যায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা
কেরানীগঞ্জ বিশেষ কারাগার থেকে এতদিন জিয়াউল আহসানকে অন্যরকম নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ট্রাইব্যুনালে আনা হতো। প্রিজনভ্যান থেকে নামিয়ে হাজতখানায় নেওয়ার সময় তার হাতে হাতকড়া থাকত না। মামলার নথিপত্রও তিনি নিজেই বহন করতেন। সঙ্গে থাকতেন দু-একজন পুলিশ সদস্য।
তবে ১ সেপ্টেম্বর থেকে দৃশ্যপট বদলে যায়। ওই দিন তাকে অন্য আসামিদের মতো হাতকড়া পরিয়ে ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায় নেওয়া হয়। পরদিন ২ সেপ্টেম্বর তার শরীরে বুলেটপ্রুফ ভেস্ট পরানো হয় এবং দুই হাতে হাতকড়া দেওয়া হয়। তাকে ঘিরে আগে-পিছে মোতায়েন করা হয় আরও বেশি সংখ্যক পুলিশ সদস্য।
৩ সেপ্টেম্বরও একই ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। সেদিন তার দুই হাত পেছনে নিয়ে হাতকড়া পরানো ছিল। মাথায় ছিল হেলমেট এবং শরীরে বুলেটপ্রুফ ভেস্ট।
ট্রাইব্যুনালে আপত্তি জিয়াউলের
বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন জিয়াউল আহসান। ২ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি নিজেকে ‘সবার টার্গেট’ উল্লেখ করে সুবিচার চান।
জিয়াউলের দাবি, সেনাবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় প্রশিক্ষণের সময় কোমর ও ঘাড়ে ব্যথা পেয়েছিলেন তিনি। কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে আনার সময় হাতকড়া, হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ ভেস্ট পরানো হলে শারীরিক সমস্যা হয় বলে জানান তিনি। এ কারণে এসব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আবেদন করেন।
এ সময় প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ট্রাইব্যুনালকে জানান, নিরাপত্তাজনিত কারণেই তাকে এভাবে আনা হচ্ছে। জিয়াউল তখন বলেন, প্রিজনভ্যান থেকে ট্রাইব্যুনালের হাজতখানার দূরত্ব খুবই কম এবং সেখানে প্রায় ২০ জন পুলিশ সদস্য থাকেন। এ সময় বিচারক মন্তব্য করেন, দূরত্ব কম হলেও নিরাপত্তার ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
পরে হাতকড়া ও বুলেটপ্রুফ ভেস্ট থেকে অব্যাহতি চেয়ে লিখিত আবেদন করার পরামর্শ দেন ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চ।
আইনজীবীর অভিযোগ
জিয়াউল আহসানের আইনজীবী নাজনীন নাহার বলেন, হাতকড়া ও ভেস্ট থেকে অব্যাহতি চেয়ে তারা আবেদন করবেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশন যা চায়, অনেক ক্ষেত্রে সেটিই কার্যকর হচ্ছে।
তবে জিয়াউলকে কীভাবে ট্রাইব্যুনালে আনা হবে, সে বিষয়ে প্রসিকিউশনের সরাসরি সিদ্ধান্ত নেই বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। তার ভাষ্য, কোনো আসামিকে হাতকড়া পরানো হবে কি না, সেটি জেল কর্তৃপক্ষের বিষয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কীভাবে আসামিকে আদালতে নিয়ে আসবে, সেটিও তাদের দায়িত্ব।
কারা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
জিয়াউল আহসানকে নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ট্রাইব্যুনালে আনার বিষয়টি তার জানা নেই বলে জানিয়েছেন বিশেষ কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার তায়েফ উদ্দিন মিয়া।
তিনি বলেন, কারাগার থেকে আসামিকে আদালতে পাঠানোর জন্য পুলিশের কাছে এসকর্ট চাওয়া হয়। এরপর পুলিশ কীভাবে তাকে নিয়ে যাবে, সেটি পুলিশের বিষয়। তাদের কোনো বিশেষ উদ্বেগ বা কনসার্ন থাকতে পারে।
কারাগারে জিয়াউলের আচরণে কোনো পরিবর্তন দেখেননি বলেও জানান তিনি। তার ভাষ্য, কারাগারে আসার পর থেকে জিয়াউল যেমন ছিলেন, এখনও তেমনই আছেন এবং তার মধ্যে কোনো উগ্র আচরণ দেখা যায়নি।
সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ
শুধু জিয়াউল আহসানকে ঘিরে নয়, মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে।
সূত্রটির দাবি, ট্রাইব্যুনালে জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ার পর কয়েকজন সাক্ষীর বিষয়ে তার ঘনিষ্ঠজনরা খোঁজখবর রাখছেন। এমনকি সাক্ষীদের সন্তানরা কোথায় যাতায়াত করেন, স্কুল-কলেজে যান কি না—এসব তথ্য সংগ্রহের চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে।
গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে এ ধরনের তথ্য পাওয়ার পর সাক্ষীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, সাক্ষীদের জবানবন্দিতে জিয়াউল আহসানের কথিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত আরও একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নাম সামনে এসেছে। ওই ব্যক্তি যুক্তরাজ্যে অবস্থান করে জিয়াউলের সম্পত্তি দেখাশোনা করেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তিকে জিয়াউল আহসানের পরিবারের পক্ষ থেকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করেছেন ওই কর্মকর্তা। এসব অভিযোগের স্বাধীন কোনো প্রমাণ অবশ্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
চিফ প্রসিকিউটরের বক্তব্য
জিয়াউল আহসানকে সাম্প্রতিক সময়ে হাতকড়া, বুলেটপ্রুফ ভেস্ট ও হেলমেট পরিয়ে ট্রাইব্যুনালে আনা হচ্ছে কেন—এ বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তা আগের তুলনায় বাড়ানো হয়েছে।
তিনি জানান, প্রভাবশালী আসামিদের বিরুদ্ধে বিচারকাজ শেষ পর্যায়ে পৌঁছালে বা রায়ের অপেক্ষায় থাকলে ট্রাইব্যুনালে স্যাবোটাজের চেষ্টা হতে পারে—এমন গোপন তথ্য তাদের কাছে রয়েছে। এ কারণেই ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তায় নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের আরও সতর্ক ও কড়াকড়ি অবস্থানে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ফলে জিয়াউল আহসানকে ঘিরে একদিকে যেমন গুম-খুনের মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ পর্যায়ের দিকে এগোচ্ছে, অন্যদিকে তাকে ট্রাইব্যুনালে আনা-নেওয়ার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন করে আলোচনা। তবে অস্ত্র ছিনিয়ে পালানো বা স্যাবোটাজের পরিকল্পনার যে তথ্যের কথা সূত্রগুলো বলছে, সেটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: