বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ
দুই দশক পর ক্ষমতায়, সামনে কঠিন রাজনৈতিক পরীক্ষা
প্রায় দুই দশক পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি আজ মঙ্গলবার ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত দলটির এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, দীর্ঘদিন রাজপথের বিরোধী দল হিসেবে আন্দোলন-সংগ্রাম করার পর এখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে বিএনপি।
একই সঙ্গে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই দলটির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর বিএনপি সরকার গঠন করে। এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও প্রায় দুই দশকের অপেক্ষার পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফেরে বিএনপি।
ফলে এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী দলটির জন্য শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং রাজনৈতিক সাফল্যের পাশাপাশি নিজেদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সক্ষমতা যাচাইয়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। দীর্ঘদিন বিরোধী রাজনীতিতে থাকা দলটি এখন জনগণের প্রত্যাশা পূরণ, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের মতো কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি পাঁচ দিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। আজ সকাল ৬টায় নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারাদেশের দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শুরু হয়েছে। সকাল ৯টায় বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং প্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন।
আগামী ৫ সেপ্টেম্বর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ মিলনায়তনে ‘বিএনপি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য’ শীর্ষক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলা ও মহানগর ইউনিট নিজেদের সুবিধাজনক সময়ে আলোচনা সভাসহ নানা কর্মসূচি পালন করবে। বৃক্ষরোপণ ও মৎস্য অবমুক্তকরণের মতো সামাজিক কর্মসূচিও রয়েছে এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজনে।
দলটির নেতাদের ভাষ্য, বিএনপির ৪৮ বছরের রাজনৈতিক পথচলা সংগ্রাম, সংকট ও ত্যাগে পরিপূর্ণ। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে দলটি। শহীদ জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত বিএনপি পরবর্তী সময়ে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দীর্ঘ সময় রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে। আবার দীর্ঘ সময় বিরোধী দল হিসেবে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামও করেছে।
তবে ক্ষমতায় ফেরার পর বিএনপির রাজনৈতিক ভূমিকা ও দায়িত্বে এসেছে বড় পরিবর্তন। বিরোধী দলে থাকার সময় নির্বাচন, গণতান্ত্রিক অধিকার, রাজনৈতিক পরিবর্তন ও সরকারবিরোধী আন্দোলন ছিল দলটির প্রধান রাজনৈতিক এজেন্ডা। এখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থেকে জনগণের প্রত্যাশা পূরণই দলটির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করার ক্ষেত্রে সরকারের সাফল্য বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কারণ বিরোধী দলের রাজনীতি ও সরকার পরিচালনার রাজনীতি এক নয়। আন্দোলনের মাঠে কার্যকর কৌশলের পাশাপাশি সরকার পরিচালনায় প্রয়োজন প্রশাসনিক দক্ষতা, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনা এবং নীতি বাস্তবায়নের সক্ষমতা।
ক্ষমতায় ফেরার পর বিএনপির সামনে সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাসের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার পর কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দলের নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক কাঠামো নতুন বাস্তবতার সঙ্গে কতটা মানিয়ে নিতে পারে, সেটিও পর্যবেক্ষণের বিষয়। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে থাকা নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা এবং সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার মধ্যে ভারসাম্য রাখাও দলের জন্য বড় পরীক্ষা।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির জন্য এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলাদা রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। দীর্ঘদিনের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অধ্যায়ের পর এখন দল ও সরকারের নেতৃত্বে রয়েছেন তারেক রহমান। ফলে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বে বিএনপি কীভাবে নিজেদের রাজনৈতিক দর্শন, সাংগঠনিক সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি বাস্তবায়ন করে, সেদিকেই নজর রয়েছে রাজনৈতিক মহলের।
এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিতেও পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার ছাপ রয়েছে। রাজনৈতিক সমাবেশ ও মিছিলের পাশাপাশি আলোচনা সভা, বৃক্ষরোপণ, মৎস্য অবমুক্তকরণসহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচি রাখা হয়েছে। জেলা ও মহানগর পর্যায়েও আলোচনা সভা, র্যালি ও অন্যান্য কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী একই সঙ্গে দলটির আত্মমূল্যায়ন ও নতুন যাত্রার প্রতীক। ৪৮ বছরের ইতিহাসে দলটি যেমন রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকেছে, তেমনি দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থেকে কঠিন রাজনৈতিক আন্দোলন মোকাবিলা করেছে। এখন রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করাই হবে দলটির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা।
প্রায় দুই দশক পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে বিএনপির সামনে তাই একদিকে রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের সাফল্য, অন্যদিকে রয়েছে ক্ষমতার দায়িত্ব থেকে তৈরি হওয়া জনগণের প্রত্যাশা। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে সরকার পরিচালনায় দলটি কতটা সফল হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে আগামী দিনের রাজনীতিতে বিএনপির অবস্থান ও জনপ্রিয়তার ভবিষ্যৎ।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বলেন, প্রায় দুই দশক পর বিএনপি জনগণের ভোটে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী তাই দলের জন্য আনন্দের পাশাপাশি আত্মমূল্যায়নেরও সময়। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শ এবং প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি যে গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করেছে, সেই ধারাই এগিয়ে নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ এবং একটি গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই এখন বিএনপির প্রধান অঙ্গীকার।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: