infoamaderdin@gmail.com মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১৭ ভাদ্র ১৪৩৩

জমে থাকা পানিতে এডিসের বিস্তার, ঢাকার ঘনবসতিতে ডেঙ্গুর ভয়াবহ ঝুঁকি

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:০৯ পিএম

রাজধানীর নিম্নআয়ের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে জমে থাকা নোংরা পানি, আবর্জনা ও অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়ছে। বিভিন্ন গলি, গ্যারেজ, বাসাবাড়ির আশপাশ ও পরিত্যক্ত পাত্রে দীর্ঘদিন ধরে পানি জমে থাকলেও নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন কার্যক্রম না থাকায় এসব স্থান এডিস মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের।

রাজধানীর পূর্ব রামপুরার জামতলা এলাকায় সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, নিম্নআয়ের মানুষের ঘনবসতিপূর্ণ কয়েকটি এলাকায় পানি ও আবর্জনা জমে রয়েছে। বিশেষ করে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার গ্যারেজকেন্দ্রিক বসতিগুলোতে মশার উপদ্রব বেশি। দিনের বেলাতেও ঘরের ভেতরে মশার উৎপাত থাকছে বলে জানান বাসিন্দারা। সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

জামতলা মোড়ের কাছেই খোলা আকাশের নিচে অটোরিকশা ও মাইক্রোবাস পার্কিং এলাকার পাশে রয়েছে ঘনবসতিপূর্ণ কয়েকটি বাড়ি। এর মধ্যে একটি বাড়ির দুই পাশে প্রায়ই পানি জমে থাকতে দেখা যায়। দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় সেখানে এডিস মশার লার্ভা জন্মানোর অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।

জামতলা অগ্নিশিখা গলির শহীদ মিনারের সামনের চত্বরেও একই চিত্র দেখা গেছে। চারপাশ আবদ্ধ থাকায় সেখানে প্রায় এক ইঞ্চি পরিমাণ নোংরা পানি জমে থাকে। বৃষ্টির সময় পানির পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘদিনের জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা। ফলে পুরো এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়ানোর পাশাপাশি মশার প্রজননের ঝুঁকিও বাড়ছে।

এই এলাকার পাশেই রয়েছে দুটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার গ্যারেজ। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, রাতে এসব গ্যারেজে প্রায় ১০০ চালক অবস্থান করেন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, জমে থাকা পানি ও মশার উপদ্রবের মধ্যেই তাদের থাকতে হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, মশার যন্ত্রণায় রাতে ঠিকমতো ঘুমানো কঠিন হয়ে পড়েছে। মশা থেকে বাঁচতে অনেকেই নিয়মিত কয়েল, ধূপ কিংবা অন্য ধরনের ধোঁয়া ব্যবহার করছেন। তবে এতে মশার উপদ্রব পুরোপুরি কমছে না।

নীলফামারী থেকে ঢাকায় এসে অটোরিকশা চালান মোহাম্মদ গণিউল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এখানে মশার খুব অত্যাচার। এশার নামাজের পর থেকেই কয়েলের ধোঁয়া জ্বালিয়ে রাখতে হয়। রাতে ঠিকমতো ঘুমানো যায় না। আশপাশের জমে থাকা পচা পানি থেকেই মশা আসে। অথচ গত এক মাসে সিটি করপোরেশন থেকে একবারের জন্যও ওষুধ ছিটাতে দেখিনি।’

আরেক অটোরিকশাচালক আফজাল হোসেন জানান, চলতি মাসের শুরুতে তাদের গ্যারেজের দুজন চালক প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত হন। তিন দিন পর জ্বর কিছুটা কমলে তারা গ্রামে চলে যান। এরপর থেকে গ্যারেজের অন্য চালকেরা রাতে কয়েল ও মশারি ব্যবহার করে থাকছেন।

ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন নিম্নআয়ের মানুষ। এসব এলাকার বাসিন্দাদের বড় অংশ দিনমজুর, রিকশাচালক, অটোরিকশাচালক ও পরিবহন শ্রমিক। পরিবারের কোনো সদস্য ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে চিকিৎসা ব্যয়ের পাশাপাশি উপার্জন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। ফলে অনেকেই জ্বর হলেও শুরুতে হাসপাতালে না গিয়ে স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ওষুধ নিয়ে চিকিৎসা করার চেষ্টা করেন।

জামতলার একটি টিনশেড বাড়িতে প্রায় ২০টি পরিবারের সঙ্গে বসবাস করেন গৃহকর্মী বেদেনা বেগম। তিনি জানান, তার স্বামী অটোরিকশা চালান। কয়েক দিন আগে তার স্বামীর প্রচণ্ড জ্বর হলে প্রথমে স্থানীয় ফার্মেসি থেকে দুই দিন ওষুধ এনে খাওয়ানো হয়। পরে অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় মুগদা হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা ডেঙ্গু শনাক্ত করেন।

বেদেনা বেগম বলেন, ‘সেখানে পাঁচ দিন ভর্তি রাখতে প্রচুর টাকা খরচ হয়েছে। আর রোগীর পরিচর্যা করতে গিয়ে ১০ দিন আমিও কাজে যেতে পারিনি।’

স্থানীয় একটি ফার্মেসির বিক্রেতা জামান জানান, চিকিৎসকের পরামর্শপত্র ছাড়াই অনেকে জ্বরের ওষুধ কিনতে আসেন। তাদের সবাই ডেঙ্গু আক্রান্ত কি না তা নিশ্চিত নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে জ্বর নিয়ে ওষুধ কিনতে আসা মানুষের সংখ্যা বেড়েছে বলে জানান তিনি।

এলাকার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘এলাকার বেশ কয়েকটি স্থানে দীর্ঘদিন ধরে নোংরা পানি জমে আছে। এসব জায়গার কোনো ড্রেনেজ সংযোগও নেই। নিয়মিত পরিষ্কার না করায় এডিস মশার প্রজননের ঝুঁকি তৈরি হলেও কর্তৃপক্ষের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। নিয়মিত কর দিয়েও সিটি করপোরেশনের ন্যূনতম সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি আমরা।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২৭ আগস্ট পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে ৮৬৮ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। ওই সময়ে নতুন করে কারও মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ২৪৮ জনে। এ সময়ে মৃত্যু হয়েছে ৮৮ জনের। সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছেন ৩০ হাজার ৭৭ জন এবং বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২ হাজার ৮৩ জন।

জনস্বাস্থ্যবিদদের আশঙ্কা, বর্ষা ও বৃষ্টিপাতের কারণে সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে। রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। সেপ্টেম্বরে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আক্রান্ত বাড়লে আনুপাতিক হারে মৃত্যুও বাড়তে পারে এবং পরিস্থিতির ভয়াবহতা নভেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত স্থায়ী কোনো উদ্যোগ না দেখে মনে হচ্ছে পরিস্থিতি অনেকটা ঢিলেঢালাভাবে সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য কমিউনিটি পর্যায়ে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা চালু করা জরুরি।

ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘শুরুতেই রোগ শনাক্ত হলে নিম্নআয়ের মানুষ অন্তত কয়েক দিন বিশ্রামে থাকার সুযোগ পাবেন, যা বড় ধরনের শারীরিক জটিলতা প্রতিরোধে সহায়তা করবে।’

তিনি আরও বলেন, দেশের প্রান্তিক মানুষ অনেক সময় জ্বর নিয়েও পরিবারের খরচ চালাতে কাজ করে যান। তাদের হাতের কাছে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা নিশ্চিত করা গেলে দ্রুত রোগ শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এতে আক্রান্তদের সময়মতো চিকিৎসা ও বিশ্রামের সুযোগ তৈরি হবে এবং গুরুতর জটিলতা ও প্রাণহানির ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু হাসপাতালে চিকিৎসা নিশ্চিত করলেই হবে না; এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত মশক নিধন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোকে মশক নিধন কার্যক্রমের আওতায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আনা না হলে ডেঙ্গুর সংক্রমণ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


জমে থাকা পানিতে এডিসের বিস্তার, ঢাকার ঘনবসতিতে ডেঙ্গুর ভয়াবহ ঝুঁকি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:০৯ পিএম

রাজধানীর নিম্নআয়ের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে জমে থাকা নোংরা পানি, আবর্জনা ও অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়ছে। বিভিন্ন গলি, গ্যারেজ, বাসাবাড়ির আশপাশ ও পরিত্যক্ত পাত্রে দীর্ঘদিন ধরে পানি জমে থাকলেও নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন কার্যক্রম না থাকায় এসব স্থান এডিস মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের।

রাজধানীর পূর্ব রামপুরার জামতলা এলাকায় সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, নিম্নআয়ের মানুষের ঘনবসতিপূর্ণ কয়েকটি এলাকায় পানি ও আবর্জনা জমে রয়েছে। বিশেষ করে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার গ্যারেজকেন্দ্রিক বসতিগুলোতে মশার উপদ্রব বেশি। দিনের বেলাতেও ঘরের ভেতরে মশার উৎপাত থাকছে বলে জানান বাসিন্দারা। সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

জামতলা মোড়ের কাছেই খোলা আকাশের নিচে অটোরিকশা ও মাইক্রোবাস পার্কিং এলাকার পাশে রয়েছে ঘনবসতিপূর্ণ কয়েকটি বাড়ি। এর মধ্যে একটি বাড়ির দুই পাশে প্রায়ই পানি জমে থাকতে দেখা যায়। দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় সেখানে এডিস মশার লার্ভা জন্মানোর অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।

জামতলা অগ্নিশিখা গলির শহীদ মিনারের সামনের চত্বরেও একই চিত্র দেখা গেছে। চারপাশ আবদ্ধ থাকায় সেখানে প্রায় এক ইঞ্চি পরিমাণ নোংরা পানি জমে থাকে। বৃষ্টির সময় পানির পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘদিনের জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা। ফলে পুরো এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়ানোর পাশাপাশি মশার প্রজননের ঝুঁকিও বাড়ছে।

এই এলাকার পাশেই রয়েছে দুটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার গ্যারেজ। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, রাতে এসব গ্যারেজে প্রায় ১০০ চালক অবস্থান করেন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, জমে থাকা পানি ও মশার উপদ্রবের মধ্যেই তাদের থাকতে হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, মশার যন্ত্রণায় রাতে ঠিকমতো ঘুমানো কঠিন হয়ে পড়েছে। মশা থেকে বাঁচতে অনেকেই নিয়মিত কয়েল, ধূপ কিংবা অন্য ধরনের ধোঁয়া ব্যবহার করছেন। তবে এতে মশার উপদ্রব পুরোপুরি কমছে না।

নীলফামারী থেকে ঢাকায় এসে অটোরিকশা চালান মোহাম্মদ গণিউল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এখানে মশার খুব অত্যাচার। এশার নামাজের পর থেকেই কয়েলের ধোঁয়া জ্বালিয়ে রাখতে হয়। রাতে ঠিকমতো ঘুমানো যায় না। আশপাশের জমে থাকা পচা পানি থেকেই মশা আসে। অথচ গত এক মাসে সিটি করপোরেশন থেকে একবারের জন্যও ওষুধ ছিটাতে দেখিনি।’

আরেক অটোরিকশাচালক আফজাল হোসেন জানান, চলতি মাসের শুরুতে তাদের গ্যারেজের দুজন চালক প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত হন। তিন দিন পর জ্বর কিছুটা কমলে তারা গ্রামে চলে যান। এরপর থেকে গ্যারেজের অন্য চালকেরা রাতে কয়েল ও মশারি ব্যবহার করে থাকছেন।

ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন নিম্নআয়ের মানুষ। এসব এলাকার বাসিন্দাদের বড় অংশ দিনমজুর, রিকশাচালক, অটোরিকশাচালক ও পরিবহন শ্রমিক। পরিবারের কোনো সদস্য ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে চিকিৎসা ব্যয়ের পাশাপাশি উপার্জন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। ফলে অনেকেই জ্বর হলেও শুরুতে হাসপাতালে না গিয়ে স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ওষুধ নিয়ে চিকিৎসা করার চেষ্টা করেন।

জামতলার একটি টিনশেড বাড়িতে প্রায় ২০টি পরিবারের সঙ্গে বসবাস করেন গৃহকর্মী বেদেনা বেগম। তিনি জানান, তার স্বামী অটোরিকশা চালান। কয়েক দিন আগে তার স্বামীর প্রচণ্ড জ্বর হলে প্রথমে স্থানীয় ফার্মেসি থেকে দুই দিন ওষুধ এনে খাওয়ানো হয়। পরে অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় মুগদা হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা ডেঙ্গু শনাক্ত করেন।

বেদেনা বেগম বলেন, ‘সেখানে পাঁচ দিন ভর্তি রাখতে প্রচুর টাকা খরচ হয়েছে। আর রোগীর পরিচর্যা করতে গিয়ে ১০ দিন আমিও কাজে যেতে পারিনি।’

স্থানীয় একটি ফার্মেসির বিক্রেতা জামান জানান, চিকিৎসকের পরামর্শপত্র ছাড়াই অনেকে জ্বরের ওষুধ কিনতে আসেন। তাদের সবাই ডেঙ্গু আক্রান্ত কি না তা নিশ্চিত নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে জ্বর নিয়ে ওষুধ কিনতে আসা মানুষের সংখ্যা বেড়েছে বলে জানান তিনি।

এলাকার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘এলাকার বেশ কয়েকটি স্থানে দীর্ঘদিন ধরে নোংরা পানি জমে আছে। এসব জায়গার কোনো ড্রেনেজ সংযোগও নেই। নিয়মিত পরিষ্কার না করায় এডিস মশার প্রজননের ঝুঁকি তৈরি হলেও কর্তৃপক্ষের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। নিয়মিত কর দিয়েও সিটি করপোরেশনের ন্যূনতম সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি আমরা।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২৭ আগস্ট পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে ৮৬৮ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। ওই সময়ে নতুন করে কারও মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ২৪৮ জনে। এ সময়ে মৃত্যু হয়েছে ৮৮ জনের। সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছেন ৩০ হাজার ৭৭ জন এবং বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২ হাজার ৮৩ জন।

জনস্বাস্থ্যবিদদের আশঙ্কা, বর্ষা ও বৃষ্টিপাতের কারণে সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে। রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। সেপ্টেম্বরে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আক্রান্ত বাড়লে আনুপাতিক হারে মৃত্যুও বাড়তে পারে এবং পরিস্থিতির ভয়াবহতা নভেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত স্থায়ী কোনো উদ্যোগ না দেখে মনে হচ্ছে পরিস্থিতি অনেকটা ঢিলেঢালাভাবে সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য কমিউনিটি পর্যায়ে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা চালু করা জরুরি।

ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘শুরুতেই রোগ শনাক্ত হলে নিম্নআয়ের মানুষ অন্তত কয়েক দিন বিশ্রামে থাকার সুযোগ পাবেন, যা বড় ধরনের শারীরিক জটিলতা প্রতিরোধে সহায়তা করবে।’

তিনি আরও বলেন, দেশের প্রান্তিক মানুষ অনেক সময় জ্বর নিয়েও পরিবারের খরচ চালাতে কাজ করে যান। তাদের হাতের কাছে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা নিশ্চিত করা গেলে দ্রুত রোগ শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এতে আক্রান্তদের সময়মতো চিকিৎসা ও বিশ্রামের সুযোগ তৈরি হবে এবং গুরুতর জটিলতা ও প্রাণহানির ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু হাসপাতালে চিকিৎসা নিশ্চিত করলেই হবে না; এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত মশক নিধন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোকে মশক নিধন কার্যক্রমের আওতায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আনা না হলে ডেঙ্গুর সংক্রমণ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর