infoamaderdin@gmail.com শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬
২৬ আষাঢ় ১৪৩৩

টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি

ইকবাল হোসাইন প্রকাশিত: ১০ জুলাই ২০২৬ ১২:০৭ পিএম

টানা চার দিনের অতি ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল এবং উজান থেকে নেমে আসা পানির চাপে কক্সবাজার জেলার বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটেছে। জেলার নদ-নদী, খাল-বিল ও জলাশয় উপচে পড়ায় বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। কোথাও কোথাও হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে সৃষ্টি হয়েছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় ইতোমধ্যে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। জেলার লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন এবং গবাদিপশু নিয়ে নিরাপদ আশ

জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কক্সবাজার সদর, রামু, ঈদগাঁও, উখিয়া, টেকনাফ, চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। অনেক গ্রামের সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার ও সরকারি-বেসরকারি অফিসে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর সুত্রে জানা যায়, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট মৌসুমি সক্রিয়তা এবং ভারী বর্ষণের কারণে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে। সেই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি ঢল দ্রুত নেমে আসায় জেলার প্রধান নদী—বাকখালী, মাতামুহুরী, রেজুখালসহ বিভিন্ন খাল-বিলের পানি ধারণক্ষমতা অতিক্রম করেছে। নদীর পানি দ্রুত সাগরে নামতে না পারায় নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক খাল দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশনের পথ সংকুচিত হয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং জলাধার ভরাটের কারণেও বিভিন্ন এলাকায় পানি দীর্ঘসময় ধরে আটকে থাকছে।

বুধবার মিঠাছড়ি ও লিংরোড এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নতুন নির্মিত রেললাইনের দুই পাশজুড়ে বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে নিমজ্জিত। দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে পানি জমে থাকলে রেললাইনের নিচের মাটি নরম হয়ে অবকাঠামোগত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে স্থানীয়দের আশঙ্কা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা। অন্যদিকে, বাকখালী নদীও কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীর পানি আরও বাড়লে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পানিবন্দি পরিবারগুলো ঘর থেকে বের হতে পারছে না। অনেক বাড়িতে রান্নার চুলা পানিতে ডুবে যাওয়ায় খাবার রান্না বন্ধ রয়েছে। বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। নলকূপ পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় নিরাপদ খাবার পানির জন্য দূর-দূরান্তে যেতে হচ্ছে। শিশু, নারী ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি কষ্টে রয়েছেন।

অনেক পরিবার ঘরের আসবাবপত্র, ধান-চাল ও প্রয়োজনীয় মালামাল উঁচু স্থানে সরিয়ে রাখলেও পানির কারণে সেগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নিম্নআয়ের মানুষ কাজে যেতে না পারায় তাদের আয়-রোজগারও বন্ধ হয়ে গেছে।

বন্যার পানিতে গোয়ালঘর তলিয়ে যাওয়ায় গরু, মহিষ, ছাগল ও হাঁস-মুরগি নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। অনেকেই গবাদিপশু নিয়ে সড়ক, স্কুল কিংবা উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন। পশুখাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ সময় পানিতে থাকার কারণে গবাদিপশুর বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় কৃষকদের আশঙ্কা, পানি দ্রুত না কমলে আমন ধানের বীজতলা, সবজি ক্ষেত, মাছের ঘের ও চিংড়ি প্রকল্পের ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে।

জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান বলেন,"আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী কয়েক দিন ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। যেকোনো ধরনের প্রাণহানি এড়াতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার অনুরোধ জানানো হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।" জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, জেলার ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে ০১৮৭২-৬১৫১৩২ নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

টানা বর্ষণের কারণে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে যাওয়ায় উখিয়া, টেকনাফ, রামু, ঈদগাঁও ও কক্সবাজার সদর উপজেলার পাহাড়ঘেঁষা বসতিগুলোতে পাহাড়ধসের আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। প্রশাসন এসব এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে মাইকিং ও গণসচেতনতামূলক প্রচারণা চালাচ্ছে। এদিকে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ধসের ঘটনায় ২২ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতারই ইঙ্গিত বহন করছে।

সিভিল সোসাইটির আবু মোর্শেদ জানান, কক্সবাজারে বন্যা ও জলাবদ্ধতা কমাতে শুধু তাৎক্ষণিক ত্রাণ কার্যক্রম নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও জরুরি। নদী ও খালের নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ, পাহাড় কাটা বন্ধ এবং জলাধার সংরক্ষণ ছাড়া এ ধরনের দুর্যোগের পুনরাবৃত্তি রোধ করা কঠিন হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগই জানমাল রক্ষায় সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি

ইকবাল হোসাইন

প্রকাশিত: ১০ জুলাই ২০২৬ ১২:০৭ পিএম

টানা চার দিনের অতি ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল এবং উজান থেকে নেমে আসা পানির চাপে কক্সবাজার জেলার বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটেছে। জেলার নদ-নদী, খাল-বিল ও জলাশয় উপচে পড়ায় বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। কোথাও কোথাও হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে সৃষ্টি হয়েছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় ইতোমধ্যে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। জেলার লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন এবং গবাদিপশু নিয়ে নিরাপদ আশ

জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কক্সবাজার সদর, রামু, ঈদগাঁও, উখিয়া, টেকনাফ, চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। অনেক গ্রামের সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার ও সরকারি-বেসরকারি অফিসে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর সুত্রে জানা যায়, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট মৌসুমি সক্রিয়তা এবং ভারী বর্ষণের কারণে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে। সেই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি ঢল দ্রুত নেমে আসায় জেলার প্রধান নদী—বাকখালী, মাতামুহুরী, রেজুখালসহ বিভিন্ন খাল-বিলের পানি ধারণক্ষমতা অতিক্রম করেছে। নদীর পানি দ্রুত সাগরে নামতে না পারায় নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক খাল দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশনের পথ সংকুচিত হয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং জলাধার ভরাটের কারণেও বিভিন্ন এলাকায় পানি দীর্ঘসময় ধরে আটকে থাকছে।

বুধবার মিঠাছড়ি ও লিংরোড এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নতুন নির্মিত রেললাইনের দুই পাশজুড়ে বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে নিমজ্জিত। দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে পানি জমে থাকলে রেললাইনের নিচের মাটি নরম হয়ে অবকাঠামোগত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে স্থানীয়দের আশঙ্কা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা। অন্যদিকে, বাকখালী নদীও কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীর পানি আরও বাড়লে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পানিবন্দি পরিবারগুলো ঘর থেকে বের হতে পারছে না। অনেক বাড়িতে রান্নার চুলা পানিতে ডুবে যাওয়ায় খাবার রান্না বন্ধ রয়েছে। বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। নলকূপ পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় নিরাপদ খাবার পানির জন্য দূর-দূরান্তে যেতে হচ্ছে। শিশু, নারী ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি কষ্টে রয়েছেন।

অনেক পরিবার ঘরের আসবাবপত্র, ধান-চাল ও প্রয়োজনীয় মালামাল উঁচু স্থানে সরিয়ে রাখলেও পানির কারণে সেগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নিম্নআয়ের মানুষ কাজে যেতে না পারায় তাদের আয়-রোজগারও বন্ধ হয়ে গেছে।

বন্যার পানিতে গোয়ালঘর তলিয়ে যাওয়ায় গরু, মহিষ, ছাগল ও হাঁস-মুরগি নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। অনেকেই গবাদিপশু নিয়ে সড়ক, স্কুল কিংবা উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন। পশুখাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ সময় পানিতে থাকার কারণে গবাদিপশুর বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় কৃষকদের আশঙ্কা, পানি দ্রুত না কমলে আমন ধানের বীজতলা, সবজি ক্ষেত, মাছের ঘের ও চিংড়ি প্রকল্পের ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে।

জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান বলেন,"আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী কয়েক দিন ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। যেকোনো ধরনের প্রাণহানি এড়াতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার অনুরোধ জানানো হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।" জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, জেলার ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে ০১৮৭২-৬১৫১৩২ নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

টানা বর্ষণের কারণে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে যাওয়ায় উখিয়া, টেকনাফ, রামু, ঈদগাঁও ও কক্সবাজার সদর উপজেলার পাহাড়ঘেঁষা বসতিগুলোতে পাহাড়ধসের আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। প্রশাসন এসব এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে মাইকিং ও গণসচেতনতামূলক প্রচারণা চালাচ্ছে। এদিকে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ধসের ঘটনায় ২২ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতারই ইঙ্গিত বহন করছে।

সিভিল সোসাইটির আবু মোর্শেদ জানান, কক্সবাজারে বন্যা ও জলাবদ্ধতা কমাতে শুধু তাৎক্ষণিক ত্রাণ কার্যক্রম নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও জরুরি। নদী ও খালের নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ, পাহাড় কাটা বন্ধ এবং জলাধার সংরক্ষণ ছাড়া এ ধরনের দুর্যোগের পুনরাবৃত্তি রোধ করা কঠিন হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগই জানমাল রক্ষায় সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর