মতামত
জনকল্যাণই হোক রাজনীতির ধ্রুবতারা
রাষ্ট্রের প্রাণশক্তি হলো তার রাজনীতি। একটি রাষ্ট্র কতটা জনবান্ধব বা কল্যাণকামী হবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে সেই দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির গতিপ্রকৃতির ওপর। ‘রাজনীতি’ শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত ও দার্শনিক অর্থের গভীরে গেলে আমরা দেখি, এর মূল ভিত্তিই হলো নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা, মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং সামগ্রিক মঙ্গলের পথ প্রশস্ত করা।
কিন্তু সভ্যতার অগ্রযাত্রার সমান্তরালে আমরা কি আমাদের রাজনীতির সেই আদি ও অকৃত্রিম দর্শন ধরে রাখতে পেরেছি? আজ যখন রাজনীতি কেবল ক্ষমতার পালাবদল কিংবা সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস দীর্ঘতর হয়। আজকের বাস্তবতায় আমাদের সবচেয়ে বড় জাতীয় প্রত্যাশা—রাজনীতি হোক একচেটিয়াভাবে মানুষের কল্যাণের জন্য।
ইতিহাসের দর্পণ ও রাজনীতির বিবর্তন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রের দিকে তাকালে আমরা এক গৌরবোজ্জ্বল অথচ কণ্টকাকীর্ণ পথ দেখতে পাই। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি অধ্যায় ছিল এ দেশের মানুষের অধিকার আদায়ের এক অদম্য লড়াই। সেই সময়ের রাজনীতি ছিল ত্যাগের, দেশপ্রেমের এবং জনমানুষের মুক্তির। কিন্তু স্বাধীনতার পর আমাদের রাজনৈতিক যাত্রাপথ মসৃণ থাকেনি। পঁচাত্তরের বিয়োগান্তক অধ্যায়ের পর দেশ দীর্ঘ সময় গণতান্ত্রিক ধারা থেকে বিচ্যুত ছিল। আশির দশকে সামরিক স্বৈরাচারের কবলে পড়ে রুদ্ধ হয়েছিল মানুষের কণ্ঠস্বর। সেই অন্ধকার সময়েও এ দেশের ছাত্র-জনতা রাজপথে রক্ত দিয়ে গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করেছিল।
১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারের পতন ঘটলেও আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থার অভাব ঘোচেনি। ফলে নব্বইয়ের দশক থেকে পরবর্তী সময়গুলোতে আমরা দেখেছি এক অসহিষ্ণু রাজনৈতিক সংস্কৃতি। ১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বারবার হরতাল, অবরোধ, ভাঙচুর ও রাজপথের সহিংসতা জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। ২০০৭ সালের ১/১১-এর সেই রাজনৈতিক অনড় অবস্থান এবং চরম সংঘাতময় পরিস্থিতি দেশকে এক অনাকাঙ্ক্ষিত জরুরি অবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছিল, যা দীর্ঘমেয়াদে আমাদের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দুর্বল করেছে। পরবর্তী দশকগুলোতেও নির্বাচন ও ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের জানমালের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা আধুনিক কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কল্পনা করাও কঠিন। যখনই রাজনীতি জনস্বার্থকে পাশ কাটিয়ে কেবল ক্ষমতার দ্বন্দ্বে রূপ নিয়েছে, তখনই সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অথচ রাজনীতি হওয়ার কথা ছিল তাদের শেষ আশ্রয়স্থল।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: যেখানে রাজনীতি মানুষের জন্য
বিশ্বের দিকে তাকালে আমরা এমন অনেক দেশ দেখি, যারা দীর্ঘদিনের অস্থিরতা বা এমনকি গৃহযুদ্ধ কাটিয়েও এমন এক রাজনৈতিক কাঠামো দাঁড় করিয়েছে যেখানে ‘জনস্বার্থই’ শেষ কথা। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর (নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক) দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আদর্শিক ভিন্নতা থাকলেও শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তার মতো মৌলিক বিষয়ে কোনো আপস নেই। সেখানে রাজনীতি মানেই হলো জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা। ক্ষমতার রদবদল হলেও মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ছন্দ পতন ঘটে না।
আবার রুয়ান্ডার উদাহরণ আমাদের জন্য বড় এক শিক্ষা হতে পারে। নব্বইয়ের দশকে ইতিহাসের ভয়াবহতম জাতিগত সংঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিরতা প্রত্যক্ষ করা রুয়ান্ডা আজ বদলে গেছে। তারা বিভাজনের রাজনীতি পরিহার করে অর্থনৈতিক ও মানবিক উন্নয়নকেন্দ্রিক রাজনীতি বেছে নিয়েছে। আজ রুয়ান্ডা আফ্রিকার অন্যতম স্থিতিশীল এবং দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ। একইভাবে যুক্তরাজ্য বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে তীব্র মতপার্থক্য থাকলেও, তা কখনো রাজপথের সহিংসতায় রূপ নেয় না। সেখানে নির্বাচন বা ক্ষমতার হাতবদল হয় নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে, সাধারণ মানুষের রক্ত ঝরিয়ে নয়। এই যে রাজনৈতিক পরিপক্বতা, এটিই আজ বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
সংঘাতের সংস্কৃতি ও জনজীবনের ক্ষত
আমাদের দেশে রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে অগ্নিসংযোগ, সাধারণ মানুষের জীবিকায় আঘাত এবং জানমালের ক্ষতি সাধারণ নাগরিকের মনে রাজনীতি নিয়ে এক ধরনের অনীহা ও ভীতি তৈরি করেছে। একজন দিনমজুর বা রিকশাচালক, যার প্রতিদিনের আয়ের ওপর তার পরিবারের অন্ন সংস্থান নির্ভর করে, রাজনৈতিক অস্থিরতা তার কাছে সাক্ষাৎ অভিশাপ। একজন শিক্ষার্থী, যার শিক্ষা জীবন অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে, তার কাছে রাজনীতির সংজ্ঞাটি নেতিবাচক হয়ে দাঁড়ায়। যখন রাজনীতির নামে মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়, তখন সেই রাজনীতি তার নৈতিক ভিত্তি হারায়। আমরা এমন এক রাজনীতি দেখতে চাই না, যা মানুষকে শঙ্কার মধ্যে রাখে; বরং আমরা এমন রাজনীতি চাই, যা প্রতিটি নাগরিককে তার নিজের দেশে নিরাপদ বোধ করতে শেখাবে।
উত্তরণের পথ: সংস্কার ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি
বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে এবং একটি সুস্থ, সুন্দর ও জনমুখী রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হলে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তর থেকে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ‘ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা’—এই সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ ঘটাতে হবে। রাজনীতিতে মতভেদ থাকবেই, কিন্তু সেই মত প্রকাশের ভাষা হতে হবে গণতান্ত্রিক ও মার্জিত। রাজপথের পেশিশক্তির চেয়ে টেবিলের সংলাপ যে অনেক বেশি কার্যকর, এই সত্যটি রাজনৈতিক নেতৃত্বকে অনুধাবন করতে হবে। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে—যেমন অর্থনীতি, বৈদেশিক নীতি এবং শিক্ষা—ন্যূনতম একটি জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা আজ সময়ের দাবি।
দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী ও স্বাধীন করা অপরিহার্য। নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো যদি নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে, তবে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষে ক্ষমতার অপব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়বে। প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হলে জনমনে আস্থা ফিরবে এবং রাজনীতিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে।
তৃতীয়ত, রাজনৈতিক কর্মসূচির ধরনে পরিবর্তন আনতে হবে। ডিজিটাল যুগে এসে সনাতনী হরতাল বা অবরোধের মতো কর্মসূচি, যা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ায়, তা কতটা প্রাসঙ্গিক সেটি ভেবে দেখার সময় এসেছে। জনগণের সমর্থন আদায়ের পথ হওয়া উচিত সেবা এবং কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড, জনদুর্ভোগ সৃষ্টি নয়।
চতুর্থত, রাজনীতিতে মেধা, সততা এবং তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণের পথ সুগম করতে হবে। ছাত্র রাজনীতি থেকে শুরু করে জাতীয় রাজনীতি পর্যন্ত সর্বত্র যদি মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করা যায়, তবে পেশিশক্তি ও কালো টাকার প্রভাব কমে আসবে। সুস্থ ধারার তরুণরা যখন রাজনীতিতে আসবে, তখন তারা সংকীর্ণ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জনকল্যাণের নীতিতে উদ্বুদ্ধ হবে।
প্রত্যাশা ও বাস্তবতা
রাজনীতি কোনো পেশা নয়, এটি একটি মহান ব্রত। গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল বলেছিলেন, মানুষ স্বভাবতই রাজনৈতিক জীব। তার এই কথার অর্থ হলো, মানুষের সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনের উন্নতি রাষ্ট্রের রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যে রাজনীতি সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারে না, যে রাজনীতি মানুষের মনে নিরাপত্তার চেয়ে ভীতি তৈরি করে, তা কখনো টেকসই হতে পারে না।
বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই উন্নয়নের সুফল ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হলে একটি স্থিতিশীল এবং জনমুখী রাজনৈতিক পরিবেশের বিকল্প নেই। আসন্ন দিনগুলোতে এ দেশের রাজনীতি সমস্ত সংকীর্ণতা, পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি এবং হিংসাত্মক পথ পরিহার করে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে—এটাই সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের ঐকান্তিক প্রত্যাশা। দল-মত নির্বিশেষে সবার একটাই মূলমন্ত্র হওয়া উচিত—রাজনীতি হোক শুধু মানুষের জন্য। মানুষের ভোট আর ভাতের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি তাদের মানবিক মর্যাদাকে সমুন্নত রাখাই হোক রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য।
আবু ছালেহ আতিফ: নিজস্ব প্রতিবেদক, দৈনিক কালের কণ্ঠ।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: