হাসপাতালে রোগীর চাপ, ক্ষুব্ধ নগরবাসী
গাজীপুরে মশক নিধনে ১০ কোটি টাকা ব্যয়, তবুও ডেঙ্গুর থাবা
গাজীপুরে মশক নিধনে ১০ কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ থাকলেও ডেঙ্গু পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি। বরং প্রতিদিনই বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা, হাসপাতালগুলোতে তৈরি হয়েছে বেড সংকট এবং মশক নিধন কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সাধারণ মানুষ। নগরবাসীর অভিযোগ, ফগিং ও প্রচারণা ছাড়া কার্যকর কোনো উদ্যোগ না থাকায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
গাজীপুর সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মহানগরীর টঙ্গী এলাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। এছাড়া কড্ডা, কোনাবাড়ী, গাজীপুর সদর ও শ্রীপুরেও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। গত শনিবার পর্যন্ত জেলার সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ৫২২ জন ডেঙ্গুর লক্ষণ নিয়ে পরীক্ষা করান। এর মধ্যে ৮৪ জনের শরীরে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে।
অন্যদিকে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। হাসপাতাল সূত্র জানায়, চলতি বছরে সেখানে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ৯৩৯ জন। উন্নত চিকিৎসার জন্য ৮২ জনকে অন্যত্র পাঠানো হয়েছে এবং একজন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে চিকিৎসাধীন আছেন ১২৭ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি হয়েছেন ৩৫ জন।
হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর জন্য নির্ধারিত বেডের সংখ্যা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। মেডিসিন বিভাগে ৪৮টি এবং শিশু বিভাগে মাত্র ৮টি বেড রয়েছে। ফলে অনেক রোগীকেই ওয়ার্ডের মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, প্রভাব বা অর্থের বিনিময়ে বেড পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এডিস মশার বিস্তার রোধ করা। কিন্তু বাস্তবে অনেক রোগীকেই মশারি ছাড়া হাসপাতালে থাকতে দেখা যাচ্ছে, যা সংক্রমণ আরও বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করছে।
এদিকে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের চলতি অর্থবছরের বাজেটে মশক নিধনের জন্য ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। সিটি কর্তৃপক্ষের দাবি, নালা-নর্দমা পরিষ্কার, কীটনাশক ছিটানো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। তবে নগরবাসীর অভিযোগ, এসব কার্যক্রম কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। অনেক এলাকায় নিয়মিত ফগিং হয় না এবং ড্রেন, জলাবদ্ধতা ও ময়লার স্তূপ পরিষ্কারে দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই।
নাওজোড় এলাকার বাসিন্দা খোরশেদ বলেন, এ বছর তাদের এলাকায় মশা নিধনের কোনো ওষুধ ছিটানো হয়নি। ফলে মশার উপদ্রব বেড়ে ডেঙ্গুর ঝুঁকিও বৃদ্ধি পেয়েছে।
ডেঙ্গু আক্রান্ত গৃহবধূ নাসিমা বেগম জানান, তাদের এলাকায় সিটি করপোরেশনের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। এ কারণে পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়েও তিনি উদ্বিগ্ন।
শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. শেখ কামরুল করিম বলেন, বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু রোগী বাড়া স্বাভাবিক। তবে এ বছর আগস্ট মাসে সংক্রমণ বেশি দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই; স্যালাইন, প্যারাসিটামল ও উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসাই মূল ভরসা। তাই প্রতিরোধই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সুদীপ বসাক জানান, মশক নিধনে বিভিন্ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে নগরবাসীর প্রশ্ন—১০ কোটি টাকা ব্যয়ের পরও যদি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তেই থাকে, তাহলে এই ব্যয়ের সুফল কোথায়?
অন্যদিকে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শওকত হোসেন সরকার দাবি করেছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রাখতে তারা কাজ করছেন এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ফগিং নয়, জলাবদ্ধতা দূর করা, ড্রেন পরিষ্কার রাখা, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তা না হলে ডেঙ্গুর বিস্তার আরও বাড়তে পারে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: