infoamaderdin@gmail.com মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬
১০ ভাদ্র ১৪৩৩

তুরস্ককে হঠাৎ ‘শত্রু’ বানাচ্ছে নেতানিয়াহু, নির্বাচনের আগে নতুন যুদ্ধের ছক?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: ২৫ আগষ্ট ২০২৬ ১৭:০৮ পিএম

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক প্রচারে হঠাৎ করেই বড় হুমকি হিসেবে সামনে এসেছে তুরস্ক। তেল আবিবের ব্যস্ত সড়কের পাশে টানানো বিশাল এক বিলবোর্ডে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানকে ইসরায়েলের শত্রু হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

একই বিলবোর্ডে ইরান ও হিজবুল্লাহর নেতাদের পাশাপাশি নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিকেও দেখানো হয়েছে। সেখানে লেখা হয়েছে, ‘তারা নেতানিয়াহুকে হারাতে চায়। তাদের জিততে দেবেন না।’

এর কয়েক দিন পরই উত্তর সিরিয়ায় তুরস্কের সম্ভাব্য সামরিক উপস্থিতির অভিযোগ তুলে বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। ইসরায়েলের দাবি, সিরিয়ার আবু আল-দাহার বিমান ঘাঁটিতে তুরস্ক সেনা, ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। নেতানিয়াহুর কার্যালয় এটিকে ইসরায়েলের জন্য বড় ধরনের হুমকি হিসেবে দেখছে বলে জানিয়েছে।

তবে হামলার সময় নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে। ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনের আর দুই মাসের কিছুটা বেশি সময় বাকি। এমন সময়ে তুরস্ককে বড় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে তুলে ধরে সামরিক অভিযান চালানোয় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

নেতানিয়াহুর ‘নিরাপত্তা কার্ড’

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নেতানিয়াহু নিজেকে ইসরায়েলের নিরাপত্তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য রক্ষাকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করে আসছেন। দেশের জন্য যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় তিনিই সবচেয়ে সক্ষম—এমন বার্তাই তার রাজনৈতিক প্রচারের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।

এবারও সেই নিরাপত্তা ইস্যুকেই সামনে আনা হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ইরান, হামাস ও হিজবুল্লাহর পর তুরস্ককে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে সামনে এনে নেতানিয়াহু নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন নিরাপত্তা ইস্যু তৈরি করছেন কি না, সেটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।

তুরস্কে মার্কিন রাষ্ট্রদূত টম ব্যারাক ইসরায়েলের এই হামলার সমালোচনা করে এটিকে ‘অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি এমন সম্ভাবনাও তুলে ধরেছেন যে ইসরায়েল হয়তো তুরস্ককে ইচ্ছাকৃতভাবে উসকানি দিচ্ছে। তার মতে, নির্বাচনের আগে এ ধরনের উত্তেজনা নেতানিয়াহুর জন্য রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে।

তবে ইসরায়েল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

ইসরায়েলের দাবি, তুরস্ক সিরিয়ায় সামরিক ঘাঁটি গড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। নেতানিয়াহু ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজের দাবি, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ইসরায়েলি সামরিক সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, ওই বিমান ঘাঁটিতে তুরস্কের সেনা, ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েনের পরিকল্পনা ছিল। ইসরায়েলের আশঙ্কা, তুরস্কের এমন উপস্থিতি সিরিয়ার আকাশসীমায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে এবং আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্য বদলে দিতে পারে।

সিরিয়া নিয়ে ইসরায়েল-তুরস্কের নতুন সংঘাত

ইসরায়েল ও তুরস্কের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিরোধ থাকলেও সিরিয়ায় দুই দেশের স্বার্থের সংঘাত নতুন মাত্রা পেতে পারে। সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি বাড়লে সেটি ইসরায়েলের জন্য কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এরই মধ্যে ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতায় ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের প্রধান রোমান গফম্যান জর্ডানে সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সাম্প্রতিক উত্তেজনা কমানোই বৈঠকের লক্ষ্য ছিল বলে জানিয়েছে সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সানা।

তুরস্ক অবশ্য ইসরায়েলের ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছে। আঙ্কারা নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অহেতুক উত্তেজনা তৈরির অভিযোগ তুলেছে এবং সিরিয়ার শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে।

এরদোয়ান-নেতানিয়াহু বিরোধ আরও তীব্র

নেতানিয়াহু ও এরদোয়ানের মধ্যে প্রকাশ্য বিরোধ নতুন নয়। গাজা যুদ্ধ, লেবানন ও ইরান ইস্যুতে দুই নেতার অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত।

এরদোয়ান নেতানিয়াহুকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে আখ্যা দিয়ে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের তীব্র সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে নেতানিয়াহু এরদোয়ানের বিরুদ্ধে হামাসকে সমর্থনের অভিযোগ করে আসছেন।

সম্প্রতি তুরস্ককে যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান দেওয়ারও বিরোধিতা করেছেন নেতানিয়াহু। তিনি এরদোয়ানের ‘আগ্রাসী উচ্চাকাঙ্ক্ষা’ নিয়ে সতর্ক করেছেন।

শুক্রবার নেতানিয়াহুর কার্যালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এরদোয়ানকে ‘ইহুদিবিদ্বেষী স্বৈরশাসক’ হিসেবে উল্লেখ করে তার বিরুদ্ধে নিজ দেশের জনগণের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ তোলে।

নিরাপত্তা নাকি নির্বাচনী কৌশল?

ইসরায়েলের নিরাপত্তা বিশ্লেষক আমোস হ্যারেলের মতে, তুরস্কের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি হামলার পেছনে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক—দুই ধরনের কারণই থাকতে পারে। তার মতে, এরদোয়ানের ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান সত্যিই উদ্বেগের কারণ। পাশাপাশি সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক তৎপরতা নিয়ে ইসরায়েলের কাছে গোয়েন্দা তথ্যও রয়েছে।

তবে হ্যারেল মনে করেন, নেতানিয়াহু একই সঙ্গে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরায়েল সম্ভাব্য বিভিন্ন ফ্রন্টে আগাম সামরিক পদক্ষেপ এবং সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা অঞ্চল তৈরির কৌশল নিয়েছে। গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় এর উদাহরণ দেখা গেছে। এবার সেই তালিকায় তুরস্কও যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

নির্বাচনের আগে বিরোধীদের প্রশ্ন

নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই হামলার রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ হামলাটিকে প্রয়োজনীয় বলে সমর্থন করলেও পরে নেতানিয়াহুর বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন। তার মতে, প্রয়োজন হলে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক হামলা চালানো গুরুত্বপূর্ণ হলেও হামলার পর উত্তেজনা না বাড়িয়ে নীরব থাকা উচিত।

বামপন্থী ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলান হামলাটিকে ‘উসকানিমূলক ও বিপজ্জনক’ বলে মন্তব্য করেছেন।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক আরও কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, নির্বাচন সামনে রেখে নিরাপত্তা নিয়ে একের পর এক উত্তেজনা তৈরি করে জনগণকে আতঙ্কিত করার মধ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে।

বর্তমান জনমত জরিপে নেতানিয়াহু ও তার জোট পিছিয়ে রয়েছে। ফলে নতুন কোনো নিরাপত্তা সংকট তৈরি হলে নির্বাচনী রাজনীতির হিসাব বদলে যেতে পারে বলে মনে করছেন সমালোচকেরা। নিরাপত্তা ইস্যুকে সামনে এনে নির্বাচনী প্রচারের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেওয়ার সুযোগও তৈরি হতে পারে নেতানিয়াহুর জন্য।

নতুন সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ছে

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান, গাজা ও লেবানন ইস্যুতে ইতোমধ্যে সামরিক চাপের মধ্যে থাকা ইসরায়েলের সামনে তুরস্ক-সিরিয়া একটি নতুন সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান সীমিত রাখতে চাপ দিচ্ছে। গাজা ও লেবাননেও ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি ইসরায়েলের জন্য নতুন কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

তবে তুরস্ককে সরাসরি ‘শত্রু’ হিসেবে তুলে ধরে নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহু কতটা নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলা করছেন আর কতটা রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


তুরস্ককে হঠাৎ ‘শত্রু’ বানাচ্ছে নেতানিয়াহু, নির্বাচনের আগে নতুন যুদ্ধের ছক?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৫ আগষ্ট ২০২৬ ১৭:০৮ পিএম

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক প্রচারে হঠাৎ করেই বড় হুমকি হিসেবে সামনে এসেছে তুরস্ক। তেল আবিবের ব্যস্ত সড়কের পাশে টানানো বিশাল এক বিলবোর্ডে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানকে ইসরায়েলের শত্রু হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

একই বিলবোর্ডে ইরান ও হিজবুল্লাহর নেতাদের পাশাপাশি নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিকেও দেখানো হয়েছে। সেখানে লেখা হয়েছে, ‘তারা নেতানিয়াহুকে হারাতে চায়। তাদের জিততে দেবেন না।’

এর কয়েক দিন পরই উত্তর সিরিয়ায় তুরস্কের সম্ভাব্য সামরিক উপস্থিতির অভিযোগ তুলে বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। ইসরায়েলের দাবি, সিরিয়ার আবু আল-দাহার বিমান ঘাঁটিতে তুরস্ক সেনা, ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। নেতানিয়াহুর কার্যালয় এটিকে ইসরায়েলের জন্য বড় ধরনের হুমকি হিসেবে দেখছে বলে জানিয়েছে।

তবে হামলার সময় নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে। ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনের আর দুই মাসের কিছুটা বেশি সময় বাকি। এমন সময়ে তুরস্ককে বড় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে তুলে ধরে সামরিক অভিযান চালানোয় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

নেতানিয়াহুর ‘নিরাপত্তা কার্ড’

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নেতানিয়াহু নিজেকে ইসরায়েলের নিরাপত্তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য রক্ষাকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করে আসছেন। দেশের জন্য যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় তিনিই সবচেয়ে সক্ষম—এমন বার্তাই তার রাজনৈতিক প্রচারের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।

এবারও সেই নিরাপত্তা ইস্যুকেই সামনে আনা হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ইরান, হামাস ও হিজবুল্লাহর পর তুরস্ককে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে সামনে এনে নেতানিয়াহু নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন নিরাপত্তা ইস্যু তৈরি করছেন কি না, সেটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।

তুরস্কে মার্কিন রাষ্ট্রদূত টম ব্যারাক ইসরায়েলের এই হামলার সমালোচনা করে এটিকে ‘অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি এমন সম্ভাবনাও তুলে ধরেছেন যে ইসরায়েল হয়তো তুরস্ককে ইচ্ছাকৃতভাবে উসকানি দিচ্ছে। তার মতে, নির্বাচনের আগে এ ধরনের উত্তেজনা নেতানিয়াহুর জন্য রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে।

তবে ইসরায়েল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

ইসরায়েলের দাবি, তুরস্ক সিরিয়ায় সামরিক ঘাঁটি গড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। নেতানিয়াহু ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজের দাবি, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ইসরায়েলি সামরিক সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, ওই বিমান ঘাঁটিতে তুরস্কের সেনা, ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েনের পরিকল্পনা ছিল। ইসরায়েলের আশঙ্কা, তুরস্কের এমন উপস্থিতি সিরিয়ার আকাশসীমায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে এবং আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্য বদলে দিতে পারে।

সিরিয়া নিয়ে ইসরায়েল-তুরস্কের নতুন সংঘাত

ইসরায়েল ও তুরস্কের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিরোধ থাকলেও সিরিয়ায় দুই দেশের স্বার্থের সংঘাত নতুন মাত্রা পেতে পারে। সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি বাড়লে সেটি ইসরায়েলের জন্য কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এরই মধ্যে ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতায় ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের প্রধান রোমান গফম্যান জর্ডানে সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সাম্প্রতিক উত্তেজনা কমানোই বৈঠকের লক্ষ্য ছিল বলে জানিয়েছে সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সানা।

তুরস্ক অবশ্য ইসরায়েলের ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছে। আঙ্কারা নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অহেতুক উত্তেজনা তৈরির অভিযোগ তুলেছে এবং সিরিয়ার শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে।

এরদোয়ান-নেতানিয়াহু বিরোধ আরও তীব্র

নেতানিয়াহু ও এরদোয়ানের মধ্যে প্রকাশ্য বিরোধ নতুন নয়। গাজা যুদ্ধ, লেবানন ও ইরান ইস্যুতে দুই নেতার অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত।

এরদোয়ান নেতানিয়াহুকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে আখ্যা দিয়ে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের তীব্র সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে নেতানিয়াহু এরদোয়ানের বিরুদ্ধে হামাসকে সমর্থনের অভিযোগ করে আসছেন।

সম্প্রতি তুরস্ককে যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান দেওয়ারও বিরোধিতা করেছেন নেতানিয়াহু। তিনি এরদোয়ানের ‘আগ্রাসী উচ্চাকাঙ্ক্ষা’ নিয়ে সতর্ক করেছেন।

শুক্রবার নেতানিয়াহুর কার্যালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এরদোয়ানকে ‘ইহুদিবিদ্বেষী স্বৈরশাসক’ হিসেবে উল্লেখ করে তার বিরুদ্ধে নিজ দেশের জনগণের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ তোলে।

নিরাপত্তা নাকি নির্বাচনী কৌশল?

ইসরায়েলের নিরাপত্তা বিশ্লেষক আমোস হ্যারেলের মতে, তুরস্কের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি হামলার পেছনে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক—দুই ধরনের কারণই থাকতে পারে। তার মতে, এরদোয়ানের ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান সত্যিই উদ্বেগের কারণ। পাশাপাশি সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক তৎপরতা নিয়ে ইসরায়েলের কাছে গোয়েন্দা তথ্যও রয়েছে।

তবে হ্যারেল মনে করেন, নেতানিয়াহু একই সঙ্গে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরায়েল সম্ভাব্য বিভিন্ন ফ্রন্টে আগাম সামরিক পদক্ষেপ এবং সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা অঞ্চল তৈরির কৌশল নিয়েছে। গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় এর উদাহরণ দেখা গেছে। এবার সেই তালিকায় তুরস্কও যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

নির্বাচনের আগে বিরোধীদের প্রশ্ন

নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই হামলার রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ হামলাটিকে প্রয়োজনীয় বলে সমর্থন করলেও পরে নেতানিয়াহুর বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন। তার মতে, প্রয়োজন হলে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক হামলা চালানো গুরুত্বপূর্ণ হলেও হামলার পর উত্তেজনা না বাড়িয়ে নীরব থাকা উচিত।

বামপন্থী ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলান হামলাটিকে ‘উসকানিমূলক ও বিপজ্জনক’ বলে মন্তব্য করেছেন।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক আরও কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, নির্বাচন সামনে রেখে নিরাপত্তা নিয়ে একের পর এক উত্তেজনা তৈরি করে জনগণকে আতঙ্কিত করার মধ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে।

বর্তমান জনমত জরিপে নেতানিয়াহু ও তার জোট পিছিয়ে রয়েছে। ফলে নতুন কোনো নিরাপত্তা সংকট তৈরি হলে নির্বাচনী রাজনীতির হিসাব বদলে যেতে পারে বলে মনে করছেন সমালোচকেরা। নিরাপত্তা ইস্যুকে সামনে এনে নির্বাচনী প্রচারের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেওয়ার সুযোগও তৈরি হতে পারে নেতানিয়াহুর জন্য।

নতুন সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ছে

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান, গাজা ও লেবানন ইস্যুতে ইতোমধ্যে সামরিক চাপের মধ্যে থাকা ইসরায়েলের সামনে তুরস্ক-সিরিয়া একটি নতুন সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান সীমিত রাখতে চাপ দিচ্ছে। গাজা ও লেবাননেও ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি ইসরায়েলের জন্য নতুন কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

তবে তুরস্ককে সরাসরি ‘শত্রু’ হিসেবে তুলে ধরে নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহু কতটা নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলা করছেন আর কতটা রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর