ডাকাতির টাকায় সম্পদের পাহাড়, বাবুগঞ্জে জলিল মোল্লার মাছের ঘের-খামার ও বিলাসবহুল বাড়ি
বরিশালের বাবুগঞ্জের জলিল মোল্লাকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ডাকাতি ও ছিনতাই চক্রের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে দাবি করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। গোয়েন্দা পুলিশের ভাষ্য, বিভিন্ন বড় ধরনের ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় লুট হওয়া অর্থের বড় একটি অংশ পেতেন জলিল মোল্লা। সেই অর্থে তিনি বরিশাল, বাবুগঞ্জ ও ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন।
সম্প্রতি রাজধানীর উত্তরা এলাকায় একটি ফিলিং স্টেশনের সোয়া কোটি টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় জলিল মোল্লাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ডিবির দাবি, ওই ঘটনায় তিনি মাস্টারমাইন্ড হিসেবে কাজ করেছেন এবং ছিনতাই হওয়া ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা থেকে ৫০ লাখ টাকা তার ভাগে যায়। ওই ঘটনায় আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাদের কাছ থেকে ৬০ লাখ টাকা উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।
জলিল মোল্লার গ্রামের বাড়ি বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার রহমতপুর ইউনিয়নের খানপুরা গ্রামে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় তিনি সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তান ছিলেন। ২০০২ সালে ঢাকায় গিয়ে ভাড়ায়চালিত ট্যাক্সি চালাতেন। পরে সৌদি আরবে গিয়ে কয়েক বছর গাড়িচালক হিসেবে কাজ করেন। দেশে ফেরার পর তার নির্দিষ্ট কোনো পেশার বিষয়ে স্থানীয়দের কাছে পরিষ্কার তথ্য ছিল না। তবে এর পর থেকেই তার নামে একের পর এক জমি কেনা এবং মাছের ঘের গড়ে ওঠে।
বাবুগঞ্জ সদরে প্রায় ৩০ শতাংশ জমির ওপর জলিল মোল্লা ও তার দুই ভাইয়ের একটি আধুনিক দোতলা বাড়ি রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। বরিশাল সদরের আইচা গ্রামে সাবেক সংসদ সদস্য নাসিম বিশ্বাসের মাছের ঘেরের পাশে প্রায় ১০ একর জমির ওপর তার একটি বড় ঘের রয়েছে। ওই ঘেরে পাঁচটি পুকুরের পাশাপাশি বিদেশি গরু-ছাগল এবং বিপুলসংখ্যক হাঁস-মুরগি রয়েছে।
এ ছাড়া বাবুগঞ্জের রহমতপুর ইউনিয়নের খানপুরা মৌজায় প্রায় ২০ শতাংশ জমি কেনার তথ্য পাওয়া গেছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৫০ লাখ টাকা বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। আরও কয়েকটি জায়গায় তার জমি ও বিনিয়োগ রয়েছে বলে জানা গেছে।
ডিবি ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, জলিল মোল্লা নিজের পাশাপাশি ভাই ও স্বজনদের নামেও সম্পদ করেছেন। বরিশাল ও বাবুগঞ্জে তার পরিবার ও স্বজনদের নামে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। ঢাকার আশুলিয়ার চারাবাগ চৌরাস্তা এলাকায় প্রায় ৭ শতাংশ জমির ওপর ছয়তলা ভবনও রয়েছে জলিলের। জমি ও ভবনটির বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, জলিল মোল্লার সম্পদের বড় অংশ মাছের ঘের, খামার, জমি ও বিভিন্ন ব্যবসায়িক বিনিয়োগে রয়েছে। তার খামার ও ঘের দেখাশোনার জন্য একাধিক কর্মচারীও নিয়োজিত রয়েছেন। তাদের মাসিক বেতন ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বলে জানা গেছে।
উত্তরার ফিলিং স্টেশনের টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় তদন্ত করতে গিয়ে জলিলের গ্রামের বাড়ি ও সম্পদের তথ্য সংগ্রহ করে ডিবি। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, তার বাড়িতে নিরাপত্তার জন্য একাধিক সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। বাড়ির নিচতলা বর্তমানে একটি বেসরকারি এনজিও ও একটি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে।
ডিবির দাবি, জলিল মোল্লা নিজে সব সময় মাঠপর্যায়ের অপরাধে অংশ নিতেন না। বরং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অর্থ পরিবহনের তথ্য সংগ্রহ, টার্গেট নির্ধারণ, অস্ত্র ও গাড়ি সংগ্রহ এবং অপরাধী দলের সদস্যদের সংগঠিত করার কাজ করতেন। কোনো ডাকাতি বা ছিনতাই সফল হলে লুটের বড় একটি অংশ তার কাছে যেত।
গত ৯ আগস্ট রাজধানীর উত্তরা এলাকায় একটি ফিলিং স্টেশনের ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যাংকে নেওয়ার পথে ছিনতাইয়ের ঘটনায় জলিলের সংশ্লিষ্টতার কথা জানিয়েছে ডিবি। তদন্তে বেরিয়ে আসে, তার সহযোগী আবদুল হাকিম ওই ফিলিং স্টেশনের গ্যারেজে মেকানিকের ছদ্মবেশে কাজ করে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন। পরে ওই তথ্যের ভিত্তিতে ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করা হয় বলে পুলিশের দাবি।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ছিনতাইয়ের ঘটনায় অস্ত্র সংগ্রহ, খেলনা পিস্তল ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জ্যাকেট ব্যবহারের পরিকল্পনাও করা হয়েছিল। পরে ৯ আগস্ট সকালে টাকা ব্যাংকে নেওয়ার সময় হামলা চালিয়ে তা ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
ডিবির তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ছিনতাইয়ের পর জলিল মোল্লা তার ভাগের প্রায় ৫০ লাখ টাকা নিয়ে আশুলিয়ায় এক আত্মীয়ের কাছে যান। পরে নিরাপত্তার কারণে সেখান থেকে নিজ এলাকায় ফিরে যান। এরপর চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে এক আত্মীয়ের বাড়িতে আত্মগোপন করেন। সেখান থেকে র্যাব তাকে গ্রেপ্তার করে বলে ডিবি জানিয়েছে।
জলিল মোল্লার ভাই দলিল মোল্লা জানান, তার ভাই একসময় ঢাকায় গাড়ি চালাতেন এবং পরে সৌদি আরবে গাড়িচালক হিসেবে কাজ করেন। দেশে ফিরে তিনি জমি কেনা ও মাছের ঘেরের ব্যবসা শুরু করেন। তবে দলিল মোল্লার দাবি, জলিল আগে থেকেই বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে ওই পথ থেকে ফেরানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।
অন্যদিকে, জলিল মোল্লার অর্থায়নে স্থানীয় দুই ব্যক্তি ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনা করেন—এমন অভিযোগও উঠেছে। তবে সংশ্লিষ্টদের একজন ইশতিয়াক আহমেদ জুয়েল অভিযোগটি অস্বীকার করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, জলিল তার প্রতিবেশী হলেও তার ব্যবসায় জলিলের কোনো বিনিয়োগ নেই।
ডিবির উত্তরা বিভাগের উপ-কমিশনার মো. ইলিয়াস কবিরের ভাষ্য অনুযায়ী, জলিল মোল্লা ডাকাতি ও ছিনতাই চক্রের অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় তার লোকজন রয়েছে। বড় ধরনের ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলেই সেখান থেকে তিনি বড় অঙ্কের অর্থ পেতেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
পুলিশের দাবি, ডাকাতি ও ছিনতাই থেকে অর্জিত অর্থ ব্যবহার করেই জলিল মোল্লা বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। তার সম্পদের উৎস ও বিভিন্ন অপরাধে সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: