infoamaderdin@gmail.com শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩

শিক্ষক আছেন, ভবন আছে, কাগজে ১১০ শিক্ষার্থী—স্কুলে গিয়ে মিলল শুধু ছাগল

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৪:০৯ পিএম

ঝালকাঠির রাজাপুরে একটি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক আছেন, আছে সরকারি সুযোগ-সুবিধার অবকাঠামো; কাগজে-কলমে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও ১১০। কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে শ্রেণিকক্ষে একজন শিক্ষার্থীকেও পাওয়া যায়নি। বরং বেঞ্চ ও মেঝেতে ছড়িয়ে রয়েছে ছাগলের মলমূত্র, কাদামাটি ও ময়লা-আবর্জনা। শ্রেণিকক্ষের কোণে জমেছে মাকড়সার জাল। হোয়াইট বোর্ডে এখনও দেখা যাচ্ছে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের পাঠের চিহ্ন।

এমন চিত্র দেখা গেছে ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার মঠবাড়ি ইউনিয়নের পশ্চিম বাদুরতলা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের জন্য প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টিতে কাগজে-কলমে শতাধিক শিক্ষার্থী থাকলেও বাস্তবে নিয়মিত কোনো শিক্ষার্থীই আসে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

সম্প্রতি বেলা ১১টার দিকে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান ফটকে তালা ঝুলছে। বন্ধ প্রধান শিক্ষকের কার্যালয়ও। বিদ্যালয়ের বাইরে জাতীয় পতাকা টাঙানো থাকলেও ভেতরের শ্রেণিকক্ষগুলোর অবস্থা ছিল অত্যন্ত অপরিচ্ছন্ন। শিক্ষার্থীদের জন্য রাখা বেঞ্চগুলো এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে। বেঞ্চ ও মেঝেতে ছাগলের মলমূত্র, কাদা ও আবর্জনা ছড়িয়ে রয়েছে। শ্রেণিকক্ষে ছাগলের অবাধ বিচরণ দেখে মনে হয়, শিক্ষার্থীদের বদলে বিদ্যালয়টিই যেন ছাগলের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে।

শ্রেণিকক্ষের হোয়াইট বোর্ডে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের লেখা ও পাঠের চিহ্ন পাওয়া গেছে। চলতি বছরে সেখানে নিয়মিত পাঠদান হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়টির এমন অবস্থা চলে আসছে।

সকাল গড়িয়ে বেলা ১১টার পর বিদ্যালয়ে উপস্থিত হন সহকারী শিক্ষক অনামিকা মৃর্ধা ও রতন লাল মিস্ত্রি। এত দেরিতে বিদ্যালয়ে আসার কারণ জানতে চাইলে তারা কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। পরে সাংবাদিকের উপস্থিতির খবর প্রধান শিক্ষকসহ অন্যদের ফোনে জানানো হয়।

দুপুর ১২টার দিকে বিদ্যালয়ে আসেন প্রধান শিক্ষক মো. আক্তারুজ্জামান বাচ্চু ও সহকারী শিক্ষক মো. হাসান মৃধা। তবে অন্য শিক্ষক-কর্মচারীদের দেখা যায়নি। সাংবাদিকেরা বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতা দেখতে চাইলে সেটিও দেখানো সম্ভব হয়নি। পরে জানানো হয়, হাজিরা খাতা বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা আবুবকর সিদ্দিকের বাড়িতে রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী না থাকলেও কাগজে-কলমে তাদের উপস্থিতি দেখানো হয়। স্থানীয়দের দাবি, প্রধান শিক্ষক মো. আক্তারুজ্জামান বাচ্চু ও প্রতিষ্ঠাতা আবুবকর সিদ্দিক ওরফে আবু বিভিন্ন এলাকার ঝরে পড়া কিংবা পড়াশোনা না করা ছেলে-মেয়েদের অর্থের বিনিময়ে বিদ্যালয়ের খাতায় শিক্ষার্থী হিসেবে ভর্তি দেখান।

আরও অভিযোগ, কোনো অডিট, পরিদর্শন বা সরকারি অনুষ্ঠান হলে ঝালকাঠি সদর থেকে দুটি অটোরিকশায় করে অর্থের বিনিময়ে শিক্ষার্থী এনে বিদ্যালয়ে উপস্থিত দেখানো হয়। এমনকি পরীক্ষার সময়ও বাইরে থেকে শিক্ষার্থী এনে বসানোর অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠাতা আবুবকর সিদ্দিকের পরিবারের অন্তত পাঁচজন সদস্য বিদ্যালয়ের বিভিন্ন পদে কর্মরত। প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান শিক্ষক মিলে নিজেদের পছন্দমতো কমিটি গঠন করে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিয়েও রয়েছে অভিযোগ। স্থানীয়দের ভাষ্য, শিক্ষক-কর্মচারীরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে না আসায় একসময় সভাপতি মাসিক বেতন শিটে স্বাক্ষর করতে আপত্তি জানান। পরে সভাপতির স্বাক্ষর জাল করে বেতনের টাকা উত্তোলনের অভিযোগও ওঠে।

বর্তমানে বিদ্যালয়ের সভাপতি পদে রয়েছেন প্রধান শিক্ষকের ভাতিজা মিজানুর রহমান পারভেজ। স্থানীয়দের দাবি, তিনিও নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসেন না এবং বাড়িতে বসেই বেতন-বিলের কাগজে স্বাক্ষর করেন। এভাবে প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা সরকারি অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ করেছেন তারা।

স্থানীয় বাসিন্দা আরাফাত ও আসমা বেগম বলেন, পরীক্ষার সময় কিছু শিক্ষার্থীকে দেখা গেলেও অন্য সময়ে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। শিক্ষকেরাও নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসেন না। ফলে অধিকাংশ সময় শ্রেণিকক্ষ ফাঁকাই পড়ে থাকে।

বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি হাসনাইন তালুকদার দিবস জানান, ২০০৬ সালে তাকে বিদ্যালয়ের সভাপতি করা হয়েছিল। দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিন পরই তিনি জানতে পারেন, বিদ্যালয়ে প্রকৃতপক্ষে কোনো শিক্ষার্থী নেই। পরিদর্শনের সময় অন্য বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থী এনে বসিয়ে রাখার ঘটনাও তিনি দেখেছেন বলে দাবি করেন।

তার অভিযোগ, ঘূর্ণিঝড় সিডরে বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেখিয়ে তার স্বাক্ষর জাল করে সভার রেজুলেশন তৈরি করা হয়েছিল। পরে সরকারের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা অনুদান নেওয়া হয়। ২০০৮ সালে টাকা উত্তোলনের সময় বিষয়টি ধরা পড়ে। এসব অনিয়মের প্রতিবাদে তিনি তৎকালীন জেলা প্রশাসক হরিপ্রসাদ পালের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন বলে জানান।

একই ধরনের অভিযোগ করেছেন রাজাপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি জাহিদুল ইসলাম জাহিদ। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিনি বিদ্যালয়ের সভাপতি ছিলেন। তার দাবি, দায়িত্বে থাকা অবস্থায় কাগজে-কলমে শিক্ষার্থীর নাম থাকলেও বাস্তবে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী পাওয়া যেত না। বিভিন্নভাবে তাকে ব্যবহার করে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি। পরিস্থিতির পরিবর্তন না হওয়ায় মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ২০১৫ সালে তিনি পদত্যাগ করেন।

বিদ্যালয়ের বর্তমান সভাপতি মো. মিজানুর রহমান পারভেজের কাছে এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। সাংবাদিককে তিনি বলেন, তার কাছে জবাবদিহি করতে তিনি বাধ্য নন। বেতন শিটে টাকার বিনিময়ে স্বাক্ষরের অভিযোগের বিষয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে বিষয়টি জানাবেন বলে জানান।

প্রধান শিক্ষক মো. আক্তারুজ্জামান বাচ্চু বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী উপস্থিতি না থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, কাগজে-কলমে বিদ্যালয়ে ১১০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। স্থানীয় ৪ থেকে ৫ জন ছাড়া অন্যরা নিয়মিত আসে না। এ কারণে মাঝে মাঝে ঝালকাঠি শহর থেকে দুটি অটোরিকশায় শিক্ষার্থী এনে ক্লাস করানো হয় বলেও তিনি জানান।

এ বিষয়ে রাজাপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান জানান, বিষয়টি জানার পর প্রধান শিক্ষকের কাছে লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। বিদ্যালয়টিকে এক সপ্তাহ পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না পাওয়া গেলে এবং পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হবে।

রাজাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিফাত আরা মৌরি বলেন, বিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রধান শিক্ষকের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। তদন্তের পর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শিক্ষার্থীশূন্য বিদ্যালয়, নিয়মিত পাঠদান না হওয়া, শিক্ষক-কর্মচারীদের অনিয়মিত উপস্থিতি এবং কাগজে-কলমে শিক্ষার্থী দেখানোর অভিযোগ—সব মিলিয়ে পশ্চিম বাদুরতলা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কার্যক্রম নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। এখন তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা কতটা, সেটিই দেখার বিষয়।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


শিক্ষক আছেন, ভবন আছে, কাগজে ১১০ শিক্ষার্থী—স্কুলে গিয়ে মিলল শুধু ছাগল

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৪:০৯ পিএম

ঝালকাঠির রাজাপুরে একটি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক আছেন, আছে সরকারি সুযোগ-সুবিধার অবকাঠামো; কাগজে-কলমে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও ১১০। কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে শ্রেণিকক্ষে একজন শিক্ষার্থীকেও পাওয়া যায়নি। বরং বেঞ্চ ও মেঝেতে ছড়িয়ে রয়েছে ছাগলের মলমূত্র, কাদামাটি ও ময়লা-আবর্জনা। শ্রেণিকক্ষের কোণে জমেছে মাকড়সার জাল। হোয়াইট বোর্ডে এখনও দেখা যাচ্ছে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের পাঠের চিহ্ন।

এমন চিত্র দেখা গেছে ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার মঠবাড়ি ইউনিয়নের পশ্চিম বাদুরতলা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের জন্য প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টিতে কাগজে-কলমে শতাধিক শিক্ষার্থী থাকলেও বাস্তবে নিয়মিত কোনো শিক্ষার্থীই আসে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

সম্প্রতি বেলা ১১টার দিকে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান ফটকে তালা ঝুলছে। বন্ধ প্রধান শিক্ষকের কার্যালয়ও। বিদ্যালয়ের বাইরে জাতীয় পতাকা টাঙানো থাকলেও ভেতরের শ্রেণিকক্ষগুলোর অবস্থা ছিল অত্যন্ত অপরিচ্ছন্ন। শিক্ষার্থীদের জন্য রাখা বেঞ্চগুলো এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে। বেঞ্চ ও মেঝেতে ছাগলের মলমূত্র, কাদা ও আবর্জনা ছড়িয়ে রয়েছে। শ্রেণিকক্ষে ছাগলের অবাধ বিচরণ দেখে মনে হয়, শিক্ষার্থীদের বদলে বিদ্যালয়টিই যেন ছাগলের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে।

শ্রেণিকক্ষের হোয়াইট বোর্ডে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের লেখা ও পাঠের চিহ্ন পাওয়া গেছে। চলতি বছরে সেখানে নিয়মিত পাঠদান হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়টির এমন অবস্থা চলে আসছে।

সকাল গড়িয়ে বেলা ১১টার পর বিদ্যালয়ে উপস্থিত হন সহকারী শিক্ষক অনামিকা মৃর্ধা ও রতন লাল মিস্ত্রি। এত দেরিতে বিদ্যালয়ে আসার কারণ জানতে চাইলে তারা কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। পরে সাংবাদিকের উপস্থিতির খবর প্রধান শিক্ষকসহ অন্যদের ফোনে জানানো হয়।

দুপুর ১২টার দিকে বিদ্যালয়ে আসেন প্রধান শিক্ষক মো. আক্তারুজ্জামান বাচ্চু ও সহকারী শিক্ষক মো. হাসান মৃধা। তবে অন্য শিক্ষক-কর্মচারীদের দেখা যায়নি। সাংবাদিকেরা বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতা দেখতে চাইলে সেটিও দেখানো সম্ভব হয়নি। পরে জানানো হয়, হাজিরা খাতা বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা আবুবকর সিদ্দিকের বাড়িতে রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী না থাকলেও কাগজে-কলমে তাদের উপস্থিতি দেখানো হয়। স্থানীয়দের দাবি, প্রধান শিক্ষক মো. আক্তারুজ্জামান বাচ্চু ও প্রতিষ্ঠাতা আবুবকর সিদ্দিক ওরফে আবু বিভিন্ন এলাকার ঝরে পড়া কিংবা পড়াশোনা না করা ছেলে-মেয়েদের অর্থের বিনিময়ে বিদ্যালয়ের খাতায় শিক্ষার্থী হিসেবে ভর্তি দেখান।

আরও অভিযোগ, কোনো অডিট, পরিদর্শন বা সরকারি অনুষ্ঠান হলে ঝালকাঠি সদর থেকে দুটি অটোরিকশায় করে অর্থের বিনিময়ে শিক্ষার্থী এনে বিদ্যালয়ে উপস্থিত দেখানো হয়। এমনকি পরীক্ষার সময়ও বাইরে থেকে শিক্ষার্থী এনে বসানোর অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠাতা আবুবকর সিদ্দিকের পরিবারের অন্তত পাঁচজন সদস্য বিদ্যালয়ের বিভিন্ন পদে কর্মরত। প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান শিক্ষক মিলে নিজেদের পছন্দমতো কমিটি গঠন করে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিয়েও রয়েছে অভিযোগ। স্থানীয়দের ভাষ্য, শিক্ষক-কর্মচারীরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে না আসায় একসময় সভাপতি মাসিক বেতন শিটে স্বাক্ষর করতে আপত্তি জানান। পরে সভাপতির স্বাক্ষর জাল করে বেতনের টাকা উত্তোলনের অভিযোগও ওঠে।

বর্তমানে বিদ্যালয়ের সভাপতি পদে রয়েছেন প্রধান শিক্ষকের ভাতিজা মিজানুর রহমান পারভেজ। স্থানীয়দের দাবি, তিনিও নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসেন না এবং বাড়িতে বসেই বেতন-বিলের কাগজে স্বাক্ষর করেন। এভাবে প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা সরকারি অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ করেছেন তারা।

স্থানীয় বাসিন্দা আরাফাত ও আসমা বেগম বলেন, পরীক্ষার সময় কিছু শিক্ষার্থীকে দেখা গেলেও অন্য সময়ে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। শিক্ষকেরাও নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসেন না। ফলে অধিকাংশ সময় শ্রেণিকক্ষ ফাঁকাই পড়ে থাকে।

বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি হাসনাইন তালুকদার দিবস জানান, ২০০৬ সালে তাকে বিদ্যালয়ের সভাপতি করা হয়েছিল। দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিন পরই তিনি জানতে পারেন, বিদ্যালয়ে প্রকৃতপক্ষে কোনো শিক্ষার্থী নেই। পরিদর্শনের সময় অন্য বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থী এনে বসিয়ে রাখার ঘটনাও তিনি দেখেছেন বলে দাবি করেন।

তার অভিযোগ, ঘূর্ণিঝড় সিডরে বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেখিয়ে তার স্বাক্ষর জাল করে সভার রেজুলেশন তৈরি করা হয়েছিল। পরে সরকারের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা অনুদান নেওয়া হয়। ২০০৮ সালে টাকা উত্তোলনের সময় বিষয়টি ধরা পড়ে। এসব অনিয়মের প্রতিবাদে তিনি তৎকালীন জেলা প্রশাসক হরিপ্রসাদ পালের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন বলে জানান।

একই ধরনের অভিযোগ করেছেন রাজাপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি জাহিদুল ইসলাম জাহিদ। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিনি বিদ্যালয়ের সভাপতি ছিলেন। তার দাবি, দায়িত্বে থাকা অবস্থায় কাগজে-কলমে শিক্ষার্থীর নাম থাকলেও বাস্তবে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী পাওয়া যেত না। বিভিন্নভাবে তাকে ব্যবহার করে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি। পরিস্থিতির পরিবর্তন না হওয়ায় মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ২০১৫ সালে তিনি পদত্যাগ করেন।

বিদ্যালয়ের বর্তমান সভাপতি মো. মিজানুর রহমান পারভেজের কাছে এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। সাংবাদিককে তিনি বলেন, তার কাছে জবাবদিহি করতে তিনি বাধ্য নন। বেতন শিটে টাকার বিনিময়ে স্বাক্ষরের অভিযোগের বিষয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে বিষয়টি জানাবেন বলে জানান।

প্রধান শিক্ষক মো. আক্তারুজ্জামান বাচ্চু বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী উপস্থিতি না থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, কাগজে-কলমে বিদ্যালয়ে ১১০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। স্থানীয় ৪ থেকে ৫ জন ছাড়া অন্যরা নিয়মিত আসে না। এ কারণে মাঝে মাঝে ঝালকাঠি শহর থেকে দুটি অটোরিকশায় শিক্ষার্থী এনে ক্লাস করানো হয় বলেও তিনি জানান।

এ বিষয়ে রাজাপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান জানান, বিষয়টি জানার পর প্রধান শিক্ষকের কাছে লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। বিদ্যালয়টিকে এক সপ্তাহ পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না পাওয়া গেলে এবং পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হবে।

রাজাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিফাত আরা মৌরি বলেন, বিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রধান শিক্ষকের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। তদন্তের পর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শিক্ষার্থীশূন্য বিদ্যালয়, নিয়মিত পাঠদান না হওয়া, শিক্ষক-কর্মচারীদের অনিয়মিত উপস্থিতি এবং কাগজে-কলমে শিক্ষার্থী দেখানোর অভিযোগ—সব মিলিয়ে পশ্চিম বাদুরতলা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কার্যক্রম নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। এখন তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা কতটা, সেটিই দেখার বিষয়।

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর