শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটির হাতেই, এনটিআরসিএ শুধু সনদ দেবে
বেসরকারি স্কুল-কলেজে প্রবেশ পর্যায়ের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা আবারও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডির হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ফলে ১৯তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা থেকে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) আর শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করবে না। প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই এনটিআরসিএর সনদধারীদের মধ্য থেকে শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারবে।
গত ৩ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে এনটিআরসিএর সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক, এনটিআরসিএ চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আলিফ রুদাবাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় এনটিআরসিএ চেয়ারম্যান জানান, ‘বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০০৫’-এর আওতায় প্রণীত ‘বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা গ্রহণ ও প্রত্যয়ন বিধিমালা, ২০০৬’ অনুযায়ী বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে নিবন্ধন ও প্রত্যয়নের জন্য প্রার্থীদের যোগ্যতা নিরূপণ এবং প্রত্যয়নপত্র দেওয়ার উদ্দেশ্যে নিয়মিত পরীক্ষা নেওয়ার বিধান রয়েছে।
এনটিআরসিএ ২০২৩ সালে সর্বশেষ শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল। এর ধারাবাহিকতায় ১৯তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি সভায় তুলে ধরা হয়।
সভা থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, ১৯তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা থেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ হবে। এনটিআরসিএ আর কোনো নিয়োগের সুপারিশ করবে না। এ জন্য প্রয়োজনীয় আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সভায় শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, ২০০৫ সালে এনটিআরসিএ প্রতিষ্ঠার পর ২০১৫ সালের আগে পর্যন্ত সংস্থাটি মূলত শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করত। ২০১৫ সাল থেকে এনটিআরসিএর সক্ষমতার বাইরে গিয়ে নিয়োগ সুপারিশের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর বিভিন্ন জটিলতা, মামলা ও অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, এনটিআরসিএর বর্তমান অচলাবস্থা নিরসনে আগের মতো শুধু নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে। এরপর প্রত্যয়নপত্র পাওয়া শিক্ষকদের সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে বাছাই করে নিয়োগ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হলে বর্তমান সমস্যার সমাধান হতে পারে। সভায় উপস্থিত কর্মকর্তারা এ মতের সঙ্গে একমত পোষণ করেন।
সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, ‘বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০০৫’ অনুযায়ী এনটিআরসিএ এখন থেকে কেবল শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়নের কাজ করবে। ২০১৫ সালের পরিপত্র অনুযায়ী নিয়োগ সুপারিশ করবে না। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ১৮তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৯ হাজার ৮৪২ জন প্রার্থীকে তাদের পছন্দ অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বউদ্যোগে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ জন্য প্রয়োজনীয় পরিপত্র বা প্রজ্ঞাপন সংশোধন কিংবা জারি করার কথাও সভার সিদ্ধান্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, সভার কার্যবিবরণীর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯তম শিক্ষক নিবন্ধন থেকেই ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা চালু হবে। এনটিআরসিএ আর নিয়োগের জন্য সুপারিশ করবে না। এজন্য প্রয়োজনীয় আইন সংশোধন করা হবে।
২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর প্রথম এক দশক এনটিআরসিএ শুধু শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা গ্রহণ ও সনদ প্রদানের কাজ করত। ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর নিবন্ধনধারী শিক্ষকদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগের সুপারিশ দেওয়ার কার্যক্রম শুরু করে সংস্থাটি। এর ফলে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগে সরাসরি সুপারিশের একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা তৈরি হয়।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত এনটিআরসিএ ১ লাখ ৭৭ হাজার ৫৭১ জন শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করেছে। নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে ভবিষ্যতে এনটিআরসিএর ভূমিকা মূলত শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
তবে নতুন ব্যবস্থায় শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও মেধাভিত্তিক বাছাই নিশ্চিত করা নিয়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা তৈরি হতে পারে। ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে নিয়োগে অনিয়ম ঠেকাতে কী ধরনের নীতিমালা ও তদারকি ব্যবস্থা থাকবে, আইন সংশোধনের সময় সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: