নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ হড়পা বান: বরফধস ও ভূমিধসেই কি বিপর্যয়?
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক হড়পা বানে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। বন্যায় মৃতের সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়েছে। এখনো ৫ শতাধিক পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের পাশাপাশি কয়েক ডজন সেনা, পুলিশ সদস্য ও বিদ্যুৎকর্মীরও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। দুর্যোগের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র এখনো স্পষ্ট না হলেও নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোর বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সতর্কতা জারি করেছে নেপাল কর্তৃপক্ষ।
নেপাল সেনাবাহিনী ইতোমধ্যে দুর্গত এলাকায় হেলিকপ্টার ও দুর্যোগ মোকাবিলা দলের সদস্যদের মোতায়েন করেছে। উদ্ধার ও তল্লাশি কার্যক্রমের পাশাপাশি দুর্গত মানুষের কাছে জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
এই দুর্যোগে নেপালের বিদ্যুৎ অবকাঠামোও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জলবিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ মিলিয়ে প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
কেন হলো এই ভয়াবহ হড়পা বান?
নেপাল-চীন সীমান্তের দুর্গম পার্বত্য এলাকায় ঠিক কী কারণে এত ভয়াবহ হড়পা বান সৃষ্টি হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে প্রাথমিক বিশ্লেষণে একটি বড় ধরনের পাথুরে বরফধসের সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে।
কাঠমান্ডুভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের রিমোট সেন্সিং ও জিও ইনফরমেশন বিশ্লেষক সার্থক শ্রেষ্ঠের মতে, নেপালের অংশে একটি পাথুরে বরফধস হয়ে থাকতে পারে। এতে লেন্দে নদীর গতিপথ সাময়িকভাবে আটকে গিয়ে পানির প্রবাহে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি হয়। পরে সেই বাধা ভেঙে যাওয়ার পর বিপুল পরিমাণ পানি একসঙ্গে নিচের দিকে নেমে এসে হড়পা বানের সৃষ্টি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করেও দুর্যোগের উৎস শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন। তবে মৌসুমি মেঘের কারণে দুর্গম পাহাড়ি এলাকার পরিষ্কার ছবি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে এখনো ঘটনাটির কারণ নিয়ে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নেপালের আবহাওয়া ও জলবিজ্ঞান বিভাগের কর্মকর্তাদের দাবি, তারা এমন কিছু ছবি পেয়েছেন, যা থেকে ধারণা করা হচ্ছে তিব্বতের অংশে একটি পাহাড় থেকে বিশাল বরফখণ্ড, সম্ভবত হিমবাহের একটি অংশ, ধসে পড়েছে। ওই বরফ ও পাথর নিচের দিকে নেমে এসে নদীর ওপর বিপুল পরিমাণ পাথর, বরফ ও পলিমাটি জমা করে নদীর প্রবাহ আটকে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বরফ ও পাথর নিচে নামার সময় ঘর্ষণের ফলে কিছু পরিমাণ পানি তৈরি হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। পরে নদীর ওপর জমে থাকা পাথর ও বরফের স্তূপের পেছনে পানি জমতে থাকে। পানির চাপ বাড়তে বাড়তে একপর্যায়ে সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে প্রবল গতিতে পানি নিচের দিকে নেমে আসে। এর ফলেই ভয়াবহ হড়পা বান তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
তবে এ বিষয়ে ভিন্ন মতও রয়েছে। চীনের কয়েকজন নেপালি শিক্ষাবিদ জানিয়েছেন, চীনা বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকেও তারা একই ধরনের ব্যাখ্যা পেয়েছেন। অন্যদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটিকে নেপালের ভূমিধস হিসেবে উল্লেখ করেছে।
এর আগে হিমবাহ হ্রদ ধসে বন্যার সৃষ্টি হয়েছে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়েছিল। তবে কয়েকজন হিমবাহ বিজ্ঞানী সেই সম্ভাবনা নাকচ করেছেন। ফলে স্যাটেলাইটের আরও পরিষ্কার ছবি পাওয়া এবং বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য যাচাইয়ের পরই দুর্যোগের প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে।
আরও বন্যা ও ভূমিধসের আশঙ্কা
নেপালের এই বিপর্যয় শুধু প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। নতুন করে বন্যা ও ভূমিধসের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। দুর্যোগের কারণে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক বন্ধ হয়ে গেছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, নেপালের অংশে ভূমিধসের কারণে তিব্বতের জিরং বন্দরে ব্যাপক হতাহত ও নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে। প্রকাশিত ভিডিওতে প্রবল স্রোতের সঙ্গে গাছের ডালপালা ও বিভিন্ন ধরনের ধ্বংসাবশেষ ভেসে আসতে দেখা গেছে। সড়কও পানিতে তলিয়ে গেছে। তবে ভিডিওটির সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
তিব্বতের শিগাতসের ট্রাফিক কর্তৃপক্ষও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সতর্ক করে জানিয়েছে, ওই অঞ্চলের সড়কগুলো ভূমিধসের ঝুঁকিতে রয়েছে এবং অনেক জায়গায় চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়ার তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুলাইয়েও জিরং বন্দরের কাছে ভূমিধসের ঘটনায় ১৭ জন নিখোঁজ হয়েছিলেন। ফলে একই অঞ্চলে বারবার ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে ঝুঁকি
দক্ষিণ এশিয়ায় জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্ষা মৌসুমে প্রায়ই বন্যা, ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার ঘটনা ঘটে। তবে বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয় অঞ্চলে চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন এবং আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।
ইসিমোডের জলবায়ু ও পরিবেশ ঝুঁকি বিভাগের প্রধান চিয়াংগং ঝাং সতর্ক করে বলেছেন, নেপাল-চীন সীমান্তের উজানে এখনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়ে থাকতে পারে। ফলে যেকোনো সময় দ্বিতীয় দফায় বড় ধরনের বন্যা দেখা দিতে পারে।
এ অবস্থায় নদীতীরবর্তী ও পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোকে সম্ভাব্য নতুন বন্যা ও ভূমিধস মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তের এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের প্রকৃত কারণ এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত না হলেও প্রাথমিকভাবে বরফধস, ভূমিধস, নদীর প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং পরে সেই প্রাকৃতিক বাধা ভেঙে যাওয়ার ঘটনাকেই হড়পা বানের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পরিষ্কার স্যাটেলাইট চিত্র ও মাঠপর্যায়ের তথ্য পাওয়া গেলে এ বিষয়ে আরও নির্ভুল ধারণা পাওয়া যাবে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: