infoamaderdin@gmail.com বৃহঃস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬
১২ ভাদ্র ১৪৩৩

রংপুরে ৪ খুন

জবানবন্দিতে ভয়ংকর তথ্য, দুই আসামির ডিএনএ ও ডোপ টেস্ট হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২৭ আগষ্ট ২০২৬ ১৩:০৮ পিএম

রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও দুই সন্তানের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে চাঞ্চল্যকর নতুন তথ্য উঠে এসেছে। গ্রেপ্তার দুই আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের জবানবন্দির ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন দিক যাচাই করছে পুলিশ। একই সঙ্গে দুই আসামির ডিএনএ পরীক্ষা ও ডোপ টেস্ট করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকাল ১০টায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরপিএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ।

পুলিশ কমিশনার জানান, একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় ময়নাতদন্ত ও তদন্তে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হবে। পাশাপাশি তাদের ডোপ টেস্টও করা হবে।

ময়নাতদন্তে কী পাওয়া গেছে

পুলিশ কমিশনার বলেন, নিহত গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থীর শরীরে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তে তাদের মৃত্যুর কারণ হিসেবে শ্বাসরোধ বা গলায় ফাঁস দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। আসামিদের দেওয়া জবানবন্দির সঙ্গে ময়নাতদন্তের এই তথ্যের মিল পাওয়া গেছে।

জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে সিদ্ধার্থ দাস জানান, তিনি একটি স্বর্ণের দোকানে কারিগর হিসেবে কাজ করেন। নিহত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির সঙ্গে তাদের বাড়ি লাগোয়া ছিল। গণপতি চক্রবর্তী যে জমিতে বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন, সেটি আগে সিদ্ধার্থের পূর্বপুরুষদের জমি ছিল বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

সিদ্ধার্থের জবানবন্দি অনুযায়ী, তিনি আগে মাঝেমধ্যে উৎসবের সময় ইয়াবা সেবন করলেও ঘটনার আগের এক মাস ধরে প্রতি বৃহস্পতিবার ইয়াবা সেবন করতেন। তার বড় ভাইয়ের বিয়ের পর বিভিন্ন কারণে প্রায় ছয়-সাত মাস তিনি বিজয় কাকুর বাসায় ঘুমাতেন এবং সেখানে খাওয়া-দাওয়াও করতেন। তবে ঘটনার আগের এক মাস তিনি প্রতি বৃহস্পতিবার সাক্ষী সীমান্তের বাসায় থাকতেন। সীমান্ত নেশা করতেন না এবং হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে কিছু জানতেন না বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘটনার রাতে কী ঘটেছিল

সিদ্ধার্থের বক্তব্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাত ১২টার পর তিনি মুগ্ধকে সঙ্গে নিয়ে সীমান্তদের বাসায় যান। সেখানে তারা ইয়াবা সেবন করেন। রাত ৩টার দিকে আরও ইয়াবা সেবনের ইচ্ছা হলে তারা মাদক ব্যবসায়ী শান্তর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন। পরে শান্তর বাড়ির সামনে থেকে আরও চারটি ইয়াবা সংগ্রহ করেন তারা। এ সময় মোবাইল ফোন বন্ধক রাখা হয়েছিল বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এরপর তারা আবার সীমান্তদের বাসায় ফিরে যান। রাত ৩টার পর সেখান থেকে বের হয়ে রাস্তায় কুকুর থাকায় সরাসরি গেট দিয়ে না গিয়ে দেয়াল টপকে পাশের দেবুদের বাড়িতে প্রবেশ করেন। পরে ওই বাড়ির ছাদ থেকে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যান। দুই ছাদের মধ্যে দূরত্ব ছিল প্রায় দুই থেকে আড়াই ফুট।

গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদের চারপাশে হাফওয়াল থাকায় বাইরে থেকে সহজে দেখা যেত না। পানির ট্যাংকির আড়ালে বসে তারা ইয়াবা সেবন করতে থাকেন। এভাবে কখন ভোর হয়ে যায়, তারা খেয়াল করেননি বলে জবানবন্দিতে উঠে এসেছে।

শিক্ষককে দেখে ফেলায় শুরু হয় হত্যাকাণ্ড

ভোরে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে হাঁটতে গিয়ে তাদের দেখে ফেলেন। তিনি তাদের ধমক দিয়ে জানতে চান, এত সকালে তারা সেখানে কী করছে। এতে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ ভয় পেয়ে যান। জবানবন্দি অনুযায়ী, তারা আশঙ্কা করেন গণপতি চক্রবর্তী চিৎকার করে বিষয়টি সবাইকে জানিয়ে দেবেন। এরপর তারা তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন।

সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ গণপতি চক্রবর্তীর গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে দুই দিক থেকে টান দেন। একপর্যায়ে তার মৃত্যু হয়। পরে ময়নাতদন্তেও শ্বাসরোধজনিত মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়।

মা-মেয়েকেও হত্যা

গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ টিন দিয়ে ঢেকে রাখার সময় শব্দ পেয়ে তার স্ত্রী ও মেয়ে ছাদে চলে আসেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তারা চিৎকার শুরু করলে মুগ্ধ তার স্ত্রীর গলা চেপে ধরেন এবং সিদ্ধার্থ মেয়ের গলা চেপে ধরেন।

পরে স্যারের স্ত্রীর গলায় থাকা গামছা ব্যবহার করে মেয়েটির গলায় প্যাঁচ দেওয়া হয়। এরপর পাশের কবুতরের খাবার রাখার বাক্স থেকে রশি নিয়ে মেয়েটির গলায় পেঁচিয়ে দুই দিক থেকে টান দেওয়া হয়। এভাবেই মা ও মেয়েকে হত্যা করা হয় বলে আসামিদের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে।

সিসিটিভির আশঙ্কায় বিদ্যুতের তার কেটে দেয়

হত্যাকাণ্ডের পর বাড়িতে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা আছে কি না, তা নিয়ে আশঙ্কায় নিচতলায় যায় দুই আসামি। সেখানে একটি পুরোনো প্লাস পেয়ে বিদ্যুতের তার কেটে দেন তারা। কোনো ক্যামেরা থাকলেও যাতে তা কাজ না করে, সে উদ্দেশ্যেই তারা তার কেটে দেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এরপর তারা আবার ছাদে ফিরে এসে মা ও মেয়ের মরদেহ এমন জায়গায় রাখেন, যাতে পাশের বাড়ির ছাদ থেকে সহজে দেখা না যায়।

শিশুকে চিনে ফেলেছিল সিদ্ধার্থ

এরপর তারা গণপতি চক্রবর্তীর ঘরে প্রবেশ করেন। সেখানে গিয়ে দেখতে পান, শিশুটি ঘুম থেকে উঠে গেছে। জবানবন্দি অনুযায়ী, শিশুটি সিদ্ধার্থকে চিনতে পেরে বলে, ‘সিদ্ধার্থ দাদা, তুমি এখানে কেন?’

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার বলেন, তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুটি ঘুমন্ত অবস্থায় ছিল বলে তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। তবে আদালতে দেওয়া আসামিদের জবানবন্দিতে ভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, শিশুটি ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধার্থকে চিনে ফেলে এবং তার নাম ধরে ডাকে।

শিশুটি চিৎকার করে অন্যদের জানিয়ে দিতে পারে—এই আশঙ্কায় তাকে হত্যা করা হয়। জবানবন্দি অনুযায়ী, কাপড় দিয়ে শিশুটির গলায় প্যাঁচ দিয়ে শ্বাসরোধ করা হয়।

এরপর ডাকাতির নাটক সাজানোর চেষ্টা

চারজনকে হত্যার পর দুই আসামি ক্লান্ত হয়ে পড়েন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন। তারা গোসল করেন এবং পরে তাদের কাছে থাকা আরেকটি ইয়াবা সেবন করেন।

এরপর মুগ্ধের মাথায় বাড়িটিকে চুরি বা ডাকাতির ঘটনা হিসেবে দেখানোর পরিকল্পনা আসে। তারা ঘরের ড্রয়ার খুলে জিনিসপত্র এলোমেলো করেন। মুগ্ধ বিভিন্ন অলংকার এনে দেন এবং সিদ্ধার্থ সেগুলো প্লাস্টিকের বাক্স ও কাপড়ের প্যাকেটে রাখেন।

বাড়ি থেকে তারা ১৫ হাজার টাকা নেন। এর মধ্যে সিদ্ধার্থ তার ভাগ হিসেবে ৩ হাজার ৫০০ টাকা পান। ওই টাকা দিয়ে তিনি মাদক ব্যবসায়ী শান্তর কাছে বন্ধক রাখা মোবাইল ফোনটি ছাড়িয়ে নেন।

স্বর্ণালংকার মাটির নিচে লুকিয়ে রাখে

জবানবন্দি অনুযায়ী, জুমার নামাজের সময় বাইরে মানুষের চলাচল কমে গেলে তারা ছাদ থেকে পাশের দেবুদের বাড়ির ছাদে যান। পরে দেয়াল টপকে বাইরে বের হয়ে যান। মুগ্ধ ১৫ হাজার টাকা নিয়ে যান। আর স্বর্ণালংকারের ব্যাগ নিয়ে সিদ্ধার্থ একটি গলিতে যান।

পরে কাউকে বুঝতে না দিয়ে পূর্ণিমা কাকির বাড়ির পেছনে মাটির নিচে স্বর্ণালংকারগুলো লুকিয়ে রাখেন সিদ্ধার্থ। বিজয় কাকা ও পূর্ণিমা কাকি এসব বিষয়ে কিছুই জানতেন না বলে জবানবন্দিতে উঠে এসেছে।

পরদিন স্বাভাবিকভাবে দোকানে যান সিদ্ধার্থ

ঘটনার পর সিদ্ধার্থ বাড়িতে গিয়ে আবার গোসল করেন। পরে মুগ্ধের কাছ থেকে নিজের ভাগের ৩ হাজার ৫০০ টাকা নেন। ওই টাকা দিয়ে বন্ধক রাখা মোবাইল ফোনটি ছাড়িয়ে নেন। পরদিন তিনি স্বাভাবিকভাবেই স্বর্ণের দোকানে কাজে যান বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে মুগ্ধ বাড়িতেই ছিলেন। পরে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।

ইয়াবা সেবনের হিসাবেও অমিল

পুলিশ কমিশনার জানান, সিদ্ধার্থের জবানবন্দি অনুযায়ী, ঘটনার দিন দুই আসামি মোট আটটি ইয়াবা সেবন করেছিলেন। এর আগে তারা একসঙ্গে সর্বোচ্চ দুটি ইয়াবা সেবন করেছিলেন। তবে মুগ্ধের জবানবন্দিতে সেদিন নয়টি ইয়াবা সেবনের কথা এসেছে। পুলিশের ধারণা, আটটি ইয়াবার পর আরও একটি সেবনের হিসাব থেকে এই পার্থক্য হয়ে থাকতে পারে।

মুগ্ধের জবানবন্দিতেও প্রায় একই বর্ণনা

মুগ্ধ দাসের আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতেও হত্যাকাণ্ডের প্রায় একই ধরনের বর্ণনা পাওয়া গেছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ২১ তারিখ রাত আনুমানিক ৩টা থেকে সাড়ে ৩টার দিকে ইয়াবা সেবনের জন্য তারা দেবুদের বাড়ির সীমানাপ্রাচীর টপকে প্রবেশ করেন। নিচতলার নির্মাণকাজ তখনো শেষ হয়নি এবং সিঁড়িতে কোনো দরজা ছিল না। ফলে সহজেই ছাদে যাতায়াত করা সম্ভব ছিল।

মুগ্ধের দাবি, সিদ্ধার্থের পরামর্শেই তারা গণপতি চক্রবর্তীর ছাদে যান। সিদ্ধার্থ তাকে জানিয়েছিলেন, এর আগেও তিনি ওই ছাদে এক-দুই দিন ইয়াবা সেবন করেছেন। এরপর পানির ট্যাংকির আড়ালে বসে তারা ইয়াবা সেবন করেন।

সাক্ষীর তথ্যও যাচাই করছে পুলিশ

পুলিশ কমিশনার জানান, হত্যাকাণ্ডের সময় চিৎকারের বিষয়ে একজন স্থানীয় নারী সাক্ষ্য দিয়েছেন। তিনি পুলিশকে তথ্য দেওয়ার পর তার স্বামী তাকে মারধর করেছেন বলেও তদন্তে জানা গেছে।

তিনি বলেন, এ ধরনের চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সাধারণ মানুষের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেউ কোনো ঘটনা শুনে বা দেখে থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তথ্য দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে এখন আসামিদের জবানবন্দি, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, ফরেনসিক তথ্যসহ বিভিন্ন আলামত মিলিয়ে দেখছে পুলিশ। ডিএনএ পরীক্ষা ও ডোপ টেস্টের ফলাফলও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


রংপুরে ৪ খুন

জবানবন্দিতে ভয়ংকর তথ্য, দুই আসামির ডিএনএ ও ডোপ টেস্ট হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৭ আগষ্ট ২০২৬ ১৩:০৮ পিএম

রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও দুই সন্তানের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে চাঞ্চল্যকর নতুন তথ্য উঠে এসেছে। গ্রেপ্তার দুই আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের জবানবন্দির ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন দিক যাচাই করছে পুলিশ। একই সঙ্গে দুই আসামির ডিএনএ পরীক্ষা ও ডোপ টেস্ট করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকাল ১০টায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরপিএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ।

পুলিশ কমিশনার জানান, একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় ময়নাতদন্ত ও তদন্তে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হবে। পাশাপাশি তাদের ডোপ টেস্টও করা হবে।

ময়নাতদন্তে কী পাওয়া গেছে

পুলিশ কমিশনার বলেন, নিহত গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থীর শরীরে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তে তাদের মৃত্যুর কারণ হিসেবে শ্বাসরোধ বা গলায় ফাঁস দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। আসামিদের দেওয়া জবানবন্দির সঙ্গে ময়নাতদন্তের এই তথ্যের মিল পাওয়া গেছে।

জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে সিদ্ধার্থ দাস জানান, তিনি একটি স্বর্ণের দোকানে কারিগর হিসেবে কাজ করেন। নিহত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির সঙ্গে তাদের বাড়ি লাগোয়া ছিল। গণপতি চক্রবর্তী যে জমিতে বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন, সেটি আগে সিদ্ধার্থের পূর্বপুরুষদের জমি ছিল বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

সিদ্ধার্থের জবানবন্দি অনুযায়ী, তিনি আগে মাঝেমধ্যে উৎসবের সময় ইয়াবা সেবন করলেও ঘটনার আগের এক মাস ধরে প্রতি বৃহস্পতিবার ইয়াবা সেবন করতেন। তার বড় ভাইয়ের বিয়ের পর বিভিন্ন কারণে প্রায় ছয়-সাত মাস তিনি বিজয় কাকুর বাসায় ঘুমাতেন এবং সেখানে খাওয়া-দাওয়াও করতেন। তবে ঘটনার আগের এক মাস তিনি প্রতি বৃহস্পতিবার সাক্ষী সীমান্তের বাসায় থাকতেন। সীমান্ত নেশা করতেন না এবং হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে কিছু জানতেন না বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘটনার রাতে কী ঘটেছিল

সিদ্ধার্থের বক্তব্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাত ১২টার পর তিনি মুগ্ধকে সঙ্গে নিয়ে সীমান্তদের বাসায় যান। সেখানে তারা ইয়াবা সেবন করেন। রাত ৩টার দিকে আরও ইয়াবা সেবনের ইচ্ছা হলে তারা মাদক ব্যবসায়ী শান্তর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন। পরে শান্তর বাড়ির সামনে থেকে আরও চারটি ইয়াবা সংগ্রহ করেন তারা। এ সময় মোবাইল ফোন বন্ধক রাখা হয়েছিল বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এরপর তারা আবার সীমান্তদের বাসায় ফিরে যান। রাত ৩টার পর সেখান থেকে বের হয়ে রাস্তায় কুকুর থাকায় সরাসরি গেট দিয়ে না গিয়ে দেয়াল টপকে পাশের দেবুদের বাড়িতে প্রবেশ করেন। পরে ওই বাড়ির ছাদ থেকে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যান। দুই ছাদের মধ্যে দূরত্ব ছিল প্রায় দুই থেকে আড়াই ফুট।

গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদের চারপাশে হাফওয়াল থাকায় বাইরে থেকে সহজে দেখা যেত না। পানির ট্যাংকির আড়ালে বসে তারা ইয়াবা সেবন করতে থাকেন। এভাবে কখন ভোর হয়ে যায়, তারা খেয়াল করেননি বলে জবানবন্দিতে উঠে এসেছে।

শিক্ষককে দেখে ফেলায় শুরু হয় হত্যাকাণ্ড

ভোরে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে হাঁটতে গিয়ে তাদের দেখে ফেলেন। তিনি তাদের ধমক দিয়ে জানতে চান, এত সকালে তারা সেখানে কী করছে। এতে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ ভয় পেয়ে যান। জবানবন্দি অনুযায়ী, তারা আশঙ্কা করেন গণপতি চক্রবর্তী চিৎকার করে বিষয়টি সবাইকে জানিয়ে দেবেন। এরপর তারা তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন।

সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ গণপতি চক্রবর্তীর গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে দুই দিক থেকে টান দেন। একপর্যায়ে তার মৃত্যু হয়। পরে ময়নাতদন্তেও শ্বাসরোধজনিত মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়।

মা-মেয়েকেও হত্যা

গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ টিন দিয়ে ঢেকে রাখার সময় শব্দ পেয়ে তার স্ত্রী ও মেয়ে ছাদে চলে আসেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তারা চিৎকার শুরু করলে মুগ্ধ তার স্ত্রীর গলা চেপে ধরেন এবং সিদ্ধার্থ মেয়ের গলা চেপে ধরেন।

পরে স্যারের স্ত্রীর গলায় থাকা গামছা ব্যবহার করে মেয়েটির গলায় প্যাঁচ দেওয়া হয়। এরপর পাশের কবুতরের খাবার রাখার বাক্স থেকে রশি নিয়ে মেয়েটির গলায় পেঁচিয়ে দুই দিক থেকে টান দেওয়া হয়। এভাবেই মা ও মেয়েকে হত্যা করা হয় বলে আসামিদের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে।

সিসিটিভির আশঙ্কায় বিদ্যুতের তার কেটে দেয়

হত্যাকাণ্ডের পর বাড়িতে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা আছে কি না, তা নিয়ে আশঙ্কায় নিচতলায় যায় দুই আসামি। সেখানে একটি পুরোনো প্লাস পেয়ে বিদ্যুতের তার কেটে দেন তারা। কোনো ক্যামেরা থাকলেও যাতে তা কাজ না করে, সে উদ্দেশ্যেই তারা তার কেটে দেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এরপর তারা আবার ছাদে ফিরে এসে মা ও মেয়ের মরদেহ এমন জায়গায় রাখেন, যাতে পাশের বাড়ির ছাদ থেকে সহজে দেখা না যায়।

শিশুকে চিনে ফেলেছিল সিদ্ধার্থ

এরপর তারা গণপতি চক্রবর্তীর ঘরে প্রবেশ করেন। সেখানে গিয়ে দেখতে পান, শিশুটি ঘুম থেকে উঠে গেছে। জবানবন্দি অনুযায়ী, শিশুটি সিদ্ধার্থকে চিনতে পেরে বলে, ‘সিদ্ধার্থ দাদা, তুমি এখানে কেন?’

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার বলেন, তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুটি ঘুমন্ত অবস্থায় ছিল বলে তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। তবে আদালতে দেওয়া আসামিদের জবানবন্দিতে ভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, শিশুটি ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধার্থকে চিনে ফেলে এবং তার নাম ধরে ডাকে।

শিশুটি চিৎকার করে অন্যদের জানিয়ে দিতে পারে—এই আশঙ্কায় তাকে হত্যা করা হয়। জবানবন্দি অনুযায়ী, কাপড় দিয়ে শিশুটির গলায় প্যাঁচ দিয়ে শ্বাসরোধ করা হয়।

এরপর ডাকাতির নাটক সাজানোর চেষ্টা

চারজনকে হত্যার পর দুই আসামি ক্লান্ত হয়ে পড়েন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন। তারা গোসল করেন এবং পরে তাদের কাছে থাকা আরেকটি ইয়াবা সেবন করেন।

এরপর মুগ্ধের মাথায় বাড়িটিকে চুরি বা ডাকাতির ঘটনা হিসেবে দেখানোর পরিকল্পনা আসে। তারা ঘরের ড্রয়ার খুলে জিনিসপত্র এলোমেলো করেন। মুগ্ধ বিভিন্ন অলংকার এনে দেন এবং সিদ্ধার্থ সেগুলো প্লাস্টিকের বাক্স ও কাপড়ের প্যাকেটে রাখেন।

বাড়ি থেকে তারা ১৫ হাজার টাকা নেন। এর মধ্যে সিদ্ধার্থ তার ভাগ হিসেবে ৩ হাজার ৫০০ টাকা পান। ওই টাকা দিয়ে তিনি মাদক ব্যবসায়ী শান্তর কাছে বন্ধক রাখা মোবাইল ফোনটি ছাড়িয়ে নেন।

স্বর্ণালংকার মাটির নিচে লুকিয়ে রাখে

জবানবন্দি অনুযায়ী, জুমার নামাজের সময় বাইরে মানুষের চলাচল কমে গেলে তারা ছাদ থেকে পাশের দেবুদের বাড়ির ছাদে যান। পরে দেয়াল টপকে বাইরে বের হয়ে যান। মুগ্ধ ১৫ হাজার টাকা নিয়ে যান। আর স্বর্ণালংকারের ব্যাগ নিয়ে সিদ্ধার্থ একটি গলিতে যান।

পরে কাউকে বুঝতে না দিয়ে পূর্ণিমা কাকির বাড়ির পেছনে মাটির নিচে স্বর্ণালংকারগুলো লুকিয়ে রাখেন সিদ্ধার্থ। বিজয় কাকা ও পূর্ণিমা কাকি এসব বিষয়ে কিছুই জানতেন না বলে জবানবন্দিতে উঠে এসেছে।

পরদিন স্বাভাবিকভাবে দোকানে যান সিদ্ধার্থ

ঘটনার পর সিদ্ধার্থ বাড়িতে গিয়ে আবার গোসল করেন। পরে মুগ্ধের কাছ থেকে নিজের ভাগের ৩ হাজার ৫০০ টাকা নেন। ওই টাকা দিয়ে বন্ধক রাখা মোবাইল ফোনটি ছাড়িয়ে নেন। পরদিন তিনি স্বাভাবিকভাবেই স্বর্ণের দোকানে কাজে যান বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে মুগ্ধ বাড়িতেই ছিলেন। পরে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।

ইয়াবা সেবনের হিসাবেও অমিল

পুলিশ কমিশনার জানান, সিদ্ধার্থের জবানবন্দি অনুযায়ী, ঘটনার দিন দুই আসামি মোট আটটি ইয়াবা সেবন করেছিলেন। এর আগে তারা একসঙ্গে সর্বোচ্চ দুটি ইয়াবা সেবন করেছিলেন। তবে মুগ্ধের জবানবন্দিতে সেদিন নয়টি ইয়াবা সেবনের কথা এসেছে। পুলিশের ধারণা, আটটি ইয়াবার পর আরও একটি সেবনের হিসাব থেকে এই পার্থক্য হয়ে থাকতে পারে।

মুগ্ধের জবানবন্দিতেও প্রায় একই বর্ণনা

মুগ্ধ দাসের আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতেও হত্যাকাণ্ডের প্রায় একই ধরনের বর্ণনা পাওয়া গেছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ২১ তারিখ রাত আনুমানিক ৩টা থেকে সাড়ে ৩টার দিকে ইয়াবা সেবনের জন্য তারা দেবুদের বাড়ির সীমানাপ্রাচীর টপকে প্রবেশ করেন। নিচতলার নির্মাণকাজ তখনো শেষ হয়নি এবং সিঁড়িতে কোনো দরজা ছিল না। ফলে সহজেই ছাদে যাতায়াত করা সম্ভব ছিল।

মুগ্ধের দাবি, সিদ্ধার্থের পরামর্শেই তারা গণপতি চক্রবর্তীর ছাদে যান। সিদ্ধার্থ তাকে জানিয়েছিলেন, এর আগেও তিনি ওই ছাদে এক-দুই দিন ইয়াবা সেবন করেছেন। এরপর পানির ট্যাংকির আড়ালে বসে তারা ইয়াবা সেবন করেন।

সাক্ষীর তথ্যও যাচাই করছে পুলিশ

পুলিশ কমিশনার জানান, হত্যাকাণ্ডের সময় চিৎকারের বিষয়ে একজন স্থানীয় নারী সাক্ষ্য দিয়েছেন। তিনি পুলিশকে তথ্য দেওয়ার পর তার স্বামী তাকে মারধর করেছেন বলেও তদন্তে জানা গেছে।

তিনি বলেন, এ ধরনের চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সাধারণ মানুষের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেউ কোনো ঘটনা শুনে বা দেখে থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তথ্য দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে এখন আসামিদের জবানবন্দি, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, ফরেনসিক তথ্যসহ বিভিন্ন আলামত মিলিয়ে দেখছে পুলিশ। ডিএনএ পরীক্ষা ও ডোপ টেস্টের ফলাফলও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর