ইরানে মার্কিন হামলার ভয়াবহতা
স্কুল-হাসপাতাল পেরিয়ে এবার বিয়ে বাড়িতেও হামলা
ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার পরিধি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি স্কুল, খেলার মাঠ, হাসপাতাল, বিমানবন্দর, পানি সরবরাহ ও জ্বালানি অবকাঠামোর মতো বেসামরিক স্থাপনাও হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
সর্বশেষ দক্ষিণ ইরানে একটি বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান চলাকালে মার্কিন হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত এবং ৬৩ জনের বেশি আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইরান।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, বুধবার ভোরে দক্ষিণাঞ্চলের কুহেস্তাক শহরের একটি বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান চলছিল। এ সময় সেখানে হামলা চালানো হয়। নিহতদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে বলে জানান তিনি।
ইরানের রেড ক্রিসেন্ট প্রকাশিত ভিডিওতে হামলার পর ঘটনাস্থলের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, একটি ভবনের দেয়াল ও জানালা ধসে পড়েছে। চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে ধ্বংসাবশেষ। পরে আহত শিশুদের হাসপাতালের ছবি প্রকাশ করে সংস্থাটি।
হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া এক শিশুর বক্তব্যও প্রচার করেছে ইরানের আধা-সরকারি ফার্স নিউজ এজেন্সি। শিশুটি জানায়, ঘটনাস্থলে যাওয়ার আগে সে যুদ্ধবিমান উড়তে দেখেছিল। এরপর হঠাৎ তীব্র বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণে ইট, পাথর ও সিমেন্টের টুকরা তার মুখ ও মাথায় আঘাত করে। সেখানে থাকা আরও অনেক বেসামরিক মানুষ আহত হন।
ইরান বলছে, বেসামরিক স্থাপনায় হামলার ঘটনা নতুন নয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই বিভিন্ন বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ করে আসছে তেহরান।
মিনাবে স্কুলে ভয়াবহ হামলা
ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটে দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমুজগান প্রদেশের মিনাব শহরে। যুদ্ধের প্রথম দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি একটি মেয়েদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলা হয়। হামলার সময় বিদ্যালয়ে ক্লাস চলছিল।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই হামলায় ১৫৬ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে প্রায় ১২০ জন স্কুলশিশু ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সংঘাত শুরুর পর এটিকে বেসামরিক মানুষের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী একক ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ওয়াশিংটনের দাবি, স্কুলটির কাছাকাছি থাকা ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের একটি নৌঘাঁটি ছিল হামলার মূল লক্ষ্য। স্কুলটি ওই ঘাঁটি থেকে প্রায় ২০০ ফুট দূরে ছিল।
তবে স্বাধীন ফরেনসিক বিশ্লেষণে ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া ধ্বংসাবশেষ পরীক্ষা করে বেলিংক্যাট ও ওপেন সোর্স মিউনিশনস পোর্টাল জানিয়েছে, সেখানে আরজিএম/ইউজিএম-১০৯ টমাহক ল্যান্ড অ্যাটাক ক্ষেপণাস্ত্রের অংশ পাওয়া গেছে। ওই সংঘাতে এ ধরনের অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রই ব্যবহার করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মার্কিন সামরিক তদন্তকারী ও জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কেউ কেউ ঘটনাটিকে ভুল লক্ষ্য শনাক্তকরণের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। পুরনো কিংবা হালনাগাদ না করা লক্ষ্য-সংক্রান্ত তথ্য এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে বলেও ধারণা করা হয়েছে।
হাজারের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত
ইরানের স্কুল সংস্কার সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ১ হাজার ৫০০টির বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি স্কুল পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে।
মে মাসের শেষ নাগাদ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তত ১৫টি স্কুল পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে এবং ১ হাজার ৫০০টির বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আগের হিসাবেও কয়েকশ থেকে প্রায় ১ হাজার ৩০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছিল।
ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মেরামত করা হয়েছে অথবা পুনর্নির্মাণের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত অনেক স্কুল ধীরে ধীরে আবার কার্যক্রম শুরু করেছে। হামলার পর দেশজুড়ে শত শত শিক্ষার্থী ও শিক্ষক নিহত বা আহত হয়েছেন বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
খেলার মাঠেও প্রাণহানি
স্কুলের পাশাপাশি ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় লামের্দ শহরের একটি স্পোর্টস সেন্টারেও হামলার ঘটনা ঘটে। সেখানে একটি নারী ভলিবল দলের সদস্যরা অনুশীলন করছিলেন বলে জানানো হয়েছে।
ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় অন্তত ২১ জন নিহত হন। হামলাটি নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে চালানো হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
হাসপাতালও রেহাই পায়নি
ইরানের আহভাজ শহরের বাঘাই বিশেষায়িত হাসপাতালও হামলার প্রভাবে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হাসপাতালটিতে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত না করলেও কাছাকাছি বিস্ফোরণের তীব্র ধাক্কায় ভবনের কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিস্ফোরণের পর হাসপাতালের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতি এতটাই নাজুক হয়ে পড়ে যে ২১১ জন শিশু ক্যানসার রোগীকে দ্রুত অন্যত্র সরিয়ে নিতে হয়। তাদের অনেকেই তখন কেমোথেরাপি নিচ্ছিল।
হামলায় কারও মৃত্যুর খবর না পাওয়া গেলেও চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশু রোগীদের চিকিৎসা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি তারা গুরুতর মানসিক আঘাতের মুখে পড়ে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এ ঘটনাকে ‘বর্বর হামলা’ এবং ‘কাপুরুষোচিত যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে উল্লেখ করে নিন্দা জানান।
তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের বক্তব্য ভিন্ন। সেন্টকম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী নির্দিষ্ট সামরিক স্থাপনাকেই লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। এসব স্থাপনার মধ্যে ইরানের আইআরজিসির কমান্ড কমপ্লেক্সও ছিল। বেসামরিক মানুষ কিংবা চিকিৎসা অবকাঠামোকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্য করা হয়নি বলেও দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
বিমানবন্দর, পানি ও জ্বালানি অবকাঠামোতেও ক্ষতি
ইরানের ইরানশাহর ও সেমনান শহরের বেসামরিক বিমানবন্দরও মার্কিন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এসব স্থাপনায় ভবনের কাঠামোগত ক্ষতির পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার খবরও পাওয়া যায়।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো আরও কয়েকটি বেসামরিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির কথা তুলে ধরেছে। এর মধ্যে দেহলোরানের একটি বোতলজাত পানি উৎপাদন কেন্দ্র, একটি আঞ্চলিক লবণমুক্তকরণ কেন্দ্র এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো রয়েছে।
বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও হামলার আওতায় এসেছে বলে বিভিন্ন পক্ষের দাবি রয়েছে।
সব মিলিয়ে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে বেসামরিক স্থাপনা ও মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। স্কুলে শিশুদের মৃত্যু, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের সরিয়ে নেওয়া, খেলার মাঠে প্রাণহানি এবং সর্বশেষ বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলার অভিযোগ— এসব ঘটনায় যুদ্ধের প্রভাব যে সামরিক স্থাপনার গণ্ডি ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষের জীবনেও গভীরভাবে আঘাত হানছে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: