ছয় মাসে ১৮ ঘটনা: একই পরিবারের ৪৭ খুন, ঘরেও কি নিরাপদ নয় মানুষ
দেশে একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে হত্যার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। গত ছয় মাসে ১৮টি ঘটনায় একই পরিবারের অন্তত ৪৭ জন নিহত হয়েছেন। কোনো ঘটনায় দুজন, কোনো ঘটনায় তিনজন, আবার কোনো ঘটনায় একই পরিবারের চার কিংবা পাঁচজন সদস্যও হত্যার শিকার হয়েছেন। এসব হত্যাকাণ্ডের বেশির ভাগই ঘটেছে বাড়ি বা নিজস্ব আবাসস্থলে।
সাম্প্রতিক সময়ে রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েকে হত্যার ঘটনা নতুন করে দেশজুড়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এর আগে গত ২৫ জুন লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মা ও তাঁর তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। দুটি ঘটনাতেই একই পরিবারের চারজন করে নিহত হয়েছেন।
গত ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে একই পরিবারের একাধিক সদস্য নিহত হওয়ার অন্তত ১৮টি ঘটনা পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় মোট ৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে পুলিশ সদর দপ্তরে একই পরিবারের একাধিক সদস্য হত্যার আলাদা কোনো পরিসংখ্যান নেই।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে কারণ হিসেবে সম্পত্তি ও জমি নিয়ে বিরোধ, মাদক, দাম্পত্য ও পারিবারিক কলহ, আর্থিক বিরোধ, প্রতিশোধ এবং প্রভাব বিস্তারের মতো বিষয় সামনে এসেছে। আবার কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এখনো স্পষ্ট নয়।
অপরাধবিষয়ক বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনাগুলোর কারণ আলাদা হলেও এর পেছনে সামাজিক ও কাঠামোগত নিরাপত্তাহীনতার যোগসূত্র রয়েছে। মাদকের সহজলভ্যতা, পারিবারিক বিরোধ, সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্ব, বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতি এবং অপরাধ দমনে দুর্বলতা সহিংসতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধবিষয়ক গবেষক তৌহিদুল হক বলেন, একেকটি হত্যাকাণ্ডের কারণ একেক রকম হলেও প্রতিটির পেছনে সামাজিক ও কাঠামোগত নিরাপত্তাহীনতার বিষয় রয়েছে। পারিবারিক বিরোধ, সম্পদ, প্রভাব ও প্রতিশোধের প্রবণতার পাশাপাশি অপরাধের দ্রুত তদন্ত ও বিচার না হওয়াও এ ধরনের সহিংসতার অন্যতম কারণ।
লক্ষ্মীপুরের রায়পুরের ঘটনায় গত ২৫ জুন শাহিনুর বেগম ও তাঁর তিন মেয়ে সাইমা আক্তার, ইকরা ও সিপাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অন্তর মজুমদার নামের এক যুবক দা হাতে ওই বাড়িতে ঢুকে হামলা চালান। ঘটনাস্থলেই দুজনের মৃত্যু হয়। পরে হাসপাতালে মারা যান আরও দুজন।
হত্যাকাণ্ডের পর পালানোর সময় স্থানীয় লোকজন অন্তর মজুমদারকে আটক করে মারধর করলে তাঁরও মৃত্যু হয়। কেন তিনি ওই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করেছিলেন, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। স্থানীয়দের দাবি, তিনি মাদকাসক্ত ছিলেন। পুলিশও মাদকের টাকার জন্য হত্যাকাণ্ডটি ঘটতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করেছিল।
রায়পুর থানার তৎকালীন ওসি শাহীন মিয়া জানিয়েছিলেন, অন্তর প্রায় সাত থেকে আট বছর ধরে মাদকাসক্ত ছিলেন। মাদকের টাকার জন্য তিনি নিজের বাবা-মাকেও মারধর করতেন।
রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর মরদেহ গত শনিবার রাতে তাদের বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে।
এ ঘটনায় দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রংপুর মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে ওই পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পরে মামলাটি থানা থেকে পুলিশের গোয়েন্দা শাখায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় গত ২৫ জুলাই স্বপন দাশ গুপ্ত ও তাঁর স্ত্রী কল্পনা দাশ গুপ্তকে হত্যার ঘটনায় তাঁদের একমাত্র ছেলে রিমন দাশ গুপ্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের দাবি, মাদকাসক্ত ও বেকার রিমনের সঙ্গে চাকরি নিয়ে বাবা-মায়ের তর্কের একপর্যায়ে হত্যাকাণ্ড ঘটে।
সিলেট নগরের রায়নগরে গত ১২ আগস্ট ব্যবসায়ী আবদুস সাত্তার, তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহপরিচারিকা তাহমিনাকে নিজ বাসায় হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় বাবুল মিয়া নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ প্রাথমিকভাবে ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিরোধকে হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে উল্লেখ করলেও নিহত দম্পতির স্বজনেরা তা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁদের পক্ষ থেকে জমি নিয়ে বিরোধের অভিযোগও করা হয়েছে।
গত ছয় মাসে একই পরিবারের একাধিক সদস্য নিহত হওয়ার আরও ঘটনা ঘটেছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। আত্রাইয়ে স্বামীর বিরুদ্ধে স্ত্রী ও সন্তান হত্যা, দিনাজপুরে ছেলেদের বিরুদ্ধে বাবা ও সৎভাই হত্যা, মানিকগঞ্জে দেবরের বিরুদ্ধে ভাবি ও ভাতিজা হত্যা, রাজধানীর কলাবাগানে স্বামীর হাতে স্ত্রী ও শাশুড়ি হত্যা এবং সুনামগঞ্জে বাবার বিরুদ্ধে দুই শিশুসন্তান হত্যার অভিযোগ এসেছে।
গাজীপুরের কাপাসিয়ায় পাঁচজন নিহত হওয়ার একটি আলোচিত ঘটনাতেও এক নারীর স্বামীকে প্রধান আসামি করা হয়েছে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৮টি ঘটনার মধ্যে মে মাসেই ঘটেছে পাঁচটি। আগস্টের প্রথম ২৪ দিনেও একই পরিবারের সদস্যদের হত্যার পাঁচটি ঘটনা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ মে ও আগস্ট—এই দুই মাসেই ১০টি ঘটনায় একই পরিবারের ২৭ জন নিহত হয়েছেন।
১৮টি ঘটনার মধ্যে ১২টিতে একই পরিবারের দুজন করে নিহত হয়েছেন। দুটি ঘটনায় তিনজন করে, তিনটি ঘটনায় চারজন করে এবং একটি ঘটনায় পাঁচজন নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনার অন্তত সাতটিতে আগে থেকে হুমকি, বিরোধ বা দ্বন্দ্বের তথ্য পাওয়া গেছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ১৮টি ঘটনার অন্তত ১৪টিই ঘটেছে বাড়ি, ভাড়া বাসা, বসতঘর বা অন্য কোনো আবাসস্থলে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, মানুষ নিজের ঘরেও কি নিরাপদ?
পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র ও সহকারী মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, নিরাপত্তাবোধ রাষ্ট্র ও নাগরিকের পারস্পরিক আস্থার বিষয়। নিরাপত্তা শুধু রাস্তায় পুলিশের উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে না। একজন মানুষ নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করেও যখন নিরাপদ বোধ করেন, তখনই প্রকৃত অর্থে আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলা যায়।
তিনি বলেন, ঘরের ভেতরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখে। এসব অপরাধের একটি অংশ ব্যক্তিগত বিরোধ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, সম্পত্তি বা আর্থিক বিরোধ এবং পূর্বশত্রুতার মতো বিষয় থেকে সংঘটিত হচ্ছে, যেগুলো অনেক সময় পুলিশের দৃশ্যমান উপস্থিতির বাইরে ঘটে।
পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, দেশে সামগ্রিক হত্যাকাণ্ডের সংখ্যাও বেড়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে হত্যা মামলা হয়েছে ২ হাজার ৭৬টি। ২০২৫ সালের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৯৪৭টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রথম সাত মাসে হত্যা মামলা বেড়েছে ১২৯টি।
পুলিশ বলছে, অপরাধ সংঘটনের পর আসামি গ্রেপ্তারের পাশাপাশি অপরাধের কারণ ও ঝুঁকি চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধেও কাজ করা হচ্ছে।
তবে বিচারহীনতা ও আইনের প্রতি আস্থার সংকটও সহিংসতা বাড়ানোর অন্যতম কারণ বলে মনে করেন অপরাধ বিশ্লেষকেরা। এমন পরিস্থিতিতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানুষ নিজেরাই আইন হাতে তুলে নিচ্ছে। গত ১৬ এপ্রিল মানিকগঞ্জে সাত বছরের এক শিশু হত্যার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সন্দেহভাজন এক কিশোরের পরিবারের ওপর হামলা চালায় বিক্ষুব্ধ লোকজন। গণপিটুনিতে ওই কিশোরের বাবা ও চাচা নিহত হন।
অপরাধবিষয়ক বিশ্লেষকদের মতে, হত্যাকাণ্ডের দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত না হলে অপরাধীদের মধ্যে শাস্তির ভয় কমে যেতে পারে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
তৌহিদুল হক বলেন, শুধু মামলা বা হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা দিয়ে মানুষের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বোঝা যায় না। রাষ্ট্রকে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে মানুষ পরিবার, প্রতিবেশী ও সমাজ—সব জায়গায় নিরাপদ বোধ করতে পারেন।
একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে হত্যার ধারাবাহিক ঘটনা তাই শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে মাদক নিয়ন্ত্রণ, পারিবারিক ও সামাজিক বিরোধের দ্রুত নিষ্পত্তি, সম্পত্তি বিরোধ নিরসন, কার্যকর তদন্ত এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার বিষয়ও সরাসরি জড়িত। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না গেলে ঘরের ভেতরেই মানুষের নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়তে পারে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: