আগস্টেই ডেঙ্গুর ভয়াবহ দাপট, সেপ্টেম্বরে আরও বড় সংকটের শঙ্কা
চলতি বছরের আগস্টেই দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার দ্রুত বাড়ছে। মাস শেষ হওয়ার আগেই প্রতিদিন হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৯০০ ছাড়িয়েছে। গত তিন বছরের পরিসংখ্যানও বলছে, আগস্টের পর সেপ্টেম্বরেই ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যুর চাপ সবচেয়ে বেশি বাড়ে। ফলে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরেও ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, ২৫ আগস্ট পর্যন্ত চলতি বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩০ হাজার ৮৩০ জন। মারা গেছেন ৮৮ জন। শুধু আগস্টের ২৫ দিনেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন বছরের মোট রোগীর প্রায় অর্ধেক এবং মারা গেছেন ৩৪ জন।
গত ২৫ আগস্ট এক দিনেই দেশে ৯০৭ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগের দিন ২৪ আগস্ট ৯৯৪ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন, যা চলতি বছরে এক দিনে সর্বোচ্চ। টানা দুই দিনে ৯০০-এর বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় সেপ্টেম্বরের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে ডেঙ্গুর মৌসুমি চরিত্র বদলে যাচ্ছে। একসময় জুলাই-আগস্টে সংক্রমণের সর্বোচ্চ চাপ দেখা গেলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আগস্ট-সেপ্টেম্বর এবং কখনো অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ স্থায়ী হচ্ছে। বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা এবং জমে থাকা পানিতে এডিস মশার প্রজনন বেড়ে যাওয়ায় বর্ষার শেষদিকে সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, আগস্টের শেষদিকে ডেঙ্গুর সংক্রমণ যেভাবে বাড়ছে, তাতে সেপ্টেম্বর নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও জমে থাকা পানির ওপর এডিস মশার প্রজনন অনেকটা নির্ভর করে। তাই এখন সবচেয়ে জরুরি এডিসের প্রজননস্থল ধ্বংস করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর মশা নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, শুধু ওষুধ ছিটিয়ে কিংবা হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়িয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। মানুষকে সম্পৃক্ত করে সামাজিকভাবে মশা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিতে হবে।
গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানও সেপ্টেম্বরের ভয়াবহতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২৩ সালে আগস্টে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৭১ হাজার ৯৭৬ জন এবং মারা গিয়েছিলেন ৩৪২ জন। সেপ্টেম্বরে রোগী বেড়ে দাঁড়ায় ৭৯ হাজার ৫৯৮ জনে এবং মৃত্যু হয় ৩৯৬ জনের। অর্থাৎ আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে রোগী বেড়েছিল প্রায় ১১ শতাংশ এবং মৃত্যু প্রায় ১৬ শতাংশ।
২০২৪ সালেও আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যু ব্যাপকভাবে বেড়েছিল। ওই বছরের জুলাইয়ে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ২ হাজার ৬৬৯ জন এবং মারা যান ১২ জন। আগস্টে রোগী বেড়ে দাঁড়ায় ৬ হাজার ৫২১ জনে, মৃত্যু হয় ২৭ জনের। সেপ্টেম্বরে এক লাফে রোগী বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ হাজার ৯৭ জনে এবং মৃত্যু হয় ৮০ জনের।
অর্থাৎ ২০২৪ সালের আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু রোগী বেড়েছিল প্রায় ১৭৭ শতাংশ। মৃত্যু বেড়েছিল প্রায় ১৯৬ শতাংশ। ওই বছরের সেপ্টেম্বরেই সর্বোচ্চ মাসিক মৃত্যু রেকর্ড হয়।
২০২৫ সালেও একই প্রবণতা দেখা যায়। আগস্টে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ১০ হাজার ৪৯৬ জন এবং মৃত্যু হয় ৩৯ জনের। সেপ্টেম্বরে রোগী বেড়ে প্রায় ১৫ হাজার ৯০০ জনে পৌঁছে এবং মৃত্যু হয় ৭৬ জনের। অর্থাৎ মাত্র এক মাসের ব্যবধানে মৃত্যু প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। সেপ্টেম্বরেই ওই বছরের সর্বোচ্চ মাসিক মৃত্যু রেকর্ড হয়।
চলতি বছরের পরিস্থিতি তাই বিশেষ উদ্বেগ তৈরি করছে। ২০২৫ সালের ২৫ আগস্ট পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ২৯ হাজার ৪৪ জন। চলতি বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩০ হাজার ৮৩০ জন। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এবার একই সময়ে রোগী বেড়েছে ১ হাজার ৭৮৬ জন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, আগস্টের পর ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যুর চাপ বেড়ে যেতে পারে। কোথায় মশা বাড়ছে এবং কোথায় রোগী বাড়ছে, তা নিয়মিত নজরদারির আওতায় আনতে হবে।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু এখন আর শুধু ঢাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তাই স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকেও বিকেন্দ্রীভূত করতে হবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দ্রুত পরীক্ষা, চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে বাসাবাড়ি, পাড়া-মহল্লা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে মানুষকে যুক্ত করতে হবে।
ডেঙ্গুর বিস্তার এখন রাজধানীর বাইরেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। গত ২৪ আগস্ট এক দিনে সবচেয়ে বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন খুলনা বিভাগে ২১৫ জন। বরিশালে ভর্তি হয়েছেন ১১৭ জন, চট্টগ্রামে ১০৭ জন। এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১২৬ জন, ঢাকা বিভাগের সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকায় ১৫৮ জন এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ৯৭ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
ফলে সেপ্টেম্বরের শুরুতে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকলে রাজধানীর পাশাপাশি জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতেও রোগীর চাপ দ্রুত বাড়তে পারে। বিশেষ করে খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রামসহ ঢাকার বাইরের এলাকাগুলোতে চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু হাসপাতাল প্রস্তুত রাখলে হবে না। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত নজরদারি, স্থানীয় পর্যায়ে মশা নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসার সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন।
তাদের মতে, থেমে থেমে বৃষ্টি হলে বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার প্রজনন বাড়তে পারে। বর্ষার শেষদিকে আবহাওয়া ও পরিবেশগত পরিস্থিতি এডিসের বিস্তারের জন্য অনুকূল হলে সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকেই রোগীর সংখ্যা আরও দ্রুত বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কোনো একক সংস্থার দায়িত্ব নয়। স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মস্থল এবং সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে বাড়ি, ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আশপাশের জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণ না করা গেলে সামনে সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
চলতি বছরের আগস্টের শেষ সপ্তাহে ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা এবং আগের তিন বছরের সেপ্টেম্বরের পরিসংখ্যান একসঙ্গে বিবেচনায় নিলে আগামী মাসে বড় ধরনের সংক্রমণের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এখনই কার্যকর মশা নিয়ন্ত্রণ ও রোগ প্রতিরোধে জোর দেওয়া না হলে সেপ্টেম্বরেই ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: