রাজধানীতে সরকারি পিআইসিইউ মাত্র ৪৩, হাসপাতাল ঘুরেও বাঁচছে না মুমূর্ষু শিশুর প্রাণ
ঢাকায় মুমূর্ষু শিশুদের জীবন বাঁচাতে প্রয়োজনীয় পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট বা পিআইসিইউর সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। রাজধানীর সরকারি ও আধা সরকারি পর্যায়ের মাত্র চারটি বড় হাসপাতালে পিআইসিইউ শয্যা রয়েছে ৪৩টি। বিপুলসংখ্যক গুরুতর অসুস্থ শিশুর তুলনায় এই সংখ্যা অত্যন্ত অপ্রতুল। ফলে সংকটাপন্ন শিশুদের নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটছেন স্বজনেরা।
অনেক ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত পিআইসিইউ শয্যা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে শিশুরা।
এর সাম্প্রতিক উদাহরণ ছয় মাস বয়সী শিশু আফিয়া। হাম ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত আফিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তার জন্য জরুরি ভিত্তিতে পিআইসিইউ শয্যা প্রয়োজন হয়। গত ৯ আগস্ট ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে দুই দিন ধরে রাজধানীর চারটি মেডিকেল কলেজসহ ছয়টি সরকারি হাসপাতালে ঘুরেও আফিয়ার জন্য একটি পিআইসিইউ শয্যা জোগাড় করতে পারেননি স্বজনেরা। বেসরকারি হাসপাতালে উচ্চমূল্যের পিআইসিইউ সেবা নেওয়ার সামর্থ্যও ছিল না পরিবারের।
শুধু আফিয়া নয়, রাজধানীতে প্রতিদিনই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন গুরুতর অসুস্থ শিশুদের স্বজনেরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের জন্য নিবিড় পরিচর্যা ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে সংকট আরও তীব্র হতে পারে।
রাজধানীতে সরকারি পিআইসিইউ মাত্র ৪৩টি
চিকিৎসাসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, জন্মের পর প্রথম ২৮ দিন বয়সী নবজাতকদের জন্য প্রয়োজন হয় নিওনেটাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট বা এনআইসিইউ। আর এক মাস থেকে সাধারণত ১২ বছর বয়সী অথবা ৫০ কেজির কম ওজনের শিশুদের জন্য প্রয়োজন হয় পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট বা পিআইসিইউ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ব্যবস্থাপনা তথ্য ব্যবস্থাপনা শাখায় রাজধানীসহ সারাদেশে ঠিক কতটি পিআইসিইউ রয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল ইলেকট্রো মেডিকেল ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশের সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা রয়েছে ১ হাজার ৬২০টি।
২০২২ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত ‘ক্রিটিক্যাল কেয়ার বেড ক্যাপাসিটি অব বাংলাদেশ: আ প্রি অ্যান্ড পোস্ট কোভিড-১৯ প্যানডেমিক সার্ভে’ প্রতিবেদনে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে দেশে আইসিইউ শয্যার সংখ্যা ২ হাজার ৮৫৬টি বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, বর্তমানে দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে আইসিইউ শয্যা প্রায় ৩ হাজারের কাছাকাছি। এর মধ্যে প্রায় ২৫ শতাংশ এনআইসিইউ হলেও পিআইসিইউ শয্যার হার মাত্র ৩ শতাংশ। অর্থাৎ শিশুদের জন্য নিবিড় পরিচর্যার সক্ষমতা এখনো অত্যন্ত সীমিত।
ঢাকার বড় সরকারি ও আধা সরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে পিআইসিইউ রয়েছে মাত্র কয়েকটিতে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৭টি, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ১৬টি এবং মাতুয়াইল শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে ১০টি পিআইসিইউ শয্যা রয়েছে। এ ছাড়া পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালে অননুমোদিতভাবে পাঁচটি পিআইসিইউ শয্যা চালু রয়েছে। সেখানে পর্যাপ্ত জনবলও নেই।
সব মিলিয়ে রাজধানীর সরকারি ও আধা সরকারি পর্যায়ে অনুমোদিত ও অননুমোদিত পিআইসিইউ শয্যা মাত্র ৪৩টি।
পিআইসিইউ নেই বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়েও
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরির অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়েও এখনো পিআইসিইউ চালু হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে সেখানে শিশুদের জন্য নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
২০২৪ সালের ১৩ জুলাই তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ডা. দীন মোহাম্মদ নূরুল হক যেকোনো মূল্যে পিআইসিইউ চালুর ঘোষণা দিয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন শিশু বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট জনবল ব্যবহার করে এই সেবা চালুর পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছিল। কিন্তু দুই বছর পেরিয়ে গেলেও পিআইসিইউ চালু হয়নি।
সর্বশেষ গত ২৩ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ কমিটির ১২১তম সভায় পিআইসিইউ প্রতিষ্ঠার বিষয়টি আলোচনায় আসে। তবে এখনো চূড়ান্তভাবে সেবা চালুর সিদ্ধান্ত হয়নি।
এদিকে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে চার শয্যার একটি পিআইসিইউ প্রস্তুত করা হচ্ছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে।
হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছুটছেন স্বজনেরা
চিকিৎসক ও রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে শুধু ঢাকার রোগীই নয়, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে সংকটাপন্ন শিশুদের নিয়ে আসেন স্বজনেরা। সন্তানের জীবন বাঁচানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে রাজধানীমুখী হলেও এখানে এসে পিআইসিইউ সংকটে পড়তে হচ্ছে তাদের।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. আসাদুজ্জামান বলেন, তাদের হাসপাতালে ১৭টি পিআইসিইউ শয্যা রয়েছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় এই সংখ্যা অনেক কম। এক মাস থেকে ১২ বছর বয়সী বিপুলসংখ্যক শিশুর জন্য এত কম শয্যা দিয়ে চিকিৎসা দেওয়া কঠিন।
তিনি বলেন, পিআইসিইউ শয্যা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। তবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জায়গার সংকট থাকায় নতুন করে শয্যা বাড়ানোর সুযোগও সীমিত। সম্প্রসারণের একটি প্রকল্প নেওয়া হলেও পর্যাপ্ত জায়গা না পাওয়ায় তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
তার মতে, তৃতীয় স্তরের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হাসপাতালগুলোতে পিআইসিইউ থাকা জরুরি এবং যেসব হাসপাতালে সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে, সেখানে আরও বেশি শয্যা স্থাপন করা প্রয়োজন।
বেসরকারি হাসপাতালেও সংকট
পিআইসিইউ সংকট শুধু সরকারি হাসপাতালেই সীমাবদ্ধ নয়। রাজধানীর বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও চাহিদার তুলনায় পিআইসিইউ শয্যা কম। ফলে সরকারি হাসপাতালে শয্যা না পেয়ে অনেক পরিবার বেসরকারি হাসপাতালে যাওয়ার চেষ্টা করলেও উচ্চ খরচের কারণে তা সম্ভব হয় না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসমিম পামী বলেন, ঢাকায় সরকারি-বেসরকারি উভয় পর্যায়েই পিআইসিইউ সংকট রয়েছে। একই সঙ্গে সারাদেশেও আইসিইউর ঘাটতি রয়েছে।
তিনি জানান, মেডিকেল কলেজ ও জেলা পর্যায়ে আইসিইউ সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে সেখানে শিশুদের জন্য কতটি শয্যা থাকবে, তা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল সার্ভিসেস ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সাবেক লাইন ডিরেক্টর ডা. জয়নাল আবেদীন টিটো বলেন, শুধু পিআইসিইউ স্থাপন করলেই হবে না। এর জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত অবকাঠামো, চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী। জনগোষ্ঠীর আকার বিবেচনায় নিয়ে হাসপাতাল ও চিকিৎসা অবকাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন।
শিশু মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে আইসিইউ সংকট
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড হেলথে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বাংলাদেশের হাম পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে গুরুতর শিশুদের নিবিড় পরিচর্যা সুবিধার ঘাটতির বিষয়টি উঠে এসেছে। গবেষণা অনুযায়ী, হামে মৃত্যুবরণ করা ৭১ শতাংশ শিশুর শেষ মুহূর্তে জীবনরক্ষাকারী আইসিইউ সুবিধা পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গুরুতর অবস্থায় শিশুকে দ্রুত পিআইসিইউতে নেওয়া সম্ভব না হলে চিকিৎসার সুযোগ অনেকাংশে কমে যায়। বিশেষ করে হাম, নিউমোনিয়া, ডেঙ্গু, মস্তিষ্কের সংক্রমণসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে সময়মতো নিবিড় পরিচর্যা জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান তৈরি করতে পারে।
প্রতিরোধে জোর দেওয়ার পরামর্শ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসমিম পামী বলেন, গুরুতর অবস্থায় রোগীকে আইসিইউতে নেওয়ার আগেই রোগ প্রতিরোধ ও প্রাথমিক চিকিৎসা জোরদার করা দরকার। উপজেলা ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পর্যায়ে রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা নিশ্চিত করে প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত রেফারালের ব্যবস্থা করতে হবে।
তিনি বলেন, প্রাথমিক পর্যায়েই রোগ প্রতিরোধ করা গেলে অনেক শিশুকে সংকটাপন্ন অবস্থায় তৃতীয় স্তরের হাসপাতালে পাঠানোর প্রয়োজন কমবে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, রাজধানীসহ সারাদেশেই চাহিদার তুলনায় পিআইসিইউ শয্যা কম। সরকার এ সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। বিভিন্ন হাসপাতালে এনআইসিইউ ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে এবং এসব ভবনে পিআইসিইউ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। দ্রুত এসব প্রকল্প টেন্ডারে যাওয়ার কথা রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পনা ও প্রকল্পের পাশাপাশি দ্রুত বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে জরুরি। কারণ সংকটাপন্ন শিশুর জন্য একটি পিআইসিইউ শয্যা কেবল একটি হাসপাতালসেবা নয়, অনেক ক্ষেত্রে সেটিই হয়ে ওঠে জীবন বাঁচানোর শেষ সুযোগ।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: