infoamaderdin@gmail.com বৃহঃস্পতিবার, ৬ আগস্ট ২০২৬
২২ শ্রাবণ ১৪৩৩

চট্টগ্রামে দূরপাল্লার বাস থেকে সন্দেহজনক ব্যাগ উদ্ধার

পুলিশের বিরুদ্ধে ‘লাখ ইয়াবা আত্মসাতের’ অভিযোগে সিএমপির তদন্ত; জব্দ তালিকায় মাত্র ৪০০ পিস

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৬ আগষ্ট ২০২৬ ১৬:০৮ পিএম

চট্টগ্রাম নগরের সিটি গেট পুলিশ চেকপোস্টে একটি দূরপাল্লার বাস থেকে উদ্ধার হওয়া সন্দেহজনক একটি ব্যাগকে ঘিরে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। প্রথমে ব্যাগ উদ্ধারের বিষয়টি অস্বীকার করলেও পরে ৪০০ পিস ইয়াবা উদ্ধারের দাবি করেছে পুলিশ। তবে জব্দ তালিকার তথ্য, সাক্ষীর বক্তব্য এবং সিসিটিভি ফুটেজে উঠে আসা তথ্যের মধ্যে অসংগতি দেখা দেওয়ায় ঘটনাটি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)।

অভিযোগ উঠেছে, গত ৪ জুন কক্সবাজার থেকে আসা একটি বাস থেকে উদ্ধার হওয়া ব্যাগে আনুমানিক এক লাখ পিস ইয়াবা ছিল। সেই ইয়াবার বড় অংশ আত্মসাৎ করে ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে পরবর্তীতে মাত্র ৪০০ পিস ইয়াবা উদ্ধারের গল্প সাজানো হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সিএমপির একটি তদন্ত কমিটি কাজ করছে।

সিসিটিভিতে ব্যাগ নেওয়ার দৃশ্য

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ জুন বিকেল ৫টা ৫৬ মিনিটে কক্সবাজার থেকে ছেড়ে আসা সোহাগ পরিবহনের একটি স্ক্যানিয়া বাস চট্টগ্রামের সিটি গেট পুলিশ চেকপোস্টে থামে। কাছের একটি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১২ মিনিট ৩৩ সেকেন্ডের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সন্ধ্যা ৬টা ১ মিনিটে বাসের লাগেজ বক্স থেকে একটি বড় খয়েরি রঙের ব্যাগ নামিয়ে রাখা হয়।

ব্যাগটির মালিককে শনাক্ত করা না গেলে আকবরশাহ থানার এএসআই আরিফ সেটি হাতে নিয়ে চেকপোস্টের দিকে চলে যান। ফুটেজে এসআই সাজ্জাদ ও এএসআই মেজবাহ উদ্দিনকেও সেখানে দেখা যায়। তবে সরকারি ডিউটি রোস্টার অনুযায়ী, ওই সময়ে এএসআই আরিফের চেকপোস্টে দায়িত্ব ছিল না।

বাসের যাত্রী নিখোঁজ, ব্যাগ রেখে যায় পুলিশ

সোহাগ পরিবহনের সুপারভাইজার মোহাম্মদ হাছান জানান, বাসে থাকা সব যাত্রী নিজেদের লাগেজ নিয়ে নিলেও একটি ব্যাগের কোনো দাবিদার পাওয়া যায়নি। লাগেজ ট্যাগ মিলিয়ে সংশ্লিষ্ট যাত্রীর আসনে গিয়ে দেখা যায়, তিনি বাসে নেই।

তিনি বলেন, বিষয়টি পুলিশকে জানানো হলে তারা তাঁর মোবাইল নম্বর রেখে ব্যাগটি নিজেদের জিম্মায় নেয়। পরে ২৭ জন যাত্রী নিয়ে বাসটি ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। তাঁর দাবি, ব্যাগটি তাঁর সামনে খোলা হয়নি।

জব্দ তালিকা নিয়ে নতুন প্রশ্ন

ঘটনার পর পুলিশ প্রথমে বাস থেকে কোনো ব্যাগ উদ্ধার বা ইয়াবা পাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করলেও পরে দাবি করে, ওই দিন ৪০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।

তবে বর্তমানে পুলিশের দেখানো জব্দ তালিকায় বাসের সুপারভাইজার মোহাম্মদ হাছানের নাম ও স্বাক্ষর থাকলেও তিনি তদন্ত কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, তিনি ওই তালিকায় স্বাক্ষর করেননি এবং ব্যাগ খোলার সময়ও উপস্থিত ছিলেন না।

ব্যাগ হোটেল ও বাসায় নেওয়ার অভিযোগ

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, বাস থেকে উদ্ধার হওয়া তালাবদ্ধ ব্যাগটি প্রথমে নগরের একটি আবাসিক হোটেলে এবং পরে আকবরশাহ এলাকার নন্দন হাউজিংয়ের একটি বাসায় নেওয়া হয়। এরপর সেটি থানায় হস্তান্তর করা হয়। এই অভিযোগও তদন্তের আওতায় রয়েছে।

অভিযুক্তদের বক্তব্য

ঘটনার দিন চেকপোস্ট ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন এসআই সাজ্জাদ। তাঁর সঙ্গে এএসআই মেজবাহ উদ্দিন, কনস্টেবল মো. মোমিন এবং আরও কয়েকজন সদস্য দায়িত্ব পালন করছিলেন। দায়িত্বে না থাকলেও এএসআই আরিফ ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এসআই সাজ্জাদ প্রথমে দাবি করেন, ওই দিন তাঁর কোনো ডিউটি ছিল না। পরে দায়িত্ব বণ্টনের নথিতে তাঁর নাম পাওয়া গেলে এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করেননি।

এএসআই মেজবাহ বলেন, সেদিন কোনো বাস থেকে ব্যাগ উদ্ধার হয়নি। তাঁর দাবি, পুলিশকে বিতর্কিত করতেই এসব তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।

অন্যদিকে সিসিটিভিতে ব্যাগ বহন করতে দেখা যাওয়া এএসআই আরিফ প্রথমে বলেন, তিনি ওই সময় কর্নেলহাট এলাকায় দায়িত্বে ছিলেন। পরে জানান, একটি ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিকে ধরতে গিয়ে তিনি চেকপোস্ট এলাকায় গিয়েছিলেন।

তদন্তে সিএমপি

ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার পদমর্যাদার এক কর্মকর্তার নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

সিএমপির অতিরিক্ত উপকমিশনার আবদুল্লাহ মোহাম্মদ শেখ সাদী বলেন, অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত চলছে এবং সেটি শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থাসহ কঠোর আইনগত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

 

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


চট্টগ্রামে দূরপাল্লার বাস থেকে সন্দেহজনক ব্যাগ উদ্ধার

পুলিশের বিরুদ্ধে ‘লাখ ইয়াবা আত্মসাতের’ অভিযোগে সিএমপির তদন্ত; জব্দ তালিকায় মাত্র ৪০০ পিস

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৬ আগষ্ট ২০২৬ ১৬:০৮ পিএম

চট্টগ্রাম নগরের সিটি গেট পুলিশ চেকপোস্টে একটি দূরপাল্লার বাস থেকে উদ্ধার হওয়া সন্দেহজনক একটি ব্যাগকে ঘিরে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। প্রথমে ব্যাগ উদ্ধারের বিষয়টি অস্বীকার করলেও পরে ৪০০ পিস ইয়াবা উদ্ধারের দাবি করেছে পুলিশ। তবে জব্দ তালিকার তথ্য, সাক্ষীর বক্তব্য এবং সিসিটিভি ফুটেজে উঠে আসা তথ্যের মধ্যে অসংগতি দেখা দেওয়ায় ঘটনাটি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)।

অভিযোগ উঠেছে, গত ৪ জুন কক্সবাজার থেকে আসা একটি বাস থেকে উদ্ধার হওয়া ব্যাগে আনুমানিক এক লাখ পিস ইয়াবা ছিল। সেই ইয়াবার বড় অংশ আত্মসাৎ করে ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে পরবর্তীতে মাত্র ৪০০ পিস ইয়াবা উদ্ধারের গল্প সাজানো হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সিএমপির একটি তদন্ত কমিটি কাজ করছে।

সিসিটিভিতে ব্যাগ নেওয়ার দৃশ্য

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ জুন বিকেল ৫টা ৫৬ মিনিটে কক্সবাজার থেকে ছেড়ে আসা সোহাগ পরিবহনের একটি স্ক্যানিয়া বাস চট্টগ্রামের সিটি গেট পুলিশ চেকপোস্টে থামে। কাছের একটি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১২ মিনিট ৩৩ সেকেন্ডের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সন্ধ্যা ৬টা ১ মিনিটে বাসের লাগেজ বক্স থেকে একটি বড় খয়েরি রঙের ব্যাগ নামিয়ে রাখা হয়।

ব্যাগটির মালিককে শনাক্ত করা না গেলে আকবরশাহ থানার এএসআই আরিফ সেটি হাতে নিয়ে চেকপোস্টের দিকে চলে যান। ফুটেজে এসআই সাজ্জাদ ও এএসআই মেজবাহ উদ্দিনকেও সেখানে দেখা যায়। তবে সরকারি ডিউটি রোস্টার অনুযায়ী, ওই সময়ে এএসআই আরিফের চেকপোস্টে দায়িত্ব ছিল না।

বাসের যাত্রী নিখোঁজ, ব্যাগ রেখে যায় পুলিশ

সোহাগ পরিবহনের সুপারভাইজার মোহাম্মদ হাছান জানান, বাসে থাকা সব যাত্রী নিজেদের লাগেজ নিয়ে নিলেও একটি ব্যাগের কোনো দাবিদার পাওয়া যায়নি। লাগেজ ট্যাগ মিলিয়ে সংশ্লিষ্ট যাত্রীর আসনে গিয়ে দেখা যায়, তিনি বাসে নেই।

তিনি বলেন, বিষয়টি পুলিশকে জানানো হলে তারা তাঁর মোবাইল নম্বর রেখে ব্যাগটি নিজেদের জিম্মায় নেয়। পরে ২৭ জন যাত্রী নিয়ে বাসটি ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। তাঁর দাবি, ব্যাগটি তাঁর সামনে খোলা হয়নি।

জব্দ তালিকা নিয়ে নতুন প্রশ্ন

ঘটনার পর পুলিশ প্রথমে বাস থেকে কোনো ব্যাগ উদ্ধার বা ইয়াবা পাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করলেও পরে দাবি করে, ওই দিন ৪০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।

তবে বর্তমানে পুলিশের দেখানো জব্দ তালিকায় বাসের সুপারভাইজার মোহাম্মদ হাছানের নাম ও স্বাক্ষর থাকলেও তিনি তদন্ত কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, তিনি ওই তালিকায় স্বাক্ষর করেননি এবং ব্যাগ খোলার সময়ও উপস্থিত ছিলেন না।

ব্যাগ হোটেল ও বাসায় নেওয়ার অভিযোগ

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, বাস থেকে উদ্ধার হওয়া তালাবদ্ধ ব্যাগটি প্রথমে নগরের একটি আবাসিক হোটেলে এবং পরে আকবরশাহ এলাকার নন্দন হাউজিংয়ের একটি বাসায় নেওয়া হয়। এরপর সেটি থানায় হস্তান্তর করা হয়। এই অভিযোগও তদন্তের আওতায় রয়েছে।

অভিযুক্তদের বক্তব্য

ঘটনার দিন চেকপোস্ট ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন এসআই সাজ্জাদ। তাঁর সঙ্গে এএসআই মেজবাহ উদ্দিন, কনস্টেবল মো. মোমিন এবং আরও কয়েকজন সদস্য দায়িত্ব পালন করছিলেন। দায়িত্বে না থাকলেও এএসআই আরিফ ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এসআই সাজ্জাদ প্রথমে দাবি করেন, ওই দিন তাঁর কোনো ডিউটি ছিল না। পরে দায়িত্ব বণ্টনের নথিতে তাঁর নাম পাওয়া গেলে এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করেননি।

এএসআই মেজবাহ বলেন, সেদিন কোনো বাস থেকে ব্যাগ উদ্ধার হয়নি। তাঁর দাবি, পুলিশকে বিতর্কিত করতেই এসব তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।

অন্যদিকে সিসিটিভিতে ব্যাগ বহন করতে দেখা যাওয়া এএসআই আরিফ প্রথমে বলেন, তিনি ওই সময় কর্নেলহাট এলাকায় দায়িত্বে ছিলেন। পরে জানান, একটি ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিকে ধরতে গিয়ে তিনি চেকপোস্ট এলাকায় গিয়েছিলেন।

তদন্তে সিএমপি

ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার পদমর্যাদার এক কর্মকর্তার নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

সিএমপির অতিরিক্ত উপকমিশনার আবদুল্লাহ মোহাম্মদ শেখ সাদী বলেন, অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত চলছে এবং সেটি শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থাসহ কঠোর আইনগত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

 

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর