infoamaderdin@gmail.com সোমবার, ৩ আগস্ট ২০২৬
১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩

চট্টগ্রামে ভয়াবহ গ্যাস সংকট: নিভেছে চুলা, কমেছে শিল্প উৎপাদন, বেড়েছে লোডশেডিং

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৩ আগষ্ট ২০২৬ ১২:০৮ পিএম

চট্টগ্রামে গ্যাস সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করায় জনজীবন, শিল্প উৎপাদন, পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যাপক স্থবিরতা নেমে এসেছে। বাসাবাড়িতে দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাস না থাকায় রান্না ব্যাহত হচ্ছে।

একই সঙ্গে শিল্প-কারখানায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদন ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি সংকটের কারণে বেড়েছে লোডশেডিং, আর সিএনজি স্টেশনগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস পাচ্ছেন না চালকেরা।

কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রামে দৈনিক স্বাভাবিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে বর্তমানে জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় চাহিদার তুলনায় অনেক কম গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। আগস্টের শুরু থেকে পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ায় আবাসিক ও শিল্প—উভয় খাতেই তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

নগরীর হালিশহর, আগ্রাবাদ, চান্দগাঁও, চকবাজার, বাকলিয়া, পতেঙ্গাসহ অধিকাংশ এলাকায় ভোরের পর থেকেই গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যে নেমে আসে। ফলে অনেক পরিবারকে দুপুরের খাবার রান্না করতে হচ্ছে বিকেল কিংবা গভীর রাতে। অনেকেই বাধ্য হয়ে হোটেল-রেস্তোরাঁর খাবারের ওপর নির্ভর করছেন।

আসকার দিঘির পাড় এলাকার বাসিন্দা ইশরাত জাহান বলেন, এক সপ্তাহ ধরে পরিবারের খাবারের কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। সকালে গ্যাস চলে যাওয়ার পর দুপুরে রান্না করা সম্ভব হয় না। শিশুদের নিয়মিত বাইরের খাবার খাওয়াতে হচ্ছে, যা নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন তারা।

সিএনজি স্টেশনগুলোতেও একই ধরনের দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেক চালক গ্যাস না নিয়েই ফিরে যাচ্ছেন। মইজ্জার টেক এলাকার অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ ফরহাদ আলম বলেন, আগে ১০ থেকে ২০ মিনিটে গ্যাস পাওয়া গেলেও এখন চার ঘণ্টা অপেক্ষার পরও গ্যাস মেলে না। এতে আয় কমে যাওয়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে শিল্প খাতে। কেজিডিসিএল সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানাসহ (সিইউএফএল) বিভিন্ন বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। অনেক কারখানা নির্ধারিত সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম উৎপাদন করছে। ফলে রপ্তানিমুখী শিল্প, ইস্পাত, টেক্সটাইল ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাত আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

অন্যদিকে গ্যাসের স্বল্পতায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে চট্টগ্রামসহ আশপাশের এলাকায় লোডশেডিং বেড়েছে। শিল্পাঞ্চল ও আবাসিক এলাকায় দিনের বিভিন্ন সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ভোগান্তি আরও তীব্র হয়েছে।

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) সভাপতি আমিরুল হক বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে শিল্প উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে, আবার কোথাও কোথাও সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখার পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে। এতে রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন, সময়মতো পণ্য সরবরাহ এবং উৎপাদন ব্যয়—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তিনি দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের আহ্বান জানান।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর জাতীয় গ্রিডে রিগ্যাসিফিকেশন ও গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। আগে যেখানে প্রতিদিন প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো, তা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে গ্যাস ঘাটতি তৈরি হওয়ায় চট্টগ্রামের জন্য বরাদ্দের একটি বড় অংশ ঢাকার চাহিদা পূরণে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এতে চট্টগ্রামে সংকট আরও প্রকট হয়েছে।

কেজিডিসিএলের মহাব্যবস্থাপক (ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিস ডিভিশন) প্রকৌশলী মো. তাজউদ্দিন ঢালী বলেন, জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। সীমিত সরবরাহ রেশনিংয়ের মাধ্যমে বিতরণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল পুরোপুরি মেরামত করে পুনরায় চালু করতে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান আগামী ১০ আগস্ট পর্যন্ত সময় চেয়েছে। ফলে টার্মিনালটি চালু না হওয়া এবং জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রামের গ্যাস সংকট দ্রুত কাটার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


চট্টগ্রামে ভয়াবহ গ্যাস সংকট: নিভেছে চুলা, কমেছে শিল্প উৎপাদন, বেড়েছে লোডশেডিং

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৩ আগষ্ট ২০২৬ ১২:০৮ পিএম

চট্টগ্রামে গ্যাস সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করায় জনজীবন, শিল্প উৎপাদন, পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যাপক স্থবিরতা নেমে এসেছে। বাসাবাড়িতে দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাস না থাকায় রান্না ব্যাহত হচ্ছে।

একই সঙ্গে শিল্প-কারখানায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদন ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি সংকটের কারণে বেড়েছে লোডশেডিং, আর সিএনজি স্টেশনগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস পাচ্ছেন না চালকেরা।

কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রামে দৈনিক স্বাভাবিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে বর্তমানে জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় চাহিদার তুলনায় অনেক কম গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। আগস্টের শুরু থেকে পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ায় আবাসিক ও শিল্প—উভয় খাতেই তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

নগরীর হালিশহর, আগ্রাবাদ, চান্দগাঁও, চকবাজার, বাকলিয়া, পতেঙ্গাসহ অধিকাংশ এলাকায় ভোরের পর থেকেই গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যে নেমে আসে। ফলে অনেক পরিবারকে দুপুরের খাবার রান্না করতে হচ্ছে বিকেল কিংবা গভীর রাতে। অনেকেই বাধ্য হয়ে হোটেল-রেস্তোরাঁর খাবারের ওপর নির্ভর করছেন।

আসকার দিঘির পাড় এলাকার বাসিন্দা ইশরাত জাহান বলেন, এক সপ্তাহ ধরে পরিবারের খাবারের কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। সকালে গ্যাস চলে যাওয়ার পর দুপুরে রান্না করা সম্ভব হয় না। শিশুদের নিয়মিত বাইরের খাবার খাওয়াতে হচ্ছে, যা নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন তারা।

সিএনজি স্টেশনগুলোতেও একই ধরনের দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেক চালক গ্যাস না নিয়েই ফিরে যাচ্ছেন। মইজ্জার টেক এলাকার অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ ফরহাদ আলম বলেন, আগে ১০ থেকে ২০ মিনিটে গ্যাস পাওয়া গেলেও এখন চার ঘণ্টা অপেক্ষার পরও গ্যাস মেলে না। এতে আয় কমে যাওয়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে শিল্প খাতে। কেজিডিসিএল সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানাসহ (সিইউএফএল) বিভিন্ন বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। অনেক কারখানা নির্ধারিত সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম উৎপাদন করছে। ফলে রপ্তানিমুখী শিল্প, ইস্পাত, টেক্সটাইল ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাত আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

অন্যদিকে গ্যাসের স্বল্পতায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে চট্টগ্রামসহ আশপাশের এলাকায় লোডশেডিং বেড়েছে। শিল্পাঞ্চল ও আবাসিক এলাকায় দিনের বিভিন্ন সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ভোগান্তি আরও তীব্র হয়েছে।

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) সভাপতি আমিরুল হক বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে শিল্প উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে, আবার কোথাও কোথাও সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখার পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে। এতে রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন, সময়মতো পণ্য সরবরাহ এবং উৎপাদন ব্যয়—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তিনি দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের আহ্বান জানান।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর জাতীয় গ্রিডে রিগ্যাসিফিকেশন ও গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। আগে যেখানে প্রতিদিন প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো, তা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে গ্যাস ঘাটতি তৈরি হওয়ায় চট্টগ্রামের জন্য বরাদ্দের একটি বড় অংশ ঢাকার চাহিদা পূরণে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এতে চট্টগ্রামে সংকট আরও প্রকট হয়েছে।

কেজিডিসিএলের মহাব্যবস্থাপক (ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিস ডিভিশন) প্রকৌশলী মো. তাজউদ্দিন ঢালী বলেন, জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। সীমিত সরবরাহ রেশনিংয়ের মাধ্যমে বিতরণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল পুরোপুরি মেরামত করে পুনরায় চালু করতে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান আগামী ১০ আগস্ট পর্যন্ত সময় চেয়েছে। ফলে টার্মিনালটি চালু না হওয়া এবং জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রামের গ্যাস সংকট দ্রুত কাটার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর