একের পর এক ‘প্রেসারকুকার’ বোমা, রিমোট নিয়ন্ত্রণে বিস্ফোরণের তথ্য নিয়ে পুলিশের উদ্বেগ
রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় পরপর কয়েকটি ‘প্রেসারকুকার’ বোমা উদ্ধারের ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে। বিশেষ করে উদ্ধার হওয়া কয়েকটি বোমায় দূর থেকে বিস্ফোরণ ঘটানোর রিমোট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকার তথ্য সামনে আসায় উগ্রবাদীদের বোমা তৈরির কৌশল নিয়ে উদ্বিগ্ন পুলিশ।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সম্প্রতি আশুলিয়া ও সাভার থেকে উদ্ধার হওয়া দুটি ‘প্রেসারকুকার’ বোমাই রিমোট নিয়ন্ত্রিত ছিল। এর মধ্যে আশুলিয়ার চারাবাগে একটি চায়ের দোকানে ফেলে যাওয়া বোমার সঙ্গে একটি রিমোটও উদ্ধার করা হয়। পরে সাভারের বনগাঁও ইউনিয়নের একটি মাঠ থেকে উদ্ধার হওয়া আরেকটি বোমাকেও দূরনিয়ন্ত্রিত বলে জানিয়েছে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এসব ঘটনার তদন্তে নাজমুল হাসান ওরফে মামুন, যিনি ‘বোমারু মামুন’ নামে পরিচিত, এবং তার সহযোগী আরিফ ওরফে ইমরানের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। মামুন দীর্ঘদিন ধরে বিস্ফোরক তৈরির সঙ্গে জড়িত বলে পুলিশের দাবি। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি আবারও এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার তদন্তেও মামুন ও আরিফের নাম উঠে এসেছে বলে দাবি কর্মকর্তাদের। এর মধ্যে কেরানীগঞ্জে বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণ, যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের তল্লাশির সময় বোমার ব্যাগ ফেলে পালানো, কুমিল্লার শিবমন্দিরে বিস্ফোরণ এবং সায়েদাবাদে পুলিশের তল্লাশির সময় বিস্ফোরণের মতো ঘটনাও রয়েছে।
এ ছাড়া জুলাইয়ে মতিঝিল মেট্রো স্টেশনের নিচে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উল্টো রথযাত্রার পথে একটি ছাতার মধ্যে পাইপবোমা রাখার ঘটনা এবং আশুলিয়ার চারাবাগে চায়ের দোকানে ‘প্রেসারকুকার’ বোমা ফেলে রাখার ঘটনায়ও তাদের সম্পৃক্ততার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
আরিফ গ্রেপ্তারের পর অভিযান
সম্প্রতি আরিফকে গ্রেপ্তারের পর সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুরে তার ভাড়া বাসায় অভিযান চালায় সিটিটিসি। ওই অভিযানে বিস্ফোরক তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম ও রাসায়নিক উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। মামলার এজাহারেও রিমোট ও কন্ট্রোলারসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধারের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
এর পরদিন সাভারের গোপেরবাড়ি লালটেক ঘোড়া মসজিদের সামনে একটি মাঠে পড়ে থাকা আরেকটি ‘প্রেসারকুকার’ বোমা উদ্ধার করা হয়। পরে সিটিটিসির বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল সেটি নিষ্ক্রিয় করে।
সিটিটিসির এক কর্মকর্তা জানান, আশুলিয়া ও সাভার থেকে উদ্ধার হওয়া দুটি ‘প্রেসারকুকার’ বোমাই রিমোট নিয়ন্ত্রিত ছিল। আশুলিয়ার বোমাটির সঙ্গে রিমোট পাওয়া গেলেও সাভারের মাঠ থেকে উদ্ধার হওয়া বোমাটির রিমোট পাওয়া যায়নি। পুলিশের ধারণা, বোমাটি ফেলে যাওয়ার সময় রিমোটসহ অন্যান্য সরঞ্জামও আশপাশে রাখা হয়েছিল।
এর আগে চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি ফরিদপুর শহরের আলীমুজ্জামান ব্রিজের দক্ষিণ পাশে একটি ব্যাগ থেকে উদ্ধার হওয়া বোমাকেও রিমোট নিয়ন্ত্রিত বলে জানিয়েছিল পুলিশ। সেটি নিষ্ক্রিয় করতে অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিটের একটি দল ঘটনাস্থলে যায়।
বরিশালের ঘটনায় ভিন্ন তথ্য
এদিকে বুধবার সকালে বরিশাল আদালতের ফটকে একটি দুর্বল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। সিসিটিভি ফুটেজে হঠাৎ বিস্ফোরণ ও ধোঁয়া দেখা গেলেও কাউকে বোমা ছুড়তে দেখা যায়নি। এ কারণে সেটিও দূরনিয়ন্ত্রিত কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
তবে বরিশাল নগর পুলিশের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আদালত চত্বরে বিস্ফোরণের ঘটনাটি রিমোট নিয়ন্ত্রিত বোমার কারণে ঘটেনি। ঘটনাস্থলে রিমোট নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরক তৈরির উপকরণও পাওয়া যায়নি। পুলিশের ধারণা, একটি কাচের পাত্রে বিস্ফোরক রেখে ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে।
রিমোট নিয়ন্ত্রিত বোমা নিয়ে উদ্বেগ
সিটিটিসির কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশে অতীতে উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে টাইম ডিভাইস ব্যবহারের ঘটনা বেশি দেখা গেছে। নির্দিষ্ট সময় পর বিস্ফোরণের ব্যবস্থা থাকা এসব ডিভাইস ব্যবহার করে বিভিন্ন হামলা চালানোর নজির রয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে রিমোট নিয়ন্ত্রিত বোমার ব্যবহার বা এ ধরনের ডিভাইস উদ্ধারের ঘটনা পুলিশের জন্য নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আশুলিয়া ও সাভার থেকে উদ্ধার হওয়া দুটি ‘প্রেসারকুকার’ বোমা এবং মতিঝিলে ছাতার মধ্যে পাওয়া পাইপবোমার ধরনেও মিল রয়েছে বলে জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তাদের ভাষ্য, এসব বোমার কাঠামো ও তৈরির ধরনকে ‘বোমারু মামুনের সিগনেচার কাজ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে এসব ঘটনার পেছনে একই চক্রের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে সিটিটিসি।
বোমারু মামুনের অতীত
২০১৭ সালে রাজধানীর পান্থপথের হোটেল ওলিওতে বিস্ফোরণের ঘটনায় মামুনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পুলিশের দাবি, ওই ঘটনায় ব্যবহৃত বোমাগুলোর একটি মামুন তৈরি করেছিলেন। পরে মামুন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিলেন বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
তবে চলতি বছর ঢাকার একটি আদালত মামুনসহ ওই মামলার ১১ আসামিকে খালাস দেন।
পুলিশের তথ্যমতে, মামুন নব্য জেএমবির বোমা তৈরির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিস্ফোরক তৈরির কৌশল শিখেছিলেন। তার জবানবন্দিতেও এ বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য উঠে এসেছিল বলে দাবি পুলিশের।
বর্তমানে মামুনকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। সিটিটিসির অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর তদন্ত চলছে। তদন্তে যাদের নাম আসবে, তাদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করা হবে। মামুনকে গ্রেপ্তারের জন্যও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে উদ্ধার হওয়া বোমাগুলোর মধ্যে রিমোট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ায় বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে এসব বিস্ফোরক কোথা থেকে এসেছে, কারা তৈরি করেছে এবং এর পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক রয়েছে কি না, তা খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: