বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকটে কয়েক গুণ বেড়েছে ওষুধ উৎপাদন খরচ, দাম বাড়ার শঙ্কা
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে দেশে ওষুধ উৎপাদন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়েছে। কারখানা চালু রাখতে বিদ্যুতের পাশাপাশি জেনারেটর ও বড় ইউপিএসের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে। গ্যাসের সংকটে জেনারেটর চালাতেও বাড়তি ডিজেল ব্যবহার করতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ার চাপ শেষ পর্যন্ত ওষুধের দামে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন দেশের ওষুধ শিল্পের উদ্যোক্তারা।
সোমবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির কার্যালয়ে বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সঙ্গে আয়োজিত ‘ওষুধ শিল্পের অগ্রগতি: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় এ উদ্বেগের কথা জানান শিল্পসংশ্লিষ্টরা।
সভায় বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির সিনিয়র সহসভাপতি ও ইউনিমেড ফার্মাসিউটিক্যালসের চেয়ারম্যান মো. মোসাদ্দেক হোসেন, মহাসচিব ও হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হালিমুজ্জামান, সাবেক মহাসচিব ও ডেল্টা ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. জাকির হোসেনসহ সংশ্লিষ্টরা বক্তব্য দেন।
ওষুধ শিল্পের জন্য জ্বালানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে মোহাম্মদ হালিমুজ্জামান বলেন, বর্তমানে বিদ্যুৎ ও ডিজেল—দুই ক্ষেত্রেই শিল্পটি সমস্যায় পড়েছে। কারখানা চালানোর সময় বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ না থাকলে কারখানায় জেনারেটর ও বড় ইউপিএস চালাতে হয়। আবার গ্যাসের সংকট থাকায় জেনারেটর চালানোর জন্য ডিজেলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়ছে। জ্বালানি ব্যয় এভাবে বাড়তে থাকলে একপর্যায়ে উৎপাদন খরচ সমন্বয়ের জন্য ওষুধের দাম বাড়ানো ছাড়া উপায় থাকবে না।
জ্বালানি সংকটে বাড়তি ব্যয়ের উদাহরণ তুলে ধরে হালিমুজ্জামান বলেন, তার নিজের কারখানায় গত কয়েক মাসে প্রতি মাসে শুধু ডিজেল খরচ বাবদ প্রায় ২ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে।
ডেল্টা ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. জাকির হোসেন বলেন, তার কারখানার হিসাবে বিদ্যুতের সরকারি রেট ১৫ টাকা থেকে বেড়ে ৪২ টাকা পর্যন্ত আসছে। অর্থাৎ প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের ব্যয় কয়েক গুণ বেড়েছে।
তিনি বলেন, ওষুধশিল্পের সঙ্গে অন্যান্য শিল্পের বড় পার্থক্য রয়েছে। ওষুধ উৎপাদনের প্রক্রিয়া একবার শুরু হলে মাঝপথে তা বন্ধ করা যায় না। বিদ্যুৎ চলে গেলে উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়া নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে কারখানাগুলোকে ব্যাকআপ হিসেবে জেনারেটর ও বড় ইউপিএস চালাতে হয়।
গ্যাসের সংকটের কারণে জেনারেটর চালাতেও ডিজেলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠানের ডিজেল মজুতের সক্ষমতাও পর্যাপ্ত নয়। ফলে ট্যাংকের জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে দ্রুত ডিজেল সংগ্রহ করতে হয়। এতে উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়ছে।
ওষুধের দাম নির্ধারণে শুধু জ্বালানি ব্যয় নয়, কাঁচামাল, মান নিয়ন্ত্রণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সংরক্ষণ এবং গবেষণা ও উন্নয়নসহ বিভিন্ন খরচও যুক্ত রয়েছে বলে জানান শিল্পসংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, প্রায় প্রতিটি খাতেই ব্যয় বাড়ছে। এর মধ্যে জ্বালানি ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফায় সরাসরি চাপ তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির নেতারা বলছেন, দেশের মানুষের জন্য জীবনরক্ষাকারী ওষুধ সুলভ ও সহজলভ্য রাখতে সরকারের কার্যকর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। একই সঙ্গে ওষুধের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে উৎপাদন ব্যয় ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
তাদের আশঙ্কা, কোনো ধরনের আলোচনার বাইরে একতরফাভাবে ওষুধের দাম বেঁধে দেওয়া হলে অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে আগ্রহ হারাতে পারে। এতে বাজারে প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধের সরবরাহ কমে গিয়ে চিকিৎসাক্ষেত্রে সংকট তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের মোট ওষুধের চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ স্থানীয় কোম্পানিগুলো সরবরাহ করে। তবে গ্যাস সংকটের পাশাপাশি ওষুধের কাঁচামাল ও প্যাকেজিং উপকরণের দাম বাড়ায় শিল্পটি নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এ অবস্থায় ওষুধের দাম নির্ধারণের আগে সংশ্লিষ্ট শিল্প উদ্যোক্তাদের মতামত নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
ডা. জাকির হোসেন বলেন, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ সব সময় বাজার ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত পরিমাণে মজুত এবং সহজলভ্য থাকা প্রয়োজন। জনগণের চাহিদা অনুযায়ী এসব ওষুধের দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীদের জন্য সরবরাহ করা ওষুধের বড় অংশ এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঁচটি উৎপাদন কারখানা রয়েছে। তাই অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদনের দায়িত্ব আরও বেশি করে ইডিসিএলকে দেওয়ার প্রস্তাব দেন তিনি।
তার মতে, সরকারি সহায়তা পাওয়া ইডিসিএলের মাধ্যমে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদন করা হলে জনগণকে সুলভ মূল্যে এসব ওষুধ সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে। প্রয়োজন হলে বেসরকারি ওষুধ কোম্পানিগুলোর কাছ থেকেও ঘাটতি পূরণে ওষুধ নেওয়া যেতে পারে।
মোহাম্মদ হালিমুজ্জামান বলেন, সময়ের চাহিদা অনুযায়ী অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এসব ওষুধের মান নিশ্চিত করে জনগণের নাগালের মধ্যে রাখতে হবে।
তিনি জানান, ১৯৯৪ সালে প্রণীত ১১৭টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকার অনেক ওষুধ বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে না। কারণ এসব ওষুধের অনেকগুলো উৎপাদন করে বেসরকারি কোম্পানির জন্য ব্যবসায়িকভাবে টিকে থাকা কঠিন। তাই এসব ওষুধ ইডিসিএলের মাধ্যমে উৎপাদন করে জনগণের কাছে সুলভ মূল্যে, প্রয়োজনে বিনা মূল্যে সরবরাহের বিষয়টি সরকার বিবেচনা করতে পারে।
বাংলাদেশের ওষুধশিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির সিনিয়র সহসভাপতি মো. মোসাদ্দেক হোসেন। তিনি বলেন, বিশ্বের খুব কম দেশই ওষুধ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পেরেছে। বাংলাদেশ সেই দেশগুলোর একটি। দেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রতিযোগিতা করছে এবং রপ্তানি করছে।
বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের সরাসরি প্রতিযোগিতা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের ওষুধশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিদেশি কোম্পানিগুলো সেই জায়গা দখল করে নিতে পারে। তাই এমন কোনো নীতি নেওয়া উচিত নয়, যাতে দেশীয় ওষুধশিল্প ক্ষতির মুখে পড়ে।
সভায় ওষুধশিল্পের উদ্যোক্তারা অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং দেশীয় ওষুধশিল্পের সক্ষমতা ধরে রাখতে ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণের আহ্বান জানান।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: