infoamaderdin@gmail.com শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬
২৭ আষাঢ় ১৪৩৩

৭ দিনের ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ধস: কক্সবাজারে প্রাণহানি ২৬, পানিবন্দি লাখো মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১১ জুলাই ২০২৬ ১৩:০৭ পিএম

টানা সাত দিনের ভারী বর্ষণে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ধসে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে কক্সবাজার। জেলার বিভিন্ন এলাকায় পানিতে ডুবে, নৌকাডুবি ও পাহাড়ধসে গত রোববার (৫ জুলাই) থেকে শুক্রবার (১০ জুলাই) পর্যন্ত অন্তত ২৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। একই সঙ্গে জেলার ১০ উপজেলার প্রায় তিন লাখ মানুষ দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন।

সর্বশেষ শুক্রবার দুপুরে চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নে বসতবাড়ি পানিতে তলিয়ে যাওয়ার পর নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পথে নৌকাডুবির ঘটনায় রসুলাবাদ এলাকার আবদুল মালেকের ১২ বছর বয়সী মেয়ে হাসনাতুল জান্নাত ঝর্ণার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় তার দুই বোনকে জীবিত উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেলে চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নের মাইজ কাকারা এলাকায় বন্যার পানিতে ডুবে মারা যায় দুই বছর বয়সী মোহাম্মদ ওয়াকিম। একই দিন সকালে নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের চরপাড়া এলাকায় বন্যার পানিতে ভেসে গিয়ে প্রাণ হারায় তিন বছরের শিশু পুষ্প। এছাড়া ভোরে চকরিয়ার মছনিয়া কাটা এলাকায় পাহাড়ধসে একটি বসতঘর চাপা পড়ে একই পরিবারের দুই শিশুর মৃত্যু হয়।

এ ছাড়া কক্সবাজার সদর, পেকুয়া এবং উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১৫ জন রোহিঙ্গাসহ মোট ২১ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় জেলার ১০টি উপজেলার ৩৫টি ইউনিয়নের অন্তত ১৫০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা। পাশাপাশি সদর উপজেলা, রামু, উখিয়া, টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও ঈদগাঁও উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাও পানির নিচে রয়েছে।

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নূরুল ইসলাম জানান, বান্দরবান থেকে নেমে আসা ঢলে মাতামুহুরী নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় চকরিয়া ও পেকুয়ার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।

চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার, যিনি মাতামুহুরী উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বেও রয়েছেন, জানান, চকরিয়া ও মাতামুহুরীতে এক লাখেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। দুর্গতদের জন্য ৯৬টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। সেখানে শুকনো খাবারসহ প্রয়োজনীয় ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত এবং পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য স্লুইস গেট সচল রাখতে প্রশাসন সার্বক্ষণিক কাজ করছে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আজাদ রহমান জানান, শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সরকারি হিসাবে বন্যাকবলিত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৬২ জন। এর মধ্যে ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ১৪ হাজার ৬১ জন।

তিনি আরও জানান, দুর্গতদের সহায়তায় সরকারিভাবে ২০০ টন চাল, ৪৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ত্রাণ বিতরণ ও জরুরি সহায়তা কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে।

এদিকে কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ মোহাম্মদ আবদুল হান্নান জানান, গত ছয় দিনে জেলায় ৭০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী দুই দিন মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এতে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি এবং নতুন করে পাহাড়ধসের আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি আরও জানান, বিরূপ আবহাওয়ার কারণে সমুদ্রবন্দর ও উপকূলীয় এলাকার জন্য স্থানীয় সতর্ক সংকেত নম্বর-৩ বহাল রাখা হয়েছে।

দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তবে অব্যাহত বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাসে কক্সবাজারজুড়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


৭ দিনের ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ধস: কক্সবাজারে প্রাণহানি ২৬, পানিবন্দি লাখো মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১১ জুলাই ২০২৬ ১৩:০৭ পিএম

টানা সাত দিনের ভারী বর্ষণে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ধসে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে কক্সবাজার। জেলার বিভিন্ন এলাকায় পানিতে ডুবে, নৌকাডুবি ও পাহাড়ধসে গত রোববার (৫ জুলাই) থেকে শুক্রবার (১০ জুলাই) পর্যন্ত অন্তত ২৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। একই সঙ্গে জেলার ১০ উপজেলার প্রায় তিন লাখ মানুষ দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন।

সর্বশেষ শুক্রবার দুপুরে চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নে বসতবাড়ি পানিতে তলিয়ে যাওয়ার পর নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পথে নৌকাডুবির ঘটনায় রসুলাবাদ এলাকার আবদুল মালেকের ১২ বছর বয়সী মেয়ে হাসনাতুল জান্নাত ঝর্ণার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় তার দুই বোনকে জীবিত উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেলে চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নের মাইজ কাকারা এলাকায় বন্যার পানিতে ডুবে মারা যায় দুই বছর বয়সী মোহাম্মদ ওয়াকিম। একই দিন সকালে নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের চরপাড়া এলাকায় বন্যার পানিতে ভেসে গিয়ে প্রাণ হারায় তিন বছরের শিশু পুষ্প। এছাড়া ভোরে চকরিয়ার মছনিয়া কাটা এলাকায় পাহাড়ধসে একটি বসতঘর চাপা পড়ে একই পরিবারের দুই শিশুর মৃত্যু হয়।

এ ছাড়া কক্সবাজার সদর, পেকুয়া এবং উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১৫ জন রোহিঙ্গাসহ মোট ২১ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় জেলার ১০টি উপজেলার ৩৫টি ইউনিয়নের অন্তত ১৫০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা। পাশাপাশি সদর উপজেলা, রামু, উখিয়া, টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও ঈদগাঁও উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাও পানির নিচে রয়েছে।

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নূরুল ইসলাম জানান, বান্দরবান থেকে নেমে আসা ঢলে মাতামুহুরী নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় চকরিয়া ও পেকুয়ার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।

চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার, যিনি মাতামুহুরী উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বেও রয়েছেন, জানান, চকরিয়া ও মাতামুহুরীতে এক লাখেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। দুর্গতদের জন্য ৯৬টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। সেখানে শুকনো খাবারসহ প্রয়োজনীয় ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত এবং পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য স্লুইস গেট সচল রাখতে প্রশাসন সার্বক্ষণিক কাজ করছে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আজাদ রহমান জানান, শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সরকারি হিসাবে বন্যাকবলিত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৬২ জন। এর মধ্যে ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ১৪ হাজার ৬১ জন।

তিনি আরও জানান, দুর্গতদের সহায়তায় সরকারিভাবে ২০০ টন চাল, ৪৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ত্রাণ বিতরণ ও জরুরি সহায়তা কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে।

এদিকে কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ মোহাম্মদ আবদুল হান্নান জানান, গত ছয় দিনে জেলায় ৭০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী দুই দিন মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এতে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি এবং নতুন করে পাহাড়ধসের আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি আরও জানান, বিরূপ আবহাওয়ার কারণে সমুদ্রবন্দর ও উপকূলীয় এলাকার জন্য স্থানীয় সতর্ক সংকেত নম্বর-৩ বহাল রাখা হয়েছে।

দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তবে অব্যাহত বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাসে কক্সবাজারজুড়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে।

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর