infoamaderdin@gmail.com রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২২ ভাদ্র ১৪৩৩

ইসমাইলের কাছে ৫ লাখ টাকা দেখেই হত্যার ছক, বাসে শ্বাসরোধের পর লাশ ফেলে দেয় তিনজন

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৮:০৯ পিএম

মেয়ের বিয়ের জন্য জমি বিক্রি করে পাওয়া প্রায় পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে জামালপুর থেকে গাজীপুরে ফিরছিলেন ইসমাইল হোসেন। পথে বাসের ভাড়া দেওয়ার সময় তাঁর কাছে থাকা টাকা দেখে ফেলেন বাসের সুপারভাইজার। এরপর সেই টাকা লুটের পরিকল্পনা করেন বাসচালক, সুপারভাইজার ও হেলপার।

পুলিশের দাবি, পরিকল্পনা অনুযায়ী অন্য যাত্রীদের নামিয়ে দিয়ে ইসমাইলকে বাসে রেখে দেওয়া হয়। পরে তাঁকে শ্বাসরোধে হত্যা করে টাকা লুটের পর মরদেহ ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বনানী অংশে ফেলে দেওয়া হয়।

ইসমাইল হোসেন (৪৯) হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে রাজ ক্লাসিক পরিবহনের চালক, সুপারভাইজার ও হেলপারকে গ্রেপ্তারের পর রবিবার সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।

গ্রেপ্তার তিনজন হলেন রাজ ক্লাসিক পরিবহনের চালক সোহেল রানা (৪১), সুপারভাইজার সাজু ওরফে লিমন (২৬) এবং হেলপার মো. মনির হোসেন (১৯)। ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তুলে ধরেন।

পুলিশ জানায়, গত বৃহস্পতিবার বিকেলে জামালপুর থেকে রাজ ক্লাসিক পরিবহনের একটি বাসে গাজীপুরের উদ্দেশে রওনা হন ইসমাইল। তাঁর গন্তব্য ছিল গাজীপুরের জিরানী বাজার। সেখানে তাঁকে নিতে ভোরে অপেক্ষা করছিলেন ছেলে মো. হাসান। কিন্তু রাত ১১টার পর বাবার মোবাইল ফোন বন্ধ পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন তিনি।

পরদিন শুক্রবার সকালে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বনানী অংশে মুখে স্কচটেপ লাগানো অবস্থায় ইসমাইলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

ইসমাইলের বাড়ি জামালপুর সদর উপজেলার হবদেশ গ্রামে। একসময় তিনি গাজীপুরের ডেল্টা স্পিনিং মিলে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে চাকরি করতেন। চাকরির কারণে স্ত্রী আসমা বেগম ও দুই সন্তানকে নিয়ে কাশিমপুরে থাকতেন। কিছুদিন আগে চাকরি ছেড়ে তিনি একাই জামালপুরে ফিরে যান।

স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, মেয়ের বিয়ের দিন-তারিখ চূড়ান্ত করতে জামালপুর থেকে গাজীপুরে যাচ্ছিলেন ইসমাইল। জমি বিক্রি করে পাওয়া প্রায় পাঁচ লাখ টাকা তাঁর সঙ্গে ছিল।

ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার মো. ফারুক হোসেন বলেন, বাসের ভাড়া নেওয়ার সময় ইসমাইলের কাছে থাকা টাকা দেখতে পান সুপারভাইজার সাজু। পরে তিনি বিষয়টি বাসচালককে জানান। টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে চালক, সুপারভাইজার ও হেলপার মিলে ইসমাইলকে হত্যার পরিকল্পনা করেন বলে পুলিশের দাবি।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইসমাইলকে বাসের নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছালে ঘুম থেকে তুলে দেওয়ার কথা বলে ঘুমিয়ে যেতে বলা হয়। এরপর বাসের অন্য যাত্রীদের গাজীপুরের বিভিন্ন স্থানে নামিয়ে দেওয়া হলেও ইসমাইলকে নামানো হয়নি। যাত্রীশূন্য হওয়ার পর বাসটি ঢাকার দিকে আসতে থাকে।

একপর্যায়ে সুপারভাইজার ও হেলপার মিলে ইসমাইলের মুখ ও হাত স্কচটেপ দিয়ে বেঁধে ফেলেন। পরে তাঁর গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয় বলে দাবি পুলিশের।

পুলিশ আরও জানায়, হত্যার পর বাসটি এয়ারপোর্ট এলাকা থেকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে বনানীর দিকে আসে। বনানী থেকে ইউটার্ন নিয়ে আবার এয়ারপোর্টের দিকে যাওয়ার সময় ইসমাইলের মরদেহ এক্সপ্রেসওয়ের ওপর ফেলে রেখে যায় অভিযুক্তরা।

ইসমাইল নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর সন্ধানে তদন্ত শুরু করে বনানী থানা পুলিশ। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করতে গিয়ে রাজ ক্লাসিক পরিবহনের একটি বাসের গতিবিধি পুলিশের কাছে সন্দেহজনক মনে হয়। পরে বাসটির সুপারভাইজার সাজু ও হেলপার মনিরকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাসচালক সোহেল রানাকেও গ্রেপ্তার করা হয়।

ডিএমপি কর্মকর্তা ফারুক হোসেন বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনজনই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।

পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দির বরাত দিয়ে তিনি বলেন, জামালপুরের দিকপাই বাসস্ট্যান্ড থেকে ইসমাইল বাসে ওঠেন। একপর্যায়ে ভাড়া নেওয়ার সময় তাঁর কাছে থাকা টাকা দেখতে পান সুপারভাইজার সাজু। বিষয়টি চালককে জানালে চালক টাকা লুটের পরিকল্পনা করেন।

তবে ইসমাইলের সঙ্গে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা থাকলেও গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা পুরো টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেননি। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা প্রায় আড়াই লাখ টাকা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়।

এ ঘটনায় ইসমাইলের ছেলে মো. হাসান বনানী থানায় হত্যা মামলা করেছেন। গ্রেপ্তার তিন পরিবহনকর্মীকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানোর কথা জানিয়েছে পুলিশ।

ঘটনাটি ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে, যাত্রীবোঝাই একটি বাসে কীভাবে একজন যাত্রীকে আলাদা করে হত্যা করা হলো এবং মরদেহ কীভাবে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ওপর ফেলে রাখা সম্ভব হলো। পুলিশের তদন্তে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, অর্থ লুট ও মরদেহ গোপনের পুরো প্রক্রিয়ার আরও তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


ইসমাইলের কাছে ৫ লাখ টাকা দেখেই হত্যার ছক, বাসে শ্বাসরোধের পর লাশ ফেলে দেয় তিনজন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৮:০৯ পিএম

মেয়ের বিয়ের জন্য জমি বিক্রি করে পাওয়া প্রায় পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে জামালপুর থেকে গাজীপুরে ফিরছিলেন ইসমাইল হোসেন। পথে বাসের ভাড়া দেওয়ার সময় তাঁর কাছে থাকা টাকা দেখে ফেলেন বাসের সুপারভাইজার। এরপর সেই টাকা লুটের পরিকল্পনা করেন বাসচালক, সুপারভাইজার ও হেলপার।

পুলিশের দাবি, পরিকল্পনা অনুযায়ী অন্য যাত্রীদের নামিয়ে দিয়ে ইসমাইলকে বাসে রেখে দেওয়া হয়। পরে তাঁকে শ্বাসরোধে হত্যা করে টাকা লুটের পর মরদেহ ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বনানী অংশে ফেলে দেওয়া হয়।

ইসমাইল হোসেন (৪৯) হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে রাজ ক্লাসিক পরিবহনের চালক, সুপারভাইজার ও হেলপারকে গ্রেপ্তারের পর রবিবার সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।

গ্রেপ্তার তিনজন হলেন রাজ ক্লাসিক পরিবহনের চালক সোহেল রানা (৪১), সুপারভাইজার সাজু ওরফে লিমন (২৬) এবং হেলপার মো. মনির হোসেন (১৯)। ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তুলে ধরেন।

পুলিশ জানায়, গত বৃহস্পতিবার বিকেলে জামালপুর থেকে রাজ ক্লাসিক পরিবহনের একটি বাসে গাজীপুরের উদ্দেশে রওনা হন ইসমাইল। তাঁর গন্তব্য ছিল গাজীপুরের জিরানী বাজার। সেখানে তাঁকে নিতে ভোরে অপেক্ষা করছিলেন ছেলে মো. হাসান। কিন্তু রাত ১১টার পর বাবার মোবাইল ফোন বন্ধ পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন তিনি।

পরদিন শুক্রবার সকালে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বনানী অংশে মুখে স্কচটেপ লাগানো অবস্থায় ইসমাইলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

ইসমাইলের বাড়ি জামালপুর সদর উপজেলার হবদেশ গ্রামে। একসময় তিনি গাজীপুরের ডেল্টা স্পিনিং মিলে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে চাকরি করতেন। চাকরির কারণে স্ত্রী আসমা বেগম ও দুই সন্তানকে নিয়ে কাশিমপুরে থাকতেন। কিছুদিন আগে চাকরি ছেড়ে তিনি একাই জামালপুরে ফিরে যান।

স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, মেয়ের বিয়ের দিন-তারিখ চূড়ান্ত করতে জামালপুর থেকে গাজীপুরে যাচ্ছিলেন ইসমাইল। জমি বিক্রি করে পাওয়া প্রায় পাঁচ লাখ টাকা তাঁর সঙ্গে ছিল।

ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার মো. ফারুক হোসেন বলেন, বাসের ভাড়া নেওয়ার সময় ইসমাইলের কাছে থাকা টাকা দেখতে পান সুপারভাইজার সাজু। পরে তিনি বিষয়টি বাসচালককে জানান। টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে চালক, সুপারভাইজার ও হেলপার মিলে ইসমাইলকে হত্যার পরিকল্পনা করেন বলে পুলিশের দাবি।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইসমাইলকে বাসের নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছালে ঘুম থেকে তুলে দেওয়ার কথা বলে ঘুমিয়ে যেতে বলা হয়। এরপর বাসের অন্য যাত্রীদের গাজীপুরের বিভিন্ন স্থানে নামিয়ে দেওয়া হলেও ইসমাইলকে নামানো হয়নি। যাত্রীশূন্য হওয়ার পর বাসটি ঢাকার দিকে আসতে থাকে।

একপর্যায়ে সুপারভাইজার ও হেলপার মিলে ইসমাইলের মুখ ও হাত স্কচটেপ দিয়ে বেঁধে ফেলেন। পরে তাঁর গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয় বলে দাবি পুলিশের।

পুলিশ আরও জানায়, হত্যার পর বাসটি এয়ারপোর্ট এলাকা থেকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে বনানীর দিকে আসে। বনানী থেকে ইউটার্ন নিয়ে আবার এয়ারপোর্টের দিকে যাওয়ার সময় ইসমাইলের মরদেহ এক্সপ্রেসওয়ের ওপর ফেলে রেখে যায় অভিযুক্তরা।

ইসমাইল নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর সন্ধানে তদন্ত শুরু করে বনানী থানা পুলিশ। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করতে গিয়ে রাজ ক্লাসিক পরিবহনের একটি বাসের গতিবিধি পুলিশের কাছে সন্দেহজনক মনে হয়। পরে বাসটির সুপারভাইজার সাজু ও হেলপার মনিরকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাসচালক সোহেল রানাকেও গ্রেপ্তার করা হয়।

ডিএমপি কর্মকর্তা ফারুক হোসেন বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনজনই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।

পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দির বরাত দিয়ে তিনি বলেন, জামালপুরের দিকপাই বাসস্ট্যান্ড থেকে ইসমাইল বাসে ওঠেন। একপর্যায়ে ভাড়া নেওয়ার সময় তাঁর কাছে থাকা টাকা দেখতে পান সুপারভাইজার সাজু। বিষয়টি চালককে জানালে চালক টাকা লুটের পরিকল্পনা করেন।

তবে ইসমাইলের সঙ্গে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা থাকলেও গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা পুরো টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেননি। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা প্রায় আড়াই লাখ টাকা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়।

এ ঘটনায় ইসমাইলের ছেলে মো. হাসান বনানী থানায় হত্যা মামলা করেছেন। গ্রেপ্তার তিন পরিবহনকর্মীকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানোর কথা জানিয়েছে পুলিশ।

ঘটনাটি ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে, যাত্রীবোঝাই একটি বাসে কীভাবে একজন যাত্রীকে আলাদা করে হত্যা করা হলো এবং মরদেহ কীভাবে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ওপর ফেলে রাখা সম্ভব হলো। পুলিশের তদন্তে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, অর্থ লুট ও মরদেহ গোপনের পুরো প্রক্রিয়ার আরও তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর