বাগেরহাটে ডেঙ্গুতে ১২ মৃত্যু, সরকারি হিসাবে মাত্র ১ জন—নথির বাইরে ১১ প্রাণ
বাগেরহাটে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লেও সরকারি হিসাবের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের মৃত্যুর চিত্রে বড় ধরনের অমিল দেখা দিয়েছে। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের হিসাবে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন মাত্র একজন।
অথচ বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, স্থানীয় সূত্র ও স্বজনদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে জেলায় ডেঙ্গুতে অন্তত ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ সরকারি নথির বাইরে থেকে গেছে অন্তত ১১টি মৃত্যুর তথ্য।
ডেঙ্গুতে মৃতদের মধ্যে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শিশু, বৃদ্ধসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ রয়েছেন। সর্বশেষ গত ২৯ আগস্ট বাগেরহাট সদর উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের সাহসপুর গ্রামের ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থী রিয়া মজুমদারের মৃত্যু হয়। এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া রিয়া ভালো কলেজে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন দেখছিল। ফল প্রকাশের প্রায় দেড় সপ্তাহ পর জ্বরে আক্রান্ত হলে পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। কয়েক দিনের মধ্যেই তার মৃত্যুতে পরিবার ও এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া।
এর দুই দিন পর, ৩১ আগস্ট বাগেরহাট পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাহাপাড়ার শিক্ষক সুমন সাহা (৩৮) ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। আক্রান্ত হওয়ার মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যে তাঁর মৃত্যু হয়।
একই পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব বাসাবাটি গ্রামের ফকির বুজরুক আলী (৮২) মারা যান ১ সেপ্টেম্বর। তাঁর ছেলে জাহিদ হাসান পলাশ জানান, তাঁর বাবা স্ট্রোকের রোগী ছিলেন। আগস্টের শেষদিকে ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার পর প্রথমে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে ১ সেপ্টেম্বর বাগেরহাট জেলা হাসপাতালে নেওয়া হয় তাঁকে। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, কচুয়া উপজেলায় ডেঙ্গুতে মারা গেছেন অন্তত চারজন। তাঁদের মধ্যে রাড়িপাড়া ইউনিয়নের চন্দ্রপাড়া গ্রামের অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী জিহাদ হাসান (২২) মারা যান ৯ আগস্ট। একই উপজেলায় দিগন্ত নামে এক কিশোরের মৃত্যু হয় ১৮ মে। খান মোহাম্মদ লিয়াকত আলী (৫৩) মারা যান ১৬ আগস্ট এবং গোপালপুর গ্রামের শামসুর রহমান (৭৫) মারা যান ২৬ মে।
মোরেলগঞ্জ উপজেলায় ডেঙ্গুতে মারা গেছেন অন্তত দুজন। উপজেলার চণ্ডীপুর গ্রামের ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার মিতু মারা যান ২৬ আগস্ট। এর আগে ৫ জুন বিষখালী গ্রামের রাধারানী দাস (৪২) মারা যান।
ফকিরহাট উপজেলায় মাদ্রাসাশিক্ষার্থী রমজান আলী মোল্লা (২৩) মারা যান ২৮ আগস্ট। এর দুই দিন আগে ২৬ আগস্ট একই উপজেলার সাতসইয়া গ্রামের তুলি বেগম (৪৭) মারা যান। এ ছাড়া মোংলা পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডে গত ১৯ জুলাই দুই বছরের শিশু ইফা আক্তারের মৃত্যু হয়।
সরকারি হিসাবে অবশ্য জেলার ডেঙ্গু পরিস্থিতির চিত্র ভিন্ন। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাগেরহাটে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ১৮৫ জন। তাঁদের মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ১ হাজার ৪৪ জন। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১০৭ জন।
সরকারি হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যা কম হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে বাগেরহাটের সিভিল সার্জন আ স ম মাহবুবুল আলম বলেন, জেলার বাইরে গিয়ে কিংবা কোনো বেসরকারি ক্লিনিকে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু হলে তা সরকারি হিসাবে যুক্ত হয় না। জেলা সদর হাসপাতালসহ জেলার নয়টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই সরকারি তালিকা তৈরি করা হয়।
তিনি বলেন, মে মাস থেকে জেলায় ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দিলেও নিয়ম অনুযায়ী বছরের ১ জানুয়ারি থেকে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হিসাব গণনা করা হয়। বর্তমানে জেলার ডেঙ্গু পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে সরকারি হিসাবের বাইরে থাকা মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) বাগেরহাটের সাধারণ সম্পাদক এস কে হাসিব। তাঁর মতে, স্থানীয়ভাবে প্রতিদিনই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু এসব মৃত্যুর তথ্য সরকারি তালিকায় না থাকা দুঃখজনক। মাঠপর্যায়ে ডেঙ্গুর প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে মানুষকে সচেতন করা গেলে সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঝুঁকি কমানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
বাগেরহাট সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. অসীম কুমার সমাদ্দার জানান, ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ২৫টি শয্যা নির্ধারিত রয়েছে। গত চার মাস ধরে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত মোট ৪৬৫ জন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের মতে, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগী জেলার বাইরে বা বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর মারা গেলে সেই মৃত্যু সরকারি জেলা পরিসংখ্যানে না আসার সুযোগ রয়েছে। ফলে সরকারি হিসাব ও স্থানীয় পর্যায়ের বাস্তব চিত্রের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। বাগেরহাটে ডেঙ্গুর প্রকৃত সংক্রমণ ও মৃত্যুর চিত্র জানতে হলে সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতাল ও ক্লিনিকের তথ্য সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: