infoamaderdin@gmail.com রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২২ ভাদ্র ১৪৩৩

সেফটি ভালভের ত্রুটিতে ফের অনিশ্চয়তায় রূপপুরের বিদ্যুৎ, বাড়ছে গ্রিডে সরবরাহের অপেক্ষা

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৫:০৯ পিএম

পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হচ্ছে। প্রথম ইউনিটে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক পরীক্ষা এগিয়ে গেলেও দুটি সেফটি ভালভে ত্রুটি ধরা পড়ায় পরবর্তী ধাপের পরীক্ষা আপাতত আটকে গেছে। ফলে রূপপুরের প্রথম ইউনিট থেকে কবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে, তা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ত্রুটিপূর্ণ সেফটি ভালভের সমাধান করার পরও প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ শুরু করতে আরও কয়েক ধাপের পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে। সবকিছু দ্রুত এগোলেও গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে অন্তত আট থেকে ১০ সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। এতে চলতি বছরই রূপপুর থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিটের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট চালু হলে দেশের চলমান বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সেফটি ভালভের ত্রুটিতে আটকে পরবর্তী পরীক্ষা

গত ২৮ এপ্রিল রূপপুরের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিংয়ের আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক পরীক্ষা শুরু হয়। তখন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল চার থেকে ছয় মাসের মধ্যে প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার।

প্রথম ইউনিটের চুল্লিপাত্রে পারমাণবিক জ্বালানি প্রবেশ করানোর কাজও গত ১২ মে শেষ হয়। এরপর বিভিন্ন ধাপে পরীক্ষা চালিয়ে ‘বি’ স্টেজ সম্পন্ন করা হয়। কিন্তু দুটি সেফটি ভালভে সমস্যা দেখা দেওয়ায় ‘সি’ স্টেজের পরীক্ষা শুরু করা সম্ভব হয়নি।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম গত ৩ সেপ্টেম্বর জানান, প্রথম ইউনিটের দুটি সেফটি ভালভে সমস্যা থাকায় পরবর্তী ধাপের পরীক্ষা আপাতত শুরু করা যাচ্ছে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সেফটি ভালভ দুটি কেন কাজ করছে না, তা নির্ধারণ করতে রাশিয়া থেকে বিশেষজ্ঞ দল আসার কথা রয়েছে। প্রকল্পের ডিজাইনারের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ভালভ দুটি পুরোপুরি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে।

দুটি বিকল্পের কথা ভাবছে সরকার

ত্রুটিপূর্ণ সেফটি ভালভ দ্রুত সচল করতে দুটি বিকল্প বিবেচনা করা হচ্ছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী জানিয়েছেন, দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য বরাদ্দ থাকা ভালভ এনে প্রথম ইউনিটে বসানো হতে পারে। অথবা রুশ ভেন্ডরকে দ্রুত নতুন ভালভ তৈরি করে সরবরাহের অনুরোধ করা হতে পারে।

যে পদ্ধতিতে দ্রুত সমাধান করা সম্ভব হবে, সরকার সেটিই বেছে নেবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী।

সেফটি ভালভকে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। রিঅ্যাক্টরের কুলিং ব্যবস্থায় অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হলে ভালভ খুলে অতিরিক্ত চাপ বের করে দেওয়ার মাধ্যমে এটি নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তবে ভালভের সমস্যা সমাধান হলেই সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে না। এরপর রিঅ্যাক্টরে ফিশন বিক্রিয়া শুরু করা, পরীক্ষামূলক উৎপাদন এবং ধাপে ধাপে গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

লোডশেডিংয়ের মধ্যে আরও দীর্ঘ হচ্ছে অপেক্ষা

রূপপুরের বিদ্যুৎ পাওয়ার অপেক্ষার মধ্যেই দেশে বিদ্যুৎ সংকট অব্যাহত রয়েছে। আমদানিসহ দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও জ্বালানি সংকটের কারণে চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন করা যাচ্ছে না।

ফলে প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। কোনো কোনো সময়ে দেশের মোট লোডশেডিং সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

গত ৫ সেপ্টেম্বর রাত ৯টার পিক আওয়ারে সারা দেশে ২ হাজার ২৫৮ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং হয়েছে ঢাকা জোনে—৭৫৯ মেগাওয়াট। ওই সময় ঢাকা জোনে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৬ হাজার ১৮২ মেগাওয়াট।

অন্যদিকে সবচেয়ে কম লোডশেডিং হয়েছে বরিশাল জোনে, ১০৬ মেগাওয়াট।

এ অবস্থায় রূপপুরের ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট চালু হলে জাতীয় গ্রিডে একসঙ্গে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে। ফলে চলমান বিদ্যুৎ ঘাটতি ও লোডশেডিং কমাতে রূপপুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এনএলডিসির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের উদ্যোগ

রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে গত ২ সেপ্টেম্বর জাতীয় লোড পরিচালনা কেন্দ্র বা এনএলডিসির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনে চুক্তি করে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান জিই ভার্নোভা।

চুক্তির আওতায় রূপপুরের প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিটের আটটি সঞ্চালন লাইন এবং দুটি উপকেন্দ্রের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এনএলডিসির কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়।

তবে এই চুক্তির পরদিনই প্রথম ইউনিটের দুটি সেফটি ভালভে ত্রুটি ধরা পড়ে। ফলে গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তুতি চললেও মূল উৎপাদন প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপ থেমে যায়।

বারবার পিছিয়েছে রূপপুরের সময়সীমা

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট ২০২২ সালের ডিসেম্বর এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৩ সালের অক্টোবরে চালু হওয়ার কথা ছিল। তবে করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ নানা কারণে প্রকল্পের সময়সীমা কয়েক দফা পিছিয়েছে।

এর মধ্যে গত জুনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, আগস্টের শেষদিকে প্রথম ইউনিট থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে। একই সঙ্গে ডিসেম্বরের মধ্যে প্রথম ইউনিট থেকে ১ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ গ্রিডে দেওয়ার আশাবাদও জানিয়েছিলেন তিনি।

কিন্তু সেফটি ভালভের ত্রুটির কারণে সেই সময়সূচিও এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

দেশের সবচেয়ে বড় একক প্রকল্প

দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক প্রকল্প হিসেবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। কেন্দ্রটির পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড বা এনপিসিবিএল।

পাবনার রূপপুরে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট নির্মাণ করছে রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট।

কেন্দ্রটির উৎপাদন শুরু হলে বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় ৩৩তম দেশ হিসেবে যুক্ত হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী এখান থেকে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে এবং প্রায় দেড় বছর পরপর নতুন পারমাণবিক জ্বালানি প্রতিস্থাপন করতে হবে।

তবে প্রথম ইউনিটের সেফটি ভালভের ত্রুটি দ্রুত সমাধান না হলে রূপপুর থেকে বিদ্যুৎ পাওয়ার অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হতে পারে। আর দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা ও লোডশেডিংয়ের চাপের মধ্যে প্রকল্পটির উৎপাদন শুরুর সময়সূচি এখন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


সেফটি ভালভের ত্রুটিতে ফের অনিশ্চয়তায় রূপপুরের বিদ্যুৎ, বাড়ছে গ্রিডে সরবরাহের অপেক্ষা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৫:০৯ পিএম

পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হচ্ছে। প্রথম ইউনিটে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক পরীক্ষা এগিয়ে গেলেও দুটি সেফটি ভালভে ত্রুটি ধরা পড়ায় পরবর্তী ধাপের পরীক্ষা আপাতত আটকে গেছে। ফলে রূপপুরের প্রথম ইউনিট থেকে কবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে, তা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ত্রুটিপূর্ণ সেফটি ভালভের সমাধান করার পরও প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ শুরু করতে আরও কয়েক ধাপের পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে। সবকিছু দ্রুত এগোলেও গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে অন্তত আট থেকে ১০ সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। এতে চলতি বছরই রূপপুর থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিটের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট চালু হলে দেশের চলমান বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সেফটি ভালভের ত্রুটিতে আটকে পরবর্তী পরীক্ষা

গত ২৮ এপ্রিল রূপপুরের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিংয়ের আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক পরীক্ষা শুরু হয়। তখন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল চার থেকে ছয় মাসের মধ্যে প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার।

প্রথম ইউনিটের চুল্লিপাত্রে পারমাণবিক জ্বালানি প্রবেশ করানোর কাজও গত ১২ মে শেষ হয়। এরপর বিভিন্ন ধাপে পরীক্ষা চালিয়ে ‘বি’ স্টেজ সম্পন্ন করা হয়। কিন্তু দুটি সেফটি ভালভে সমস্যা দেখা দেওয়ায় ‘সি’ স্টেজের পরীক্ষা শুরু করা সম্ভব হয়নি।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম গত ৩ সেপ্টেম্বর জানান, প্রথম ইউনিটের দুটি সেফটি ভালভে সমস্যা থাকায় পরবর্তী ধাপের পরীক্ষা আপাতত শুরু করা যাচ্ছে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সেফটি ভালভ দুটি কেন কাজ করছে না, তা নির্ধারণ করতে রাশিয়া থেকে বিশেষজ্ঞ দল আসার কথা রয়েছে। প্রকল্পের ডিজাইনারের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ভালভ দুটি পুরোপুরি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে।

দুটি বিকল্পের কথা ভাবছে সরকার

ত্রুটিপূর্ণ সেফটি ভালভ দ্রুত সচল করতে দুটি বিকল্প বিবেচনা করা হচ্ছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী জানিয়েছেন, দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য বরাদ্দ থাকা ভালভ এনে প্রথম ইউনিটে বসানো হতে পারে। অথবা রুশ ভেন্ডরকে দ্রুত নতুন ভালভ তৈরি করে সরবরাহের অনুরোধ করা হতে পারে।

যে পদ্ধতিতে দ্রুত সমাধান করা সম্ভব হবে, সরকার সেটিই বেছে নেবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী।

সেফটি ভালভকে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। রিঅ্যাক্টরের কুলিং ব্যবস্থায় অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হলে ভালভ খুলে অতিরিক্ত চাপ বের করে দেওয়ার মাধ্যমে এটি নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তবে ভালভের সমস্যা সমাধান হলেই সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে না। এরপর রিঅ্যাক্টরে ফিশন বিক্রিয়া শুরু করা, পরীক্ষামূলক উৎপাদন এবং ধাপে ধাপে গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

লোডশেডিংয়ের মধ্যে আরও দীর্ঘ হচ্ছে অপেক্ষা

রূপপুরের বিদ্যুৎ পাওয়ার অপেক্ষার মধ্যেই দেশে বিদ্যুৎ সংকট অব্যাহত রয়েছে। আমদানিসহ দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও জ্বালানি সংকটের কারণে চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন করা যাচ্ছে না।

ফলে প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। কোনো কোনো সময়ে দেশের মোট লোডশেডিং সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

গত ৫ সেপ্টেম্বর রাত ৯টার পিক আওয়ারে সারা দেশে ২ হাজার ২৫৮ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং হয়েছে ঢাকা জোনে—৭৫৯ মেগাওয়াট। ওই সময় ঢাকা জোনে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৬ হাজার ১৮২ মেগাওয়াট।

অন্যদিকে সবচেয়ে কম লোডশেডিং হয়েছে বরিশাল জোনে, ১০৬ মেগাওয়াট।

এ অবস্থায় রূপপুরের ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট চালু হলে জাতীয় গ্রিডে একসঙ্গে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে। ফলে চলমান বিদ্যুৎ ঘাটতি ও লোডশেডিং কমাতে রূপপুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এনএলডিসির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের উদ্যোগ

রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে গত ২ সেপ্টেম্বর জাতীয় লোড পরিচালনা কেন্দ্র বা এনএলডিসির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনে চুক্তি করে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান জিই ভার্নোভা।

চুক্তির আওতায় রূপপুরের প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিটের আটটি সঞ্চালন লাইন এবং দুটি উপকেন্দ্রের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এনএলডিসির কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়।

তবে এই চুক্তির পরদিনই প্রথম ইউনিটের দুটি সেফটি ভালভে ত্রুটি ধরা পড়ে। ফলে গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তুতি চললেও মূল উৎপাদন প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপ থেমে যায়।

বারবার পিছিয়েছে রূপপুরের সময়সীমা

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট ২০২২ সালের ডিসেম্বর এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৩ সালের অক্টোবরে চালু হওয়ার কথা ছিল। তবে করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ নানা কারণে প্রকল্পের সময়সীমা কয়েক দফা পিছিয়েছে।

এর মধ্যে গত জুনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, আগস্টের শেষদিকে প্রথম ইউনিট থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে। একই সঙ্গে ডিসেম্বরের মধ্যে প্রথম ইউনিট থেকে ১ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ গ্রিডে দেওয়ার আশাবাদও জানিয়েছিলেন তিনি।

কিন্তু সেফটি ভালভের ত্রুটির কারণে সেই সময়সূচিও এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

দেশের সবচেয়ে বড় একক প্রকল্প

দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক প্রকল্প হিসেবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। কেন্দ্রটির পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড বা এনপিসিবিএল।

পাবনার রূপপুরে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট নির্মাণ করছে রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট।

কেন্দ্রটির উৎপাদন শুরু হলে বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় ৩৩তম দেশ হিসেবে যুক্ত হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী এখান থেকে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে এবং প্রায় দেড় বছর পরপর নতুন পারমাণবিক জ্বালানি প্রতিস্থাপন করতে হবে।

তবে প্রথম ইউনিটের সেফটি ভালভের ত্রুটি দ্রুত সমাধান না হলে রূপপুর থেকে বিদ্যুৎ পাওয়ার অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হতে পারে। আর দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা ও লোডশেডিংয়ের চাপের মধ্যে প্রকল্পটির উৎপাদন শুরুর সময়সূচি এখন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর