infoamaderdin@gmail.com বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১৮ ভাদ্র ১৪৩৩

১০ বছরে মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যয় ১ হাজার কোটি, তবু ডেঙ্গুর উচ্চঝুঁকিতে ঢাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:০৯ পিএম

ডেঙ্গুর জন্য সামনে আসছে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে এডিস মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হওয়ায় এ সময় ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এরই মধ্যে দেশে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে।

অথচ মশা নিয়ন্ত্রণে বিপুল অর্থ ব্যয়, নিয়মিত ওষুধ ছিটানো এবং নানা ধরনের বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হলেও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন মশার বিস্তার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর সাফল্য দেখাতে পারেনি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের প্রথম ২০ দিনেই দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১১ হাজার ৭১২ জন। অথচ পুরো জুলাই মাসে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ২০৬ জন। চলতি মাসে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে, যেখানে জুলাইয়ে মৃত্যু হয়েছিল ৩৬ জনের। চলতি বছর এখন পর্যন্ত সারা দেশে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৭ হাজার ৩৮৮ জন।

এমন পরিস্থিতিতে রাজধানীর মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গত ১০ বছরে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মশা নিয়ন্ত্রণে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় করলেও ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী কোনো সমাধান দেখা যায়নি। বরং প্রতিবছর বর্ষা ও ডেঙ্গু মৌসুমে মশার উপদ্রব বাড়ার পরই জোরালো অভিযান শুরু করার অভিযোগ রয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাম্প্রতিক এক জরিপেও উঠে এসেছে ভয়াবহ চিত্র। সংস্থাটির ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টিতেই নির্ধারিত মানদণ্ডের চেয়ে বেশি এডিস মশার ঘনত্ব পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২৮টি ওয়ার্ডকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ডিএসসিসি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার ৩৬ জন কর্মী আধুনিক ‘কবো টুলবক্স’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে এ জরিপ পরিচালনা করেন। এতে ২ হাজার ২৫০টি বাড়ি থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে ২৮১টি বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা ও পিউপা পাওয়া গেছে।

জরিপে ভবনভেদে এডিস মশার প্রজননের হারে পার্থক্যও পাওয়া গেছে। বহুতল ভবনে সবচেয়ে বেশি ৩৫ দশমিক ২৩ শতাংশ, একক বাড়িতে ২৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ, নির্মাণাধীন ভবনে ১৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং সেমিপাকা বাড়িতে ১৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। প্রজননস্থল হিসেবে সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে মেঝেতে জমে থাকা পানি, বালতি ও প্লাস্টিকের ড্রাম। এগুলোর হার যথাক্রমে ১২ দশমিক ২৬, ১০ দশমিক ৩৪ ও ৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ।

তবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো জরিপ পরিচালনা করেনি বলে জানা গেছে।

১০ বছরে মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যয়ের পাহাড়

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত ১০ বছরে মশা নিয়ন্ত্রণে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ব্যয় করেছে ৬৮৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। একই সময়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ব্যয় করেছে ৩২৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক দশকে দুই সিটি করপোরেশন মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যয় করেছে ১ হাজার ১২ কোটি টাকার বেশি।

সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ডিএনসিসি মশা নিয়ন্ত্রণে ১৮৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল। ডিএসসিসির বরাদ্দ ছিল ৫৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও বরাদ্দ আরও বেড়েছে। ডিএনসিসি মশক নিধনে ২০৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। আর ডিএসসিসি ডেঙ্গু ও মশা নিয়ন্ত্রণসহ স্বাস্থ্য খাতে ১২১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা বরাদ্দ রেখেছে।

বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও কেন মশা নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী সাফল্য আসছে না, সেই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে। ড্রোন দিয়ে মশার প্রজননস্থল শনাক্ত, পরিত্যক্ত পাত্র ও টায়ার সংগ্রহ, জলাশয়ে ব্যাঙ ও হাঁস ছাড়া এবং মাইকিংয়ের মতো বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও এসবের দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

নগরবাসীর ক্ষোভ বাড়ছে

রাজধানীর মালিবাগ এলাকার বাসিন্দা আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ঢাকায় দিন দিন ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। পরিবার, বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতদের অনেকেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন। সিটি করপোরেশনের কর্মীদের মাঝে মাঝে ওষুধ ছিটাতে দেখা গেলেও তা নিয়মিত নয়। কয়েক দিন পর আবার মশার উপদ্রব বেড়ে যায়।

তিনি বলেন, অনেক এলাকায় নালা-নর্দমা, ড্রেন ও জলাবদ্ধ স্থান দীর্ঘদিন অপরিষ্কার থাকায় সেগুলো মশার প্রজননস্থলে পরিণত হয়েছে।

উত্তর বাড্ডার বাসিন্দা এনামুল হক বলেন, আগে বর্ষাকালে মশার উপদ্রব বাড়লে মানুষ কিছুটা চিন্তিত হতো। এখন পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে জ্বর হলেই প্রথমে ডেঙ্গুর কথা মাথায় আসে। প্রতিবছর ডেঙ্গুর মৌসুম আসে, রোগী বাড়ে, মানুষ মারা যায়। এরপর সিটি করপোরেশন কয়েক দিনের জন্য নড়েচড়ে বসে। রোগী হাজার হাজার হওয়ার পর নয়, তার আগেই কেন কার্যকর প্রস্তুতি নেওয়া হয় না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

জনবল সংকটের কথা বলছে সিটি করপোরেশন

অভিযোগের বিষয়ে ডিএসসিসির এক কর্মকর্তা জানান, ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা অভিযান, জমে থাকা পানি অপসারণ, লার্ভার উৎস ধ্বংস এবং ওষুধ ছিটানোর কার্যক্রম নিয়মিত চলছে। পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে।

তবে প্রয়োজনের তুলনায় জনবল কম থাকায় বিশাল নগরীর সব এলাকায় একই সময়ে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় তদারকি ও অভিযান চালানো সম্ভব হয় না বলে স্বীকার করেন তিনি। ডেঙ্গু মৌসুম শুরুর আগেই প্রতিটি ওয়ার্ডে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন ছিল বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।

ডিএনসিসির স্বাস্থ্য বিভাগের এক কর্মকর্তাও জানান, জনসচেতনতা তৈরি ও মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের নিয়মিত কার্যক্রম চলছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আরও নিবিড় ও পরিকল্পিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে পর্যবেক্ষণ চালানো জরুরি হলেও জনবল সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানান তিনি।

ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলেন, নিজস্ব জরিপে চিহ্নিত ২৮টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা হচ্ছে। এসব এলাকায় ক্র্যাশ প্রোগ্রামের মাধ্যমে লার্ভা ধ্বংস ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান জোরদার করা হয়েছে। তবে ডেঙ্গুর মতো বড় জনস্বাস্থ্য সংকট শুধু সিটি করপোরেশনের পক্ষে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়; নাগরিকদেরও সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

ডিএনসিসির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, বিশেষ মশক নিধন কর্মসূচির আওতায় মশককর্মীরা মাঠে কাজ করছেন এবং লার্ভা ধ্বংসে স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে বাসাবাড়ি ও আঙিনা পরিষ্কার না রাখলে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম পুরোপুরি সফল করা কঠিন।

বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনার তাগিদ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পাড়া-মহল্লা পর্যায়ে মশার হটস্পট চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতির মাধ্যমে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও সিটি করপোরেশনকে কীটনাশকের ধরন ও ব্যবহারের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে।

তিনি বলেন, শুধু প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি হটস্পটগুলোতে স্থানীয় মানুষের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, শুধু রাস্তাঘাটে রাসায়নিক ওষুধ বা ফগিং করে ডেঙ্গুর স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নগরায়ন, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং জৈবিক পদ্ধতির কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।

তিনি বলেন, রোগী বাড়ার পর তড়িঘড়ি অভিযান না চালিয়ে নিয়মিত গবেষণা ও তথ্যের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধমূলক পরিকল্পনা নিতে হবে। কোথায় এবং কী কারণে মশার বিস্তার ঘটছে, তা আগেভাগে শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুকে শুধু মৌসুমি সমস্যা হিসেবে দেখলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, কার্যকর কীটনাশক ব্যবহার, নিয়মিত নজরদারি, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ এবং নাগরিকদের সম্পৃক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হলে প্রতিবছরই ডেঙ্গুর মৌসুমে নগরবাসীকে একই ধরনের আতঙ্কের মুখোমুখি হতে হবে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


১০ বছরে মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যয় ১ হাজার কোটি, তবু ডেঙ্গুর উচ্চঝুঁকিতে ঢাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:০৯ পিএম

ডেঙ্গুর জন্য সামনে আসছে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে এডিস মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হওয়ায় এ সময় ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এরই মধ্যে দেশে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে।

অথচ মশা নিয়ন্ত্রণে বিপুল অর্থ ব্যয়, নিয়মিত ওষুধ ছিটানো এবং নানা ধরনের বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হলেও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন মশার বিস্তার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর সাফল্য দেখাতে পারেনি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের প্রথম ২০ দিনেই দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১১ হাজার ৭১২ জন। অথচ পুরো জুলাই মাসে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ২০৬ জন। চলতি মাসে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে, যেখানে জুলাইয়ে মৃত্যু হয়েছিল ৩৬ জনের। চলতি বছর এখন পর্যন্ত সারা দেশে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৭ হাজার ৩৮৮ জন।

এমন পরিস্থিতিতে রাজধানীর মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গত ১০ বছরে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মশা নিয়ন্ত্রণে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় করলেও ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী কোনো সমাধান দেখা যায়নি। বরং প্রতিবছর বর্ষা ও ডেঙ্গু মৌসুমে মশার উপদ্রব বাড়ার পরই জোরালো অভিযান শুরু করার অভিযোগ রয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাম্প্রতিক এক জরিপেও উঠে এসেছে ভয়াবহ চিত্র। সংস্থাটির ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টিতেই নির্ধারিত মানদণ্ডের চেয়ে বেশি এডিস মশার ঘনত্ব পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২৮টি ওয়ার্ডকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ডিএসসিসি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার ৩৬ জন কর্মী আধুনিক ‘কবো টুলবক্স’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে এ জরিপ পরিচালনা করেন। এতে ২ হাজার ২৫০টি বাড়ি থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে ২৮১টি বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা ও পিউপা পাওয়া গেছে।

জরিপে ভবনভেদে এডিস মশার প্রজননের হারে পার্থক্যও পাওয়া গেছে। বহুতল ভবনে সবচেয়ে বেশি ৩৫ দশমিক ২৩ শতাংশ, একক বাড়িতে ২৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ, নির্মাণাধীন ভবনে ১৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং সেমিপাকা বাড়িতে ১৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। প্রজননস্থল হিসেবে সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে মেঝেতে জমে থাকা পানি, বালতি ও প্লাস্টিকের ড্রাম। এগুলোর হার যথাক্রমে ১২ দশমিক ২৬, ১০ দশমিক ৩৪ ও ৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ।

তবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো জরিপ পরিচালনা করেনি বলে জানা গেছে।

১০ বছরে মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যয়ের পাহাড়

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত ১০ বছরে মশা নিয়ন্ত্রণে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ব্যয় করেছে ৬৮৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। একই সময়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ব্যয় করেছে ৩২৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক দশকে দুই সিটি করপোরেশন মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যয় করেছে ১ হাজার ১২ কোটি টাকার বেশি।

সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ডিএনসিসি মশা নিয়ন্ত্রণে ১৮৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল। ডিএসসিসির বরাদ্দ ছিল ৫৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও বরাদ্দ আরও বেড়েছে। ডিএনসিসি মশক নিধনে ২০৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। আর ডিএসসিসি ডেঙ্গু ও মশা নিয়ন্ত্রণসহ স্বাস্থ্য খাতে ১২১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা বরাদ্দ রেখেছে।

বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও কেন মশা নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী সাফল্য আসছে না, সেই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে। ড্রোন দিয়ে মশার প্রজননস্থল শনাক্ত, পরিত্যক্ত পাত্র ও টায়ার সংগ্রহ, জলাশয়ে ব্যাঙ ও হাঁস ছাড়া এবং মাইকিংয়ের মতো বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও এসবের দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

নগরবাসীর ক্ষোভ বাড়ছে

রাজধানীর মালিবাগ এলাকার বাসিন্দা আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ঢাকায় দিন দিন ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। পরিবার, বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতদের অনেকেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন। সিটি করপোরেশনের কর্মীদের মাঝে মাঝে ওষুধ ছিটাতে দেখা গেলেও তা নিয়মিত নয়। কয়েক দিন পর আবার মশার উপদ্রব বেড়ে যায়।

তিনি বলেন, অনেক এলাকায় নালা-নর্দমা, ড্রেন ও জলাবদ্ধ স্থান দীর্ঘদিন অপরিষ্কার থাকায় সেগুলো মশার প্রজননস্থলে পরিণত হয়েছে।

উত্তর বাড্ডার বাসিন্দা এনামুল হক বলেন, আগে বর্ষাকালে মশার উপদ্রব বাড়লে মানুষ কিছুটা চিন্তিত হতো। এখন পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে জ্বর হলেই প্রথমে ডেঙ্গুর কথা মাথায় আসে। প্রতিবছর ডেঙ্গুর মৌসুম আসে, রোগী বাড়ে, মানুষ মারা যায়। এরপর সিটি করপোরেশন কয়েক দিনের জন্য নড়েচড়ে বসে। রোগী হাজার হাজার হওয়ার পর নয়, তার আগেই কেন কার্যকর প্রস্তুতি নেওয়া হয় না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

জনবল সংকটের কথা বলছে সিটি করপোরেশন

অভিযোগের বিষয়ে ডিএসসিসির এক কর্মকর্তা জানান, ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা অভিযান, জমে থাকা পানি অপসারণ, লার্ভার উৎস ধ্বংস এবং ওষুধ ছিটানোর কার্যক্রম নিয়মিত চলছে। পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে।

তবে প্রয়োজনের তুলনায় জনবল কম থাকায় বিশাল নগরীর সব এলাকায় একই সময়ে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় তদারকি ও অভিযান চালানো সম্ভব হয় না বলে স্বীকার করেন তিনি। ডেঙ্গু মৌসুম শুরুর আগেই প্রতিটি ওয়ার্ডে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন ছিল বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।

ডিএনসিসির স্বাস্থ্য বিভাগের এক কর্মকর্তাও জানান, জনসচেতনতা তৈরি ও মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের নিয়মিত কার্যক্রম চলছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আরও নিবিড় ও পরিকল্পিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে পর্যবেক্ষণ চালানো জরুরি হলেও জনবল সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানান তিনি।

ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলেন, নিজস্ব জরিপে চিহ্নিত ২৮টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা হচ্ছে। এসব এলাকায় ক্র্যাশ প্রোগ্রামের মাধ্যমে লার্ভা ধ্বংস ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান জোরদার করা হয়েছে। তবে ডেঙ্গুর মতো বড় জনস্বাস্থ্য সংকট শুধু সিটি করপোরেশনের পক্ষে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়; নাগরিকদেরও সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

ডিএনসিসির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, বিশেষ মশক নিধন কর্মসূচির আওতায় মশককর্মীরা মাঠে কাজ করছেন এবং লার্ভা ধ্বংসে স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে বাসাবাড়ি ও আঙিনা পরিষ্কার না রাখলে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম পুরোপুরি সফল করা কঠিন।

বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনার তাগিদ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পাড়া-মহল্লা পর্যায়ে মশার হটস্পট চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতির মাধ্যমে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও সিটি করপোরেশনকে কীটনাশকের ধরন ও ব্যবহারের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে।

তিনি বলেন, শুধু প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি হটস্পটগুলোতে স্থানীয় মানুষের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, শুধু রাস্তাঘাটে রাসায়নিক ওষুধ বা ফগিং করে ডেঙ্গুর স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নগরায়ন, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং জৈবিক পদ্ধতির কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।

তিনি বলেন, রোগী বাড়ার পর তড়িঘড়ি অভিযান না চালিয়ে নিয়মিত গবেষণা ও তথ্যের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধমূলক পরিকল্পনা নিতে হবে। কোথায় এবং কী কারণে মশার বিস্তার ঘটছে, তা আগেভাগে শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুকে শুধু মৌসুমি সমস্যা হিসেবে দেখলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, কার্যকর কীটনাশক ব্যবহার, নিয়মিত নজরদারি, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ এবং নাগরিকদের সম্পৃক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হলে প্রতিবছরই ডেঙ্গুর মৌসুমে নগরবাসীকে একই ধরনের আতঙ্কের মুখোমুখি হতে হবে।

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর